.
১৯.
বড়দিনের ছুটির সময় সময় গগন এল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই শীত প্রচণ্ড হয়ে উঠেছিল; সেই শীতের আঁচড় প্রত্যহ যেন আরও ধারালো ও তীক্ষ্ণ হচ্ছিল। গুরুডিয়ায় পা দিয়েই গগন বলল, আরে বাপস, বরফ-টরফ পড়বে নাকি রে এখানে? হৈমন্তী হেসে জবাব দিল, থাকছিস তো, পড়লে দেখতে পাবি।
গগনকে দেখলেই হৈমন্তীর সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্কটা অনুমান করা যায়। দুজনের মুখের আদল প্রায় এক, চোখ মুখ কপালের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। তবু পুরুষ বলে গগনের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, সব যেন ছিমছাম কাটাকাটা। তার নাক হৈমন্তীর তুলনায় শক্ত এবং উঁচু, ঠোঁট কিছুটা পুরু ও বড়। চিবুকেরও সামান্য পার্থক্য আছে। গগনের গায়ের রং ফরসা, তবে মেয়ে বলে হৈমন্তীর গায়ের রঙে যে মসৃণতা এবং কোমলতা আছে গগনের তা নেই। সুশ্রী, সপ্রতিভ, হাসিখুশি মেজাজের ছেলে গগন, বয়সে হৈমন্তীর চেয়ে বছর চারেকের ছোট। দিদির সঙ্গে তার সম্পর্কটা বরাবরই সঙ্গী এবং বন্ধুর মতন। বড় ভাই, হৈমন্তীরও বড়, সেই দাদার সঙ্গে এই দুই ভাইবোনের সম্পর্ক না থাকার মতন। চা বাগানের সেই সাহেবদাদা আর তার সিকি-মেমসাহেব বউ তাদের আত্মীয় এই মৌখিক পরিচয়টুকু ছাড়া আর কিছুই নেই বলা যায়। যোগাযোগ দেখাসাক্ষাতও নেই, এমনকী মার সঙ্গে চিঠিপত্রেও দাদা যেটুকু সম্পর্ক বজায় রাখত একসময়, আজকাল তাও রাখে না। দাদার সঙ্গে তাদের দুজনের বয়সের যথেষ্ট পার্থক্য ছিল; বাবা বেঁচে থাকতেই দাদা দুরে দুরে সরে যায়, তার পর বিয়ে করে, বিয়েটা সে নিজের খেয়ালখুশিতে করেছিল, সংসারের বা মার মতামত নেয়নি, গ্রাহ্যও করেনি। তখন থেকে দুপক্ষের মধ্যে সম্পর্কে বড় রকমের ফাটল ধরে যায়। হৈমন্তীর অসুখের সময় দাদার ব্যবহার দেখে এরা বুঝে নিয়েছিল ওপক্ষ কোনওভাবেই আর এদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক নয়; দায় দায়িত্বও অস্বীকার করতে ওদের বাধছে না। তখন থেকেই যোগাযোগ ভেঙে গেছে; মা ও মামা বছরে একটি দুটি সাধারণ চিঠি লেখে মাত্র, দাদাও সেই রকম জবাব দেয়। কাজেই পারিবারিক ও সাংসারিক সম্পর্ক যা তা এই দুই ভাইবোনেই গড়ে উঠেছে বরাবর, দাদার কথা তারা ভাবে না, ভাবতেও পারে না।
গগন এসে গুরুডিয়ায় অন্ধ আশ্রমেই উঠল। সুরেশ্বরের ইচ্ছে ছিল গগন তার কাছেই থাকবে, তার বাড়িতে। হৈমন্তীর তাতে তেমন আগ্রহ ছিল না; তার ইচ্ছে ছিল গগন তার ঘরের পাশাপাশি থাকে। হৈমন্তী আর মালিনীর ঘরের গায়ে গায়ে ছোট মতন একটা ঘর ছিল, নানা রকম অকাজের জিনিসপত্র জড়ো করা ছিল। গগন আসার আগে আগে এই ঘর পরিষ্কার করাল হৈমন্তী। একটা তক্তপোশের ব্যবস্থাও হল, নিজের ঘর থেকে ক্যাম্বিসের হেলান-দেওয়া নতুন চেয়ারটা গগনের জন্যে তার ঘরে এনে রাখল, ছোট একটা বেতের টেবিল জোগাড় করে আনল মালিনী। মোটামুটি বেশ মানিয়ে গেল ঘরটা।
সুরেশ্বর ঘরের ব্যবস্থা দেখতে এসেছিল সকালে; দেখে শুনে বলল, বাঃ, বেশ হয়েছে।
বিকেলে সুরেশ্বর আর হৈমন্তী দুজনেই স্টেশনে গেল গগনকে আনতে। শীতের সন্ধে দেখতে দেখতে ঘুটঘুঁটে হয়ে এসেছিল, সেই অন্ধকারে আর শীতে বাসে করে ওরা গুরুডিয়া এল, গগনকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে সুরেশ্বর সামান্য বসে চলে গেল। ততক্ষণে রাত হয়ে আসছে, শীতও পড়ছে।
শীতের প্রকোপ দেখে গগন বলল, আরে বাপস, বরফ-টরফ পড়ে নাকি রে এখানে?
