সুরেশ্বর যে হৈমন্তীকে লক্ষ করছে হৈমন্তী না তাকিয়েও বুঝতে পারল। পরে সুরেশ্বর বলল, তাই হবে, সময় পাননি।
কথাটা হৈমন্তীর কানে খুব শ্রুতিমধুর হয়নি।
.
২০.
জায়গাটা গগনের খুব পছন্দ হয়ে গেল। এত পছন্দ যে প্রথম দিনটা সে পায়ে হেঁটে আশেপাশে সারাটা সকাল-দুপুর ঘুরে বেড়াল, শীতের লালচে ধুলো মাখল, রোদে পুড়ল, পুড়ে মাথার চুল রুক্ষ করে বিকেল নাগাদ বনের দিক থেকে বেড়িয়ে ফিরল। ফিরে এসে বলল, ব্রিলিয়ান্ট জায়গা, বুঝলি দিদি, চোখ দুটো জুড়িয়ে যায়। কলকাতায় আমরা তাকাতে পারি না, দু হাত অন্তর অবস্ট্রাকসান, এখানে ফুল ভিউ; এসব জায়গায় তাকিয়েও কী আরাম!
গগন এই রকমই, অল্পতেই উচ্ছ্বসিত, সামান্যতেই সন্তুষ্ট। সে বেড়াতে এসেছে এই ভাবটা তার প্রথম দুটো দিন পুরোপুরি বজায় থাকল। বেড়িয়ে, খেয়ে-দেয়ে, ঘুমিয়ে গল্প-গুজব করে দিব্যি কাটিয়ে দিল, গুরুডিয়ার শীত নিয়ে সুরেশ্বরের সঙ্গে হাসিতামাশা করল, অন্ধ আশ্রমের গল্প-গুজব শুনল, কপি কড়াইশুটির স্বাদ, ডিমের কুসুমের রং নিয়েও অনর্গল কথা বলে গেল। বোঝার জো ছিল না, গগনের মনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। আসল কথাটা সে ঘুণাক্ষরেও তুলল না; সুরেশ্বরকে বুঝতে দিল না কয়েকটা দিন বেড়িয়ে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনও কাজ আছে।
সুরেশ্বরের কাছে কথাটা না তুললেও গগন তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। গগন হৈমন্তীকে খুব সাবধানে লক্ষ করছিল, এবং বোঝবার চেষ্টা করছিল। দিদির মনের ভাবটা ঠিক কী ধরনের। আড়ালে দুই ভাই বোনে যেসব কথাবার্তা হত তার বেশির ভাগটাই ছিল ব্যক্তিগত; সেই কথার মধ্যে সুরেশ্বরের প্রসঙ্গটা অবধারিত ছিল। গগন সেসব ক্ষেত্রে নিজে বেশি কিছু বলত না, যতটুকু বলত তাতে তার কিছু চালাকি থাকত। সে জানতে চাইত, দিদির মনের কোনও অদলবদল ঘটেছে কি না, দিদি চেষ্টা করে কোনও কথা লুকোতে চাইছে, নাকি তার এই তিক্ততা ও বিরক্তি নেহাতই অভিমান। এক এক সময় তার মনে হত, দিদির মধ্যে এখন যে রাগ, বিতৃষ্ণা, ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে সেটা প্রকৃতপক্ষে কিছু নয়, প্রণয় কলহ হলেও হতে পারে; আবার অন্য সময় দিদির কথাবার্তা থেকে গগনের সন্দেহ হত, ব্যাপারটা ঠিক সরল নয়, দিদির মনের কোথাও এতদিনের সঞ্চিত বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নষ্ট হয়ে গেছে।
তৃতীয় দিনে গগন গেল স্টেশনে বেড়াতে। সঙ্গে হৈমন্তী। সুরেশ্বর যেতে পারল না। অবনীর সঙ্গে আলাপ পরিচয় সেরে ফেরার পথে বিজলীবাবুর সঙ্গে দেখা। বিজলীবাবুর সঙ্গে পরিচয়টা প্রথম দিনেই ঘটেছিল, বাস স্ট্যান্ডে। বিজলীবাবু শুধোলেন, কী, কেমন লাগছে? গগন আবার হেসে বলল ওয়ান্ডারফুল। বিজলীবাবু বললেন, জায়গাটা তো ভালই, বিশেষ করে এ সময়। তা এদিকে এসে থাকুন দু-চার দিন, ঘুরে ফিরে বেড়ানো যাবে। গগন বলল সেসব ঠিক হয়ে গেছে অবনীবাবুর সঙ্গে…। বিজলীবাবু মাথা নাড়লেন সায় দিয়ে, তবে তো ব্যবস্থা হয়েই গেছে। দু-চারটে হালকা কথার পর গগনরা বিদায় নিল।
