হৈমন্তী ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সে মোটামুটি জানে মা কী বলেছে, কী বলতে পারে, কেনই বা গগন এখানে এসেছে। শুধু যে বেড়াবার উদ্দেশ্যেই গগন এসেছে তা তো নয়।
হৈমন্তী বলল, তুই আমার সঙ্গে কথা না বলে কিছু বলবি না কাউকে।
গগন কথার ধরন থেকে বুঝতে পারল দিদি কী বলতে চাইছে। তবু যেন বোঝেনি এমনভাবে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল।
সামান্য চুপচাপ, গগন আলোর দিকে ধোঁয়ার একটা রিং ছুঁড়ে দেবার চেষ্টা করল, পারল না। পরে বলল, সুরেশদাকে অনেক দিন পরে দেখলাম। সেই সেবারে কলকাতা গিয়েছিল আর এই বছর দু আড়াই হবে প্রায়। …শরীর স্বাস্থ্য কিন্তু বেশ ভালই আছে। মাছ মাংস খায়, না ছেড়ে দিয়েছে?
মাংস এখানে হয় না।
বলিস কী?
পয়সায় কুলোয় না। …মাছ-টাছ পাবি মাঝে মাঝে, নদীটদী থেকে ধরে আনা চুনো মাছ। স্বাদ আছে।
বলিস কী! আগে তো বলিসনি।
বলেছিলাম, ভুলে গিয়েছিল হৈমন্তী হাসল। কথাটা হৈমন্তী বাস্তবিকই বলেছিল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। হয়তো বলেনি। সে নিজেও মাংস খায় না, খেতে ভাল লাগে না। কলকাতায় থাকতেই ছেড়ে দিয়েছে।
ভাইকে সান্ত্বনা দেবার জন্যেই যেন হেসে হেসে হৈমন্তী বলল, তোর ঘাবড়াবার কোনও কারণ নেই গগন, মাংস খেতে চাস ব্যবস্থা করে দেব। ডিম খাবি, নদীর মাছ খাবি, শাকসবজি টাটকা সব– এখানকার বাগানের। সাত দিনে ফুলে যাবি। ..
তুই কিন্তু ফুলিসনি, গগন হাসল।
বলিস না; কলকাতার জামা এখন আমার গায়ে আঁট-আঁট লাগে।
মনে তো হয় না। তবে তোর শরীর খারাপও হয়নি। রংটা কেমন পুড়ে গেছে।
শীতে এখানে ভীষণ টান ধরে, আর রোদ; সকাল তোক দেখবি কী তেজ রোদের।
গগন হৈমন্তীর চোখ মুখ এতক্ষণ লক্ষ করে করে একটা কিছু সন্দেহ করছিল। এবার বলল, এত ভাল জায়গা, কমাস ধরে রয়েছিস–কিন্তু যতটা ভাল দেখানো দরকার ততটা ভাল তোকে দেখাচ্ছে না…কলকাতায় পুজোর সময় যা দেখেছি তার চেয়ে ভাল না, বরং তোর মুখে.. কথা শেষ করল না গগন।
হৈমন্তী ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক, তার মুখের ভাব হঠাৎ মলিন হয়ে এল, যেন সে এখন আর কিছু গোপন রাখতে চাইছে না বা পারছে না। চোখের দৃষ্টিতে এই ভাবটা ফুটে ওঠার পর হৈমন্তী হয়তো সচেতন হয়েছিল, হয়ে সে যথাসম্ভব নিজেকে সংযত করতে চাইল। এমন সময় বাইরে মালিনীর গলা শোনা গেল।
হৈমন্তী সাড়া দিল।
মালিনী ঘরে এল। হাতে একটা কাঠের বড় পিড়ি, তার ওপর মাটির ছোট উনুন; ছোটদের খেলাঘরের উনুনের মতন। কাঠ কয়লার আগুন করে এনেছে। উনুনটা নামিয়ে রেখে মালিনী হৈমন্তীর দিকে তাকাল, গরম জল দেব কলঘরে?
