না– মাথা নাড়ল হৈমন্তী।
কেন যাবি না?
এখন যাব না। বলে চুপ করে থাকল হৈমন্তী সামান্য, তারপর হঠাৎ বলল, আমার অসুখের সময় অনেকগুলো টাকা দিয়েছিল ও। কত টাকা আমি জানি না। মা আর মামা মোটামুটি জানে। আমায় তুই জানাস তো কলকাতায় গিয়ে।
গগন অবাক হয়ে তাকাল। কেন?
ঋণ শোধ করব, হৈমন্তী কেমন এক গলা করে বলল, আমার টাকা থাকলে আমি ওকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিতাম।
গগন হাসল না, অথচ কথাটার গুরুত্বও দিল না; বলল, এসব তোর ছেলেমানুষি।
তোরা যখন হাত পেতে টাকাটা নিয়েছিলি তখন তো ছেলেমানুষি মনে হয়নি।
গগন যেন অস্বস্তি বোধ করল। চুপ করে থাকল সামান্য, তারপর বলল, শুধু টাকা তো দেয়নি, আরও কিছু দিয়েছিল…।
কথাটার অর্থ বুঝতে হৈমন্তীর কোনও অসুবিধে হল না। বলল, আর যা দিয়েছিল–সেটা যদি দিয়েও থাকে–ও একলা দেয়নি; আমিও দিয়েছিলাম। হৈমন্তী থেমে গেল, কয়েক মুহূর্ত আর কথা বলল না, শেষে বলল, মনে মনে ওর যদি কোনও অহঙ্কার থাকে তবে একদিন আমার অসুখের সময় দয়া করে বাঁচিয়ে ছিল বলে, অন্য কোনও অহঙ্কার ওর থাকতে পারে না।
বাস লাটঠার মোড়ে এসে দাঁড়াল। দুজন মাত্র যাত্রী। তারা নামল। কে যেন উঠল একজন। বাস ছাড়ল। গুরুডিয়ায় যাবে।
সারা মাঠ জুড়ে পৌষের হিম হাওয়া হা হা করে ছুটে বেড়াচ্ছে যেন গায়ের হাড়ে শীত ফুটছিল, মাঠের প্রান্ত দিয়ে শেয়াল ডেকে যাচ্ছে। কাঁচা রাস্তা দিয়ে বাসটা টাল খেতে খেতে চলেছে।
গগন হৈমন্তীর গায়ের দিকে সামান্য ঘন হয়ে বসে ইতস্তত করে শেষে বলল, দিদি, সুরেশদাকে তোর আর ভাল লাগে না?
হৈমন্তী মাথা নাড়ল। না, লাগে না।
তোর মন বদলে গেছে?
জানি না। …হয়তো গেছে।
তা হলে এখানে থেকে লাভ কী! কলকাতায় ফিরে চল।
এখন না। …
কী করবি এখানে থেকে–?
মজা দেখব। … সুরেশমহারাজ যতটা চকচক করছে তাতে লোকে তাকে সোনা ভাবে; আমি জানি, ও-মানুষ সোনা নয়, ও কত ছোট তা আমার খানিকটা জানা হয়েছে, বাকিটা দেখব। হৈমন্তী সমস্ত কথাটাই ব্যঙ্গ করে বলার চেষ্টা করল, অথচ গগন বুঝতে পারল দিদি যেন কীসের এক আক্রোশ অনুভব করছে।
আশ্রমে ফিরে এসে গগন বলল, তুই যা, আমি একটু সুরেশদার ওখান থেকে ঘুরে আসি।
হৈমন্তী বাধা দিয়ে কিছু বলল, গগন শুনল না; পিছন থেকে ডাকল হৈমন্তী, গগন সাড়া দিল না, অন্ধকারের মধ্যে হনহন করে চলে গেল। ওকে আর দেখা গেল না।
সুরেশ্বরের বাড়ির বারান্দায় এসে গগন যেন থমকে দাঁড়াল। এতক্ষণ সে কেমন যেন এক আবেগের বশে চলে এসেছে, কেন আসছে তা যেন তার খেয়াল ছিল না। বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে সে আলো নজর করতে পারল, সুরেশ্বরের ঘরে আলো জ্বলছে। দুমুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, ঘরের মধ্যে সাড়া শব্দ নেই।
গগন ডাকল।
ঘরের মধ্যে থেকে সাড়া দিল সুরেশ্বর, গগন, এসো।
কাগজপত্র সাজিয়ে নিয়ে বসে সুরেশ্বর কাজ করছিল, টেবিলের একপাশে লণ্ঠন জ্বলছে। গগনকে দেখে চেয়ারটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে আরাম করে বসল সুরেশ্বর, হাত মাথার ওপর তুলে ক্লান্তি নিবারণ করল। তারপর গগনবাবু, এই মাত্র ফিরলে নাকি? সুরেশ্বর সহাস্য গলায় বলল।
হ্যাঁ। গগন অন্য চেয়ারটায় বসল।
বাসের শব্দ শুনলাম। …কেমন বেড়ানো হল?