ভাইয়ের বিছানাপত্র পেতে দিতে দিতে হৈমন্তী হেসে জবাব দিল, থাকছিস তো, পড়লে দেখতে পাবি।
দু-চারটে সাধারণ ঘরোয়া কথার পর গগন বলল, সুরেশদা তখন কী যেন বলছিল রে?
কিছু না। ওর বাড়িতে থাকার কথা বলেছিল প্রথমে, আমি না করে দিয়েছিলাম।
ওর বাড়িটা কী রকম?
এই রকমই প্রায়, মাটির গাঁথনি; খান দুয়েক ঘর আছে। কাল দেখিস।
কিছু মনে করল না তো?
মনে করার কী আছে, আমার বাড়ির লোক এসে আমার কাছে উঠবে না তার কাছে!
গগন বিছানার পাশে ক্যাম্বিসের হেলানো চেয়ারটায় বসে ছিল। গাড়িতে উঠেছে বেলা দশটা নাগাদ। একটু ভিড় ছিল আজ। ট্রেনের ধকলে সামান্য ক্লান্ত হয়তো, কিংবা কলকাতা শহরের হইহট্টগোল কলরব আলো থেকে হঠাৎ এই নির্জন নিস্তব্ধ অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়েছে বলে অনভ্যস্ত অজানা অচেনা পরিবেশে নিজেকে এখনও তেমন সইয়ে নিতে না পারার জন্যে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক ও ম্লান হয়ে পড়ছিল।
বিছানার ওপর একটা র্যাগ পেতে বিছানা ঢাকা দিয়ে দিল হৈমন্তী; অন্য র্যাগটা পাট করে পায়ের কাছে রাখল। বলল, তোর বিছানায় র্যাগ ঢাকা দিয়ে রাখলাম, বিছানা গরম থাকবে। পায়ের কাছে। আর-একটা থাকল।
গগন তাকিয়ে তাকিয়ে বিছানা দেখল, অন্যমনস্কভাবে ঘরের চারপাশ তাকাল, হাই তুলল।
হৈমন্তী বিছানার পাশে বসে। ঘরের জানলা বন্ধ, দরজা প্রায় ভেজানো।
গগন হঠাৎ বলল, এই ঠাণ্ডায় তোর কষ্ট হয় না?
এ কদিন একটু হচ্ছে, রাত্রের দিকে, দিনের বেলায় হয় না। দিনের বেলাটা খুব চমৎকার।
তোর শরীর খারাপ হবে না তো? গগনের গলায় চাপা উদ্বেগ ছিল।
হৈমন্তী মাথা নাড়ল, না। আমি তো সাবধানেই থাকি।
গগন এবার সিগারেট বের করে ধরাল। ধোঁয়া টানল খানিক, তারপর বলল, মা আমায় অনেক কিছু বলে দিয়েছে, বুঝলি। মামাও।
কী বলেছে?
সে অনেক কথা। আমায় আবার পয়েন্ট ওয়ান টু করে সাজিয়ে মনে করে নিতে হবে– গগন হাসল, পরে বলব।
