পাশের ঘরের বাতিটা যেন প্রদীপের মতন মিটমিট জ্বলছিল; শিখাটা বাড়িয়ে দিল সুরেশ্বর। ঘরের এক কোণে মিটসেফের পাশে ছোট টুলে স্পিরিট ল্যাম্প। স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে চায়ের জল বসাল সুরেশ্বর।
শোবার ঘরে সুরেশ্বরের সাধাসিধে বিছানা, এক পাশে লোহার ছোট মতন এক আলমারি, আলনায় কয়েকটি জামাকাপড়, একদিকে কাঠের সাধারণ র্যাকে কিছু বই, হালকা একটা টিপয়, ক্যাম্বিসের চেয়ার একটা। দেওয়ালে মার ছবি।
গগন ও-ঘর থেকে একটা চেয়ার টেনে আনল, জুতোজোড়াও খুলে রাখল ওপাশে। সু
রেশ্বর বলল, আমার সঙ্গে এক জায়গায় বেড়াতে যাবি?
কোথায়?
মিশনারিরা একটা মেলা করে ক্রিসমাসের সময়, শহর থেকে মাইল আষ্টেক দূরে। আদিবাসী দেখবি, নাচ দেখবি, এদিককার ক্রিশ্চান দেখবি। নানারকমের মজা থাকে মেলায়। যাবি নাকি?
.
সুরেশ্বর মেলাটার নানা বিবরণ শোনাতে লাগল; গাধার পিঠে উলটো দিকে মুখ করে বসে কে কতটা ছুটতে পারে–তার রগড়, উলের বল ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো, তাসের ম্যাজিক, লটারি খেলা ইত্যাদি। আসলে মেলাটা এ দিকের দেশি মিশনারিদের চেষ্টায় অনেক দিন থেকে চলে আসছে। শালবনের মাঠে বসে যিশু-ভজনা, দরিদ্রদের পুরনো গরম জামা কাপড় বিতরণ, শিশুদের হাতে কিছু দেওয়া-থোওয়া। ওরই মধ্যে কোনও সেবা প্রতিষ্ঠানের জন্যে কিছু চাঁদা সংগ্রহ।
গগন ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি চাঁদার কৌটো নিয়ে যাচ্ছ?
সুরেশ্বর চায়ের জলে চা-পাতা মেশাতে মেশাতে হেসে বলল, হ্যাঁ; ভাবছি তোর গলায় একটা চাঁদার কৌটো ঝুলিয়ে দেব।
তা হলে আমি নেই। গগন ভয়ের ভাব করে হাত মাথা নাড়ল।
সুরেশ্বর জোরে জোরে হাসতে লাগল। শেষে বলল, না, তোকে চাঁদা তুলতে হবে না। আমরা ওখানে ম্যাজিক লণ্ঠন দেখাই…
ম্যাজিক লণ্ঠন?
স্লাইড শো। দেখিসনি? কলকাতায় সিনেমা দেখিস না..
তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কীসের ম্যাজিক লণ্ঠন দেখাও?