ভাল।
কোথায় কোথায় গেলে?
অবনীবাবুর বাড়িতে। সেখানেই ছিলাম। আমরা একটু বেড়াব চার দিকে, অবনীবাবুর সঙ্গে একটা প্ল্যান করা গেল; ওঁর গাড়িটা পাওয়া যাবে।
তা হলে তো কাজ গুছিয়ে এসেছ! কোথায় কোথায় যাচ্ছ?
গগন বেড়াবার জায়গাগুলোর নাম বলল, শেষে রাত্রে তারা কোন জঙ্গলে যাবে, কোথায় কোন হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশনের কাছে ইনসপেকশান বাংলোয় রাত কাটাবে, হরিণ দেখতে ছুটবে কোন নদীর কাছে ইত্যাদি সংক্ষেপে বর্ণনা করল।
সুরেশ্বর মনোযোগ দিয়ে শুনল। শেষে বলল, রাত্তিরে জঙ্গলের মধ্যে বেশি যেও না; তুমি যে জঙ্গলের কথা বলছ ওটা তেমন ভাল না। বন্দুক-টক সঙ্গে থাকবে?
না। আমরা কেউ ও-বিদ্যে জানি না।
তবে…সুরেশ্বর হাসল, খালি হাতে অ্যাডভেঞ্চার।
গগন পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেট খুঁজতে লাগল। দিদিকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব। রাত্তিরে জঙ্গলে যাবার দিন নেব না, অন্য সময় নিয়ে যাব।
হেম যাবে বলছে?
হ্যাঁ, যাবে না কেন! ও তো কোথাও যায়নি। আমি থাকতে থাকতে ঘুরে না এলে আর হবে না। গগন সিগারেট বের করে ধরাল।
সুরেশ্বর গায়ের মোটা গরম চাদরটা গুছিয়ে নিল! বেশ তো যাক।
সকাল-দুপুর ওর হাসপাতাল। গগন কী ভেবে মনে করিয়ে দিল।
হাসপাতাল ঠিক দুপুরে নয়। যাকগে, সে ও ব্যবস্থা করে নেবে।
গগন পর পর কয়েক টান সিগারেট খেল। সে ঠিক যে জিনিসটা বলতে চায় তার ভূমিকা কীভাবে করা যায় বুঝে উঠতে পারছিল না। না পারায় মন চঞ্চল ও অস্থির হয়ে ছিল।
খুব শীত…। ঠাণ্ডা লেগে গেছে গলায় গগন গলার কাছটায় টিপতে লাগল। তোমার ভরতু একটু চা খাওয়াবে না?
ভরতুটার জ্বর হয়েছে। …আমি করে দিচ্ছি।
তুমি! ..না না…থাক…
থাক কেন, দু কাপ চা আমি করতে পারব না…সকালে আমি নিজের চা নিজে করে খাই, তা জানিস। সুরেশ্বর উঠল। গগনকে তুই-টুই করে কথা বলার অভ্যেস সুরেশ্বরের পুরনো।
গগন বলল, আমি করছি, কোথায় কী আছে বলো?
বলার চেয়ে করাটা সোজা– সুরেশ্বর সস্নেহে হেসে বলল। তা হলে ও ঘরে চল, স্পিরিট ল্যাম্পে জল গরম বসিয়ে দিয়ে গল্প করা যাক।