বাস স্ট্যান্ডে বাস হর্ন দিচ্ছিল, শেষ সময়ের যাত্রী ডেকে নিচ্ছে। আজ তেমন যাত্রী নেই। এই শীতের সময়টায় সন্ধের বাসে সাধারণত ভিড় থাকে না। ফার্স্ট ক্লাসে কোনও যাত্রী নেই। গগনরা উঠল। পেছনে কিছু যাত্রী বোঁচকা বুচকি নিয়ে বসে কলরব করছে।
বাস ছাড়ল সামান্য পরেই। সঙ্গে সঙ্গে কনকনে বাতাসের ঝাঁপটা এল। পাশের জানলা দুটো তুলে দিল গগন, তাদের মাথার ওপরে মিটমিটে বাতিটা আজ জ্বলছে না। বাজার ছাড়িয়ে আসতেই পৌষের শীতে গায়ে কাঁটা দিল। গগন গলায় মাফলার জড়িয়ে ধীরে সুস্থে সিগারেট ধরাল; হৈমন্তী দুহাতে কান চাপা দিয়ে আচমকা শিউরে ওঠার ভাবটা যেন সামলে নিল।
বাজার ছাড়িয়ে, থানা ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের মধ্যে এসে পড়ল বাস, দুপাশে কোথাও এক ফোঁটা আলো নেই, অসাড় চরাচর, সামনে জোরালো আলোর স্রোত ফেলে বাসটা চলেছে, পেছনে যাত্রীরা কথা বলছে, কাশছে, বিড়ি ফুকছে।
গগন বলল, বেড়াবার ব্যবস্থা ভালই হল, কী বল?
তা হল। কিন্তু আমি তোদের সঙ্গে অত হুড়তে পারব না।
না পারলি; রাত্রে তোকে সঙ্গে নেওয়াও উচিত হবে না। দিনের বেলাটায় থাকবি।
দেখি…, দিনে তো আবার হাসপাতাল।
সে ম্যানেজ করা যাবে।
হৈমন্তী মুখ ফিরিয়ে গগনকে দেখবার চেষ্টা করল, অন্ধকারে তেমন কিছু দেখা যায় না, পেছনের আলোটুকু সম্বল। তোর সুরেশদাকে বলবি নাকি?
বললেই বা! বড়দিনের সময় একটু বেড়াবি তাতে আপত্তির কী আছে।
না, বলবি না।
গগন সিগারেটের ধোঁয়া গিলে নিয়ে হৈমন্তীর দিকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে বসল। হৈমন্তীর গলার কাছে শাড়ির ভাঁজটা ফুলে আছে, চিবুক ঢাকা পড়েছে প্রায়, গায়ের গরম কোটটা কালো, অন্ধকারে শুধুমাত্র মুখটুকু অবস্থা দেখা যায়।
গগন সামান্য অপেক্ষা করে বলল, তোর ব্যাপার-ট্যাপার আমার কাছে মিস্টিরিয়াস লাগছে।
হৈমন্তী কথার জবাব দিল না।
গগন চুপচাপ কিছু ভাবছিল। ধীরে ধীরে কয়েক মুখ সিগারেটের ধোঁয়া খেল, তারপর খুব ঘনিষ্ঠ গলায় মৃদুস্বরে বলল, তোর ইচ্ছেটা কী?
হৈমন্তী এবারও কথার কোনও জবাব দিল না। গগনের সঙ্গে একদিন নিভৃতে তার যেসব কথাবার্তা হয়েছে তাতে অন্তত একটা কথা সে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে, সুরেশ্বরের কাছে তার আর কোনও রকম প্রত্যাশা নেই। ওই মানুষটিকে সে আগে যেমন করে চিনত তার সঙ্গে আজকের সুরেশ্বরের পার্থক্য যথেষ্ট। সে দিনের সাধারণ মানুষ আজ কতখানি অসাধারণ হয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার তার নেই। হতে পারে সুরেশ্বর মাটি ছেড়ে আকাশে উঠেছে, ছোটখাটো সুখ থেকে বড় সুখের অন্বেষণ করছে; কিন্তু তাতে হৈমন্তীর কী? হৈমন্তী কি এসব চেয়েছিল? না, সে চায়নি, চায় না।
