হৈমন্তী কোনও কথা বলল না। হেঁট মুখেই বসে থাকল।
গগন অপেক্ষা করল সামান্য, তারপর আবার বলল, দাদার ব্যাপারের পর মার নানা রকম ভয়, মামারও। দাদাকে আমরা বাদ দিয়ে দিয়েছি অনেককাল, দাদাও দিয়েছে। তুইও যদি..
কেন, তুই তো আছিস হৈমন্তী এবার মুখ খুলল, যেন সে আপ্রাণ চেষ্টা করল গগনের কথা সমস্ত গাম্ভীর্য সামান্য হালকা করে আবহাওয়াটা নরম করার।
আমার কথা ছাড়। আমি তো তোর ছোট।
ইস, তুই এখনও কচি খোকা– হৈমন্তী হাসবার চেষ্টা করল।
গগন হেসে হেসে জবাব দিল, আমার এখনও ম্যাচুরিটি হয়নি। তিরিশ একতিরিশ বছর বয়সে আজকাল ছেলেরা বিয়ে-ফিয়ে করে না। দাঁড়া–ওয়েট কর–আগে কেরিয়ারটা তৈরি করেনি তারপর কি আর বসে থাকব!
তোর সেই সাঁতার কাটা মেয়ে বন্ধুটার খবর কী? হৈমন্তী রগড় করে জানতে চাইল।
আরেব্বাস, তার তো সাংঘাতিক বিয়ে হয়ে গেছে–জানিস না। ফরেন সার্ভিসের এক ছোরার সঙ্গে। বিগ ফ্যামিলি। …বুঝলি দিদি, আমি আগে থেকেই বাইলাইনে চলে গিয়েছিলাম; ওসব বিগ ব্যাপারে থাকতে নেই। এখন একটা স্টেনোটাইপিস্ট মেয়ের সঙ্গে প্রেম চালিয়ে যাচ্ছি, নবনীর বোন, তুই দেখেছিস, নামটা বলব? গগন চোখমুখ ফুলিয়ে হাসছিল।
হৈমন্তী হাসতে হাসতে ডান হাত তুলে চড় মারার ভঙ্গি করল, তোর গালে ঠাস করে এক চড় মারব। বড্ড পেকে গিয়েছিস…! পাজি…!
পাকাপাকি কিছু নেই। প্রেম-ফ্রেম না থাকলে এই বয়সটার লাইফ থাকে না। কমলাকে আমার পাশে দেখলেই বুঝতে পারবি তার পাশে আমার লাইফ-ফোর্স কত বেড়ে যায়।
হৈমন্তী খিল খিল করে হেসে উঠল। এমন হাসি সে এখানে কোনওদিন হাসতে পারেনি, কলকাতায় হাসতে পারত। এখানে তার পারিবারিক সম্পর্ক কোথাও নেই, এমন কেউ নেই যার সঙ্গে তার এমন মেহমধুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারে। কলকাতায় মা ছিল, মামা ছিল, গগন ছিল, দু-একজন বন্ধু ছিল। কলকাতায় সে সংসারের একজন মানুষ, পারিবারিক সম্পর্কে, আত্মীয়তায় স্নেহ-বন্ধুত্বে অন্যের সঙ্গে জড়িত; এখানে সে সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন। আশ্রমের মানুষের কাছে সে ডাক্তার, বড়জোর মালিনীর হেমদি। কর্তব্য পালন ছাড়া আর কোনও সম্পর্ক নেই অন্যের সঙ্গে। স্বাভাবিক জীবনের এই আনন্দ ও সুখটুকু থেকে সে বঞ্চিত হবে এমন কথা আগে ভাবেনি। এখন বুঝতে পারে, হৈমন্তীর কলকাতার জীবনটা ছিল ঘরোয়া, সংসারের মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল, ডাক্তারিটা তার পোশাকি জীবন ছিল; বাইরে কাজের সময়টুকু এই পোশাকি জীবনে সে কাটাতে পারত, তাতে অস্বস্তি হত না, কষ্টও থাকত না। কিন্তু এখানে যা হয়েছে তা উলটো, পোশাকি জীবনটাই তার সব হয়ে উঠেছে, পারিবারিক জীবনের স্বাদ কোথাও নেই।
