অপেক্ষা করে করে শেষে গগন বলল, দিদি, তুই আমার কাছে স্পষ্ট করে বল। বলে গগন আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে থাকল।
হৈমন্তী নীরব। তার নিশ্বাস পড়ল। বাসের পেছনের যাত্রীদের মধ্যে কে যেন দেহাতি সুরে দেহাতের গান গাইছে গুন গুন করে; একটানা প্রায় একই রকমের একটা শব্দ বাসের, কানে সয়ে গেছে, মনে হয় যেন এই শব্দটাই চিরস্থায়ী।
দিদি…
উঁ।
তোকে তো কেউ জোর করে এখানে আনেনি।
ঠকিয়ে এনেছে…
এটা তোর রাগের কথা নয় তো?
না।
তুই তো সব জানতিস।
না, জানতাম না। আমি এতদিন যা করেছি অন্যের মন রাখতে করেছি…
এতদিন।
এতদিন বই কি। ডাক্তারি পড়ার, ডাক্তার হবার শখও আমার ছিল না। আমার ভাল লাগে না। তবু সাত আট বছর এই বেগার খাটলাম কেন?
গগন সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিল। কথাটা তাদের পরিবারে কেউ যে বুঝত না তা নয়, সকলেই বুঝত: দিদির ডাক্তারি পড়ার আগ্রহটাই ছিল সুরেশদার। মা বা মামার তেমন মত ছিল না। অথচ তখন কেউই খুব একটা বাধা দেয়নি; দেবার মতন মনের অবস্থা ছিল না। সকলেই ধরে নিয়েছিল সুরেশ্বরের আগ্রহ তার ভাবী পত্নী সম্পর্কে, হৈমন্তীকে সে মনোমতো করে গড়ে নিতে চায়। ওটা তার শখ হয়তো। তা ছাড়া তখন তাদের সংসার সুরেশ্বরের প্রতি এত কৃতজ্ঞ ও তার প্রতি সকলের অনুরাগ এত বেশি যে, সুরেশ্বরের ইচ্ছা ও সাধ অপূর্ণ রাখতে কেউ চায়নি। বলতে গেলে, গগনের এখন সন্দেহ হয়, দিদি সম্পর্কে তাদের সংসারের মনোভাবটা তখন যুক্তিযুক্ত হয়নি। এমনকী–মনে মনে সকলেই যেন সুরেশদাকে দিদির অভিভাবক জেনে নিয়ে দিদিকে সুরেশদার মনোমতন চলতে দিয়েছিল। পরে, বছর দুই তিন পরে, মার কেমন সন্দেহ হয়; সুরেশদা তখন কলকাতা ছেড়েছে, মাঝে মধ্যে আবার চলে যায়। মার মনে খটকা লাগলেও দিদি তখনও কিছু বোঝেনি। বা বুঝলেও শান্ত হয়ে থেকেছে, বিশ্বাস রেখেছে। তারপর যতই দিন গেছে মা ততই অস্থির অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সুরেশদা যে কী করছে, কেন এই সব আশ্ৰমফাশ্রম–এতে কী হবে মা বুঝত না, মার ভালও লাগত না। মা এসব থেকেই সাবধান হতে চেয়েছিল। অথচ দিদির মন মা ভাল করে জানত বলেই কিছু করতে পারেনি। দিদি যেন তখন মাঝনদীতে এসে পড়েছে, ফিরে যাওয়া অসম্ভব, বাকিটুকু সে পার হয়েছে প্রত্যাশা নিয়েই, দ্বিধা যদি এসেও থাকে তার অন্য কোনও উপায় ছিল না। এখন আর দিদির কোনও ভরসা নেই।
দিদির জন্যে গগনের দুঃখ হল। তার খারাপ লাগছিল। সুরেশদার সঙ্গে এখন পর্যন্ত সে কোনও কথা বলেনি, আজ বলবে। দিদির পক্ষে যা বলা সম্ভব নয়, গগনের পক্ষে তা বলতে আটকাবে না।
গগন সামান্য কুঁজো হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকল কিছু সময়। ভাবছিল। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে মুখ যেন অসাড় হয়ে আসছিল। মাফলারটা কানের ওপর চাপা দিল গগন। তারপর বলল, সুরেশদার সঙ্গে তোর সরাসরি একটা কথা হওয়া উচিত ছিল এত দিনে। তুই তো কমদিন আসিসনি।
হৈমন্তী চুপ করে থাকল। তার মনে হল না, যা সে বুঝেছে এর বেশি কিছু তার বোঝার ছিল। এতটা বয়সে সুরেশ্বরের সঙ্গে সে ছেলেমানুষের মতন গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করবে নাকি?
