গগনকে নিজের কাছে রাখার পিছনে হৈমন্তীর স্বার্থ ছিল। সে চায়নি গগন সর্বক্ষণ সুরেশ্বরের কাছে থাকে। সুরেশ্বরের হাতে গগনকে ছেড়ে দিলে সুরেশ্বর তাকে কী বোঝাত, কী বলত, কোন যাদুতে বশীভূত করত কিছুই বোঝা যেত না। গগন সুরেশ্বরকে যথেষ্ট মানা করে, পছন্দ করে, এমনকী শ্রদ্ধাও করে। সুরেশ্বর গগনকে বাল্যকাল থেকে দেখে আসছে, গগনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সরল স্নেহপ্রীতির আত্মীয়তার মতনই। গগনের মতন সাধাসিধে সরল ছেলেকে অনায়াসে সুরেশ্বর গালভরা কথায় মিষ্ট ব্যবহারে ভোলাতে তার মর্জি মতন চালিয়ে নিতে পারত। তা ছাড়া, গগন বড় বোকা; দিদির প্রতি তার অনুরাগ এত বেশি যে, সে দিদির জন্যে সুরেশ্বরের কাছে যে কোনও রকম দীনতা প্রকাশ করে ফেলতে পারে। তাদের সংসারের অনেক কথা আছে যা একান্তভাবেই তাদের কথাদুর্বলতার মুহূর্তে গগন কী সে সব কথাও সুরেশ্বরের কাছে না বলে থাকতে পারত।
হৈমন্তী এ সব চায়নি। সে চায় না–তার মা, মামা বা ভাইয়ের কথাবার্তা থেকে সুরেশ্বর বুঝতে পারে তারা দীনতা প্রকাশ করছে। গগন এখানে ভিক্ষা চাইতে আসেনি, সুরেশ্বরের কাছে তারা কেউ আবেদন জানাচ্ছে না, ভিক্ষাও চাইছে না। তাদের সংসারের মর্যাদাটুকু হৈমন্তী নষ্ট হতে দিতে চায় না; সেই সঙ্গে নিজের মর্যাদা।
গগনকে নিজের কাছে রাখার বড় কারণ হৈমন্তী তাকে আগলে রাখবে। গগনকে সে এমন কিছু করতে বা বলতে দেবে না যাতে সুরেশ্বরের অহমিকা বোধ আরও স্ফীত হয়ে ওঠে। সংসারে এমন মানুষ আছে যারা এই অহমিকাকে সম্বল করে আত্মচরিতার্থতা লাভ করে, খুশি হয়। সুরেশ্বর সে-জাতের মানুষ কি না তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হৈমন্তীর নেই, কিন্তু তার বাড়ির লোকের আচরণে যদি কাতর আবেদন ও ভিক্ষার মনোভাব প্রকাশ পায় সুরেশ্বরের অহমিকা বোধ তৃপ্ত হতে পারে। গগনকে হৈমন্তী তেমন কিছু করতে দেবে না, বরং যতটা সম্ভব গগনকে সে সুরেশ্বরের কাছ থেকে তফাত রাখার চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে গগনকে সে তার পক্ষে টেনে এনে সুরেশ্বরের সঙ্গে লড়তেও রাজি, তবু ওই মানুষটার কাছে আত্মসম্মান সে নষ্ট করবে না, কাউকে করতে দেবে না।
সুরেশ্বরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইদানীং প্রায় এক ধরনের বিশ্রী তিক্ততার মধ্যে এসে পড়েছে। সুরেশ্বর পরে আবার চেষ্টা করেছিল হৈমন্তী যেন দুবেলা হাসপাতাল খুলে রাখে, তার সুবিধে মতন। হৈমন্তী দুবেলা হাসপাতালে আসতে রাজি হয়নি, তবে সে আজকাল বেলায় আরও এক ঘণ্টা বেশি থাকে। তাতে তার স্নান খাওয়াদাওয়া বিশ্রামের অসুবিধে ঘটছে। তা ঘটুক, তবু নিজের জেদ থেকে হৈমন্তী নড়বে না। সুরেশ্বর হৈমন্তীর এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছে, হৈমন্তীর জন্যে দুশ্চিন্তা জানিয়েছে, কিন্তু বিষয়টা নিয়ে কোনও পীড়াপীড়ি করেনি।