হাসি থেমে গিয়েছিল হৈমন্তীর; অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। শীতের কনকনানি গায়ে লাগল, শিউরে ওঠার মতন কাঁপল একটু। অনেকটা রাত হয়ে গেছে, দশটা বাজল। বাঁ হাতে বাঁধা ঘড়ি দেখে নিয়ে হৈমন্তী এবার নড়ে চড়ে উঠল। দশটা বাজল; নে আর রাত করিস না, শুয়ে পড়। বলতে বলতে হৈমন্তী উঠে দাঁড়াল।
তুই তো কিছু বললি না? গগন শুধোল।
তোর কথা আগে শুনি। মা, মামা কী সব বলে দিয়েছে তোকে মনে করে রাখ, কাল বলিস…
সে আমি সুরেশদাকে বলব।
না, আগে আমায় বলবি।
সুরেশদাকে বলার জন্যেই বলেছে।
বলুক। আমার ব্যাপারে যা বলার আমায় আগে না জানিয়ে তুই কাউকে বলবি না। …মা মামা তোকে এখানে কারও কাছে হাত জোড় করতে পাঠায়নি।
হাত জোড় করার ব্যাপারই নয়..।
না হলেই ভাল। নে শুয়ে পড়, দরজাটা বন্ধ করে দে। হৈমন্তী দরজার দিকে পা বাড়াল।
বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে গগন হেসে বলল, সুরেশদার কাছে তুই আমায় এই জন্যেই থাকতে দিলি না নাকি রে?
কথাটার স্পষ্ট কোনও জবাব দিল না হৈমন্তী। বলল, তোর সঙ্গে কথা বলতে গল্প করতে আমায় ও-বাড়ি ছুটতে হবে নাকি! ওবাড়িতে আমি বড় যাই না। আমার কাছে না থাকলে তোকে পাব কী করে সব সময়…নে,, দরজা বন্ধ করে দে।
অনেক রাত পর্যন্ত হৈমন্তীর ঘুম এল না। গলা পর্যন্ত লেপ টেনে শুয়ে থেকে থেকে সে কখনও চোখ খুলে নিবিড় অন্ধকার দেখছিল, কখনও চোখের পাতা বুজে ঘরের মধ্যে সঞ্চিত মাঝরাতের শীতে অস্বস্তি বোধ করছিল। তার কপাল ঠাণ্ডা, নাকের ডগাও তেমন গরম নয়, নিশ্বাসও ভারী হয়ে উঠেছে। এই শীত তাকে নিদ্রাহীন করছিল কিনা বলা যায় না, তবে শীতের প্রতি তার তেমন মনোযোগ ছিল না; সে অন্য চিন্তা করছিল, চিন্তা থেকে যখন মন সরে যাচ্ছিল শীতের স্পর্শে সামান্য অস্বস্তি বোধ করছিল। চিন্তা এবং উদ্বেগেই তার ঘুম আসছিল না।
গগন এসেছে: কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে হৈমন্তী জানে। সুরেশ্বর এবং গগনের মধ্যে কাল পরশু বা দু-একদিনের মধ্যে যে কথাবার্তা হবে হৈমন্তী তা অনুমান করে নিচ্ছিল এবং ভাবছিল। সুরেশ্বরের মনোভাব সম্পর্কে হৈমন্তীর নতুন করে আর বেশি কিছু জানার নেই, এই কমাসে ক্রমশ তা জানা হয়ে গেছে, এখন-হৈমন্তী প্রায় নিশ্চিতরূপে বলতে পারে, সুরেশ্বর গগনকে নিরাশ করবে। গগন তা জানে, কিংবা মনে মনে তার কিছুটা সন্দেহ দেখা দিলেও সে সুনিশ্চিত করে কিছু জানে না। মা আর মামাও এতটা বোঝেনি, জানতে পারেনি। হৈমন্তী কলকাতায় গিয়ে যে কদিন ছিল মাকে, মামাকে তার এই ব্যর্থতার বিষয় বুঝতে দেয়নি। কিন্তু এখন গগন এখানে আসার পর সুরেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি কথার পর কারও কিছু অজানা থাকবে না।