তুই কলকাতায় গিয়ে আবার এলি কেন–তাও তো আমি বুঝি না, গগন বলল।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না হৈমন্তী, সামান্য পরে বলল, দেখতে
দেখতে! কী দেখতে?
মহাপুরুষ–, হৈমন্তীর কথার সুরে শ্লেষ ছিল।
গগন কিছু বুঝতে পারল না। ভাবল, দিদি উপহাস করছে।
হৈমন্তী যেন বুঝতে পারল গগন কী ভাবছে; নিজের থেকেই আবার বলল, তুই ভাবছিস ঠাট্টা করছি। ঠাট্টা নয়; সত্যিই আমি মানুষটাকে দেখার জন্য থেকে গিয়েছি। হৈমন্তীর বলার মধ্যে উপহাস থাকলেও কোথাও যেন তার অতিরিক্তও কিছু ছিল, সেটা যে কী স্পষ্ট বোঝা গেল না।
গগন কথাটায় তেমন কান দিল না। বলল, অনেক দেখেছিস? এবার নিজেকে দেখ।
হৈমন্তী গাড়ির সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল; ড্রাইভারের পিঠ, কয়েকটা শিকের ফাঁক দিয়ে অতি মৃদু একটা আলো, ইঞ্জিনের শব্দ…। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হৈমন্তী মৃদু গলায়, যেন আপনমনেই বলল, মানুষ নিজেকে কত বড় করে দেখতে চায় তা যদি তুই জানতিস, গগন।
গগন ভাবছিল, দিদিকে এবার সে স্পষ্ট করে একটা কথা জিজ্ঞেস করবে। জিজ্ঞেস করবে, তুই ঠিক করে বল, সুরেশদাকে তুই এখনও ভালবাসিস কি না? হৈমন্তীর কথায় তার প্রশ্নটা মুহূর্তের জন্যে তেমন এলোমেলো হয়ে গেল। নিতান্ত কথার জবাব দেবার জন্যে বলল, সুরেশদার কথা বলছিস।
কী রকম?
নিজেদের আর মানুষ ভাবে না। তোর আমার মতন হলে তাদের মহত্ত্ব থাকবে না–এই ভয়ে মেকি সাজ পরে থাকে। লোকের কাছে এমন ভাব দেখায় যেন তারা ঠাকুর দেবতা।
হ্যাঁ, সেই রকম…, হৈমন্তী এবার উত্তেজিত হয়ে ওঠার মতন হয়েছিল; মিষ্টি করে কথা বললে, বিনয়-বিনয় ভাব করে থাকলেই মানুষ ভগবান হয় না। আমি মাটির ঘরে থাকি, জঙ্গলে এসে অন্ধ আশ্রম খুলেছি–তোমরা দেখো আমি কত বড়! আমি মহাপুরুষ। –এসবই লোক-দেখানো। …আসলে মানুষটা কী তা আমি দেখতে পাচ্ছি।
হৈমন্তীর গলার স্বর উঁচু হয়ে গিয়েছিল। গগন দিদির গায়ে হাত দিল, যেন খেয়াল করিয়ে দিল সামনে ড্রাইভার রয়েছে।
অল্পক্ষণ কেউ আর কথা বলল না। বাস লাঠার মোড়ে পৌঁছে এল।
গগন আবার একটা সিগারেট ধরাল। তারপর অন্যমনস্কভাবে বলল, তুই কলকাতায় ফিরে চল।