চোখের। কী করে চোখ ভাল রাখতে হয়, চোখের কী কী রোগ হয়–এই সব। ওদের কাছে এটা দেখানো দরকার। সুরেশ্বর বলল। বলে চায়ের কাপ গুছিয়ে চা ঢালতে লাগল।
গগন একরকম মন নিয়ে এসেছিল, অথচ কথায় কথায় তার মন অন্য দিকে ভেসে যাচ্ছে বুঝে অস্বস্তি অনুভব করতে লাগল। এই লোকটিকে গগন বরাবরই আত্মীয়ের মতো ভেবে এসেছে, ভক্তিশ্রদ্ধা করেছে বড় ভাইয়ের মতন, ভালবেসেছে বন্ধুর তুল্য, তর্ক করেছে, চেঁচামেচি করেছে, আবার সমীহ করতেও কোথাও বাধেনি। দিদির সঙ্গে সুরেশদার সম্পর্কের এই তিক্ততা তার ভাল লাগেনি। মনে মনে সে কষ্ট পাচ্ছিল। তাদের সংসারের কেউই চায় না–দিদির সঙ্গে সুরেশদার সম্পর্কটা এই অবস্থায় বরাবরের মতন ভেঙে যাক। দিদির যথেষ্ট বয়েস হয়ে গেছে, এ বয়সে দিদিকে কনে সাজিয়ে দেখিয়ে মা দিদির বিয়ে দেবে সে আশাও করে না। তা ছাড়া দিদির জীবনে এতকাল যা মূল্যবান হয়ে ছিল তা রাতারাতি তুচ্ছ হয়ে যাবে যে তাও নয়। মা, মামা সকলেই যা চায় তা এমন কিছু বেশি চাওয়া নয়। সমাজ সংসারে বাস করতে হলে তার কিছু কিছু নিয়ম তো মানতেই হবে। এভাবে দিদিকে রেখে দিতে পারে না সুরেশদা। যা সঙ্গত, যা উচিত, দৃষ্টিকটু নয়, অথচ দিদি যাতে সুখী হতে পারে–তুমি তাই করো। কেউ তোমার আশ্রম তুলে দিতে বলছে না, কলকাতায় ফিরে যেতেও বলছে না। তোমার এই সেবাধর্মে যদি মতি থাকে থাক, কিন্তু একটি মেয়েকে কোন আশ্বাসে তার আত্মীয়েরা এমনভাবে ফেলে রাখতে পারে।
সুরেশ্বর চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিল। নাও হে গগনবাবু, খেয়ে দেখো।
গগন চায়ের পেয়ালায় ঠোঁট ছোঁয়াল। সুরেশ্বর তার ক্যাম্বিসের চেয়ারটায় বসল। বসে চা খেতে লাগল।
সুরেশদা– গগন আস্তে গলায় বলল।
সুরেশ্বর চায়ে চুমুক দিয়ে মুখ তুলল। বলো।
গগন বিশ্রি এক অস্বস্তি অনুভব করছিল। সুরেশ্বরের দিরে তাকাতে পারল না। সুরেশ্বর অপেক্ষা করছে।
কী হল…? সুরেশদা বলে যে বসে থাকলি? কী ব্যাপার?
গগন চকিতের জন্যে হৈমন্তীর বিষণ্ণ, ক্ষুব্ধ, তিক্ত মুখ দেখতে পেল, গলা শুনতে পেল। মুখ তুলে সুরেশ্বরকে দেখল ক পলক গগন। তোমার সঙ্গে আমার কটা কথা আছে।
কী কথা? সুরেশ্বর সহজ গলায় শুধোল।
বলছি। …তুমি নিশ্চয় আমাদের ভুল বুঝবেনা। গগন জড়ানো গলা পরিষ্কার করে নেবার জন্যে চা খেল। হয়তো একটু সময় নিল নিজেকে ঘুছিয়ে নেবার জন্যে।
সুরেশ্বর বলল, আমার বোঝার ভুল না হলে তোদের ভুল বুঝব কেন?
না, বলে নিলাম। তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড়, তোমার সঙ্গে আমাদের রিলেশান কী তা তুমিও জান। … ব্যাপারটা যেমনই হোক আমি চাই না এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি কিছু হয়।
বেশ তো, হবে না।
মা আমায় কয়েকটা কথা জানাতে বলেছে তোমাকে। মামাও বলেছে।
তুই তো আমায় কিছু বলিসনি–
না, বলব বলব ভাবছিলাম, সুযোগ হচ্ছিল না। গগন বিছানার দিকে তাকাল, সুরেশ্বরের সঙ্গে চোখাচুখি হবার সঙ্কোচ সে অনুভব করছে।
সুরেশ্বর শান্তভাবে অপেক্ষা করছিল।
শেষ পর্যন্ত গগন দুর্বলতা ও সঙ্কোচ কাটিয়ে বলল, দিদির ব্যাপারে তুমি কী ঠিক করলে?
সুরেশ্বর নীরব থাকল। গগনের কথার জড়তা, তার অস্বস্তি, সঙ্কোচ থেকে হয়তো সুরেশ্বর অনুমান করতে পেরেছিল গগন এই ধরনের কোনও কথা তুলবে। বিস্মিত অথবা বিভ্রান্ত হবার মতন যেন কিছু ছিল না কথাটায়।