সেদিন অবনীর সঙ্গে একটু রাত করে ফেরার সময় আশ্রমের বাইরে রাস্তায় সুরেশ্বরকে হৈমন্তী ঘুরে বেড়াতে দেখেছিল। অবনী দেখতে পায়নি। সুরেশ্বর ঠিক কেন যে অন্ধকারে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হৈমন্তী জানে না, তবে তার সন্দেহ হয়েছিল, মালিনীর কাছে হৈমন্তীর একলা স্টেশন যাবার কথা জানতে পেরে, এবং সন্ধের পরও হৈমন্তী না ফিরে আসার জন্যে বিরক্ত বা অসন্তুষ্ট হয়ে সুরেশ্বর ওইভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সন্ধের বাসে যখন ফেরেনি তখন যে অবনীর গাড়িতে ফিরবে একথা জেনেও সুরেশ্বর কেন অধৈর্য হচ্ছিল? হয়তো সে কিছু দেখতে চাইছিল। যদি সুরেশ্বর মনে মনে কিছু দেখার আশা নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করে থাকে সেদিন, তবে সে দেখেৰ্ছে হৈমন্তী আর অবনী পাশাপাশি বসে রাত্রে আশ্রমে ফিরে আসছে।
পরের দিন এ প্রসঙ্গ নিয়ে কোনও কথা ওঠেনি। সুরেশ্বর আসেনি, বা হৈমন্তীকে ডেকে পাঠায়নি। মালিনীকেও কিছু জিজ্ঞেস করেনি হৈমন্তী। হতে পারে, সুরেশ্বর সেদিন রাত্রে শীতের মধ্যে এমনিই ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না, হৈমন্তীর ফেরা না-ফেরার জন্যে তার উদ্বেগ বা ব্যস্ততাও ছিল না। তবু সেদিন যা ঘটেছে তাতে হৈমন্তী কোথায় যেন খানিকটা তৃপ্তি অনুভব করেছে।
কয়েক দিন পরে অন্য রকম এক ঘটনা ঘটল। পাটনা যাবার আগে অবনী দেখা করতে এসেছিল। তখন অন্ধকার হয়ে আসছে, হৈমন্তী বিকেলে খানিকটা বেড়িয়ে ঘরে ফিরেছে, অন্ধ আশ্রমের মাঠে গাড়ি দাঁড়াল অবনীর। হৈমন্তী অবনীকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। অনেকক্ষণ ছিল অবনী, গল্পগুজব করল, চা খেল, তারপর চলে গেল। সুরেশ্বরের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে তার ছিল, কিন্তু গল্পগুজবের মধ্যে উঠি উঠি করেও আর ওঠা হয়নি। শেষ পর্যন্ত সুরেশ্বরের সঙ্গে তার দেখা হয়নি।
পরের দিন বেলায় হাসপাতালের সামনে সুরেশ্বরের সঙ্গে হৈমন্তীর দেখা।
সুরেশ্বর বলল, কাল অবনীবাবু এসেছিলেন?
হ্যাঁ, পাটনায় যাচ্ছেন…
পাটনা! …কখন এলেন কখন গেলেন জানতেই পারলাম না। পাটনা যাবেন জানলে একটা কাজের ভার দিতাম। …কখন যাবেন?
আজ রাত্তিরের গাড়িতে।
ও! …দেখি…, সুরেশ্বর যেন মনে মনে কিছু ভাবল, তারপর বলল, কাল একবার দেখা হলে ভাল হত।
হৈমন্তী পলকের জন্যে সুরেশ্বরের মুখের দিকে তাকাল, তারপর একেবারে আচমকা কেমন যেন কোনও অদ্ভুত এক ইচ্ছার তাড়নায় বলে ফেলল, সময় পাননি। কথায় কথায় দেরি হয়ে গেল।