হৈমন্তী একটু অবাক হয়েছিল। ঘরে এই আগুন দেবার জন্যে বা গরম জল করার জন্যে সে মালিনীকে বলেনি। নিজে বুদ্ধি খাঁটিয়েই মালিনী করেছে। খুশি হয়ে হৈমন্তী বলল, গরম জলও করেছ! বাঃ! মালিনী বড় গুণের মেয়ে– বলে ভাইয়ের মুখের দিকে হেসে তাকাল।
মালিনী অপ্রস্তুত বোধ করল সামান্য, নিচু গলায় বলল, দাদা যাবার সময় আমায় বলে গিয়েছিলেন।
এই আতিথ্য পালনের ব্যবস্থাগুলো তবে সুরেশ্বরের নির্দেশে হচ্ছে! হৈমন্তী কিছু বলল না। মালিনী সামান্য দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল।
গগন বলল, তা হলে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলি, কী বল!
হ্যাঁ; জামাকাপড় ছেড়ে তুই আয়, কলঘরে জল দিতে বলছি। হৈমন্তী কেমন অন্যমনস্ক গলায় বলল, বলে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে ভাইবোনে গল্প হচ্ছিল। গগন বিছানার ওপর একটা র্যাগ চাপিয়ে বসে, হৈমন্তী শাল মুড়ি দিয়ে ক্যাম্বিসের চেয়ারে বসে। পায়ে ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে মোজা পরেছে। দুজনের সামনে কাঠের তক্তার ওপর সেই কাঠকয়লার উনুন, তার আঁচ নিবে এসেছে প্রায়।
কলকাতার বাড়ির কথা, মা আর মামার কথা, চেনাজানা কারও কারও কথার পর প্রসঙ্গটা শেষাবধি ফুরিয়ে গেলে দুজনেই থেমে গেল। অল্প সময় চুপচাপ। তারপর গগন বলল, তোদের সেই ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের খবর কী?
কে, অবনীবাবু?
হ্যাঁ
আছেন। পাটনায় যাবার কথা ছিল, অফিসের কাজে। গিয়েছিলেন জানি। ফিরে আসার কথা। এ কদিন আর স্টেশনে যেতে পারিনি।
তুই কি স্টেশনে যাস নাকি?
যাই; মাঝে মাঝে যাই। …এখানে মুখ বুজে থাকা, কথা বলার মতন মানুষ নেই একটা কথা বলতে হলে ওই মালিনী। কত আর পারা যায়!
সুরেশদা…
ও-সব বড় বড় মানুষ, ওদের কথা আলাদা। গল্পগুজব করে সময় নষ্ট করার অবসর নেই। হৈমন্তী প্রসঙ্গটা অন্যভাবে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও তার কথার স্বরে নৈরাশ্য ও চাপা বিরক্তি ছিল।
গগন নির্বোধ নয়, তার কানে হৈমন্তীর মনের বিরূপতা ধরা পড়ল। হৈমন্তীর চোখ লক্ষ করল গগন, পরে বলল, তোকে তো তেমন খুশি মনে হচ্ছে না।
হৈমন্তী ভাইয়ের দিকে তাকাল না। নিচু মুখে শালের পাড় খুঁটতে লাগল। বলল,অখুশির কী বুঝলি!
গগন সঙ্গে সঙ্গে কোনও জবাব দিল না। হাত দুটো উনুনের আঁচে দেবার জন্যে ঝুঁকে বসল, তাত নেবার চেষ্টা করল, আগুন নিবে গেছে, সামান্য একটু তাত, ঠিক মতন অনুভব করাও যায় না।
আমি তো এই ব্যাপারটা সেটেল করতে এসেছি গগন ধীরে ধীরে বলল, মার পক্ষে এরকম ভাবে বসে থাকা আর সম্ভব নয়। অনেক বয়েস হয়ে গেছে, শরীর খারাপ, আজকাল সবসময় দুশ্চিন্তা করে। মামা বুড়ো মানুষ, সারাটা জীবন আমাদের নিয়ে থাকল, মামাও এখন আর শুনতে চায় না। কে কবে চোখ বুজবে সেই ভাবনায় পড়েছে আজকাল, দায়দায়িত্বটুকু সেরে ফেলতে চায়।
