অবনী এল। চলুন, আমার হয়ে গেছে।
হৈমন্তী পিছু ফিরে তাকাল। গলার পাশ দিয়ে মোটা একটা মাফলার ঝুলছে অবনীর, হাতে টর্চ। দু পলক তাকিয়ে থাকল হৈমন্তী।
গরম আর কিছু গায়ে দেবেন না?
না, আর দরকার হবে না।
ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
লাগবে না।
হৈমন্তী এগিয়ে এসে সোফার ওপর থেকে তার লম্বা গরম কোটটা তুলে নিয়ে গায়ে দিল।
গাড়িতে এসে ওঠার সময় হৈমন্তী বলল, গাড়ি যদি ধীরে চালান তবে সামনে বসি। বসুন।
হৈমন্তী গাড়িতে উঠল। হালে জিপগাড়িটার কিছু সংস্কার সাধন করা হয়েছে। আগে মাথায় ছিল ক্যানভাস, এখন অ্যালুমিনিয়াম শিট দিয়ে মাথা ঢাকা হয়েছে, পিছনটা ঢেকে দিয়ে গায়ে নতুন ক্যানভাস জড়ানোও হয়েছে সদ্য। এসবই অবনীর সুবিধে মতন সে করিয়ে নিয়েছে, নয়তো এই সর্বদিক খোলা গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করতে তার অসুবিধে হচ্ছিল; দরকারি জিনিস, কাগজপত্র নষ্ট হচ্ছিল পথে।
হৈমন্তী আজ পিছনে বসল না; পিছনে বসলে কথাবার্তা বলতে, গল্প করতে বড় অসুবিধে হয়; একজনের ঘাড়ের দিক মুখ করে সারাক্ষণ বসে থাকা বা কথা বলা বড় বিশ্রী, মুখ দেখা যায় না, জোরে জোরে চেঁচিয়ে কথা বলতে হয়। তা ছাড়া, বাইরের এই বাতাসের ঝাঁপটা পেছনে বেশি লাগে, সামনে বসলে কাচের আড়াল পাওয়া যায়, গায়ের পাশ দিয়ে বাতাস কাটিয়ে নেওয়া চলে।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় আসতে চোখে পড়ল, আকাশে বাঁকা চাঁদ উঠে আছে।
বাজার পর্যন্ত বড় একটা কথা হল না, সাধারণ কিছু বাক্য-বিনিময়। বাজার পেরিয়ে থানার দিকে পিচের রাস্তাটা ধরতেই আশেপাশে বাড়িঘর আলো কমে এল, তারপর থানা পেরুতেই সব যেন দপ করে নিবে গেল এবং লোকালয় অদৃশ্য হল। অবনী বেশ ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিল।
ঘরে বসে হৈমন্তীর যদি কোনও অস্বচ্ছন্দ বোধ হয়ে থাকে বাইরে পথে এসে এবং অন্ধকারে তা হচ্ছিল না। বরং তার ভাল লাগছিল। শীত অনুভব করলেও কয়েক প্রস্তু পোশাকের দরুন সে কাঁপছিল না বা বাতাসের ঝাঁপটা গায়ে লাগতে দিচ্ছিল না। অথচ হাতের আঙুল, নাক কান ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল।
অবনী যেন কিছু বলতে যাচ্ছিল, হৈমন্তী তার আগেই বলল, গগন এলে একটু বেড়াবার ইচ্ছে আছে। চারদিকেই শুনি বেড়াবার নানা জায়গা। একদিন টাউনে যাব।
যাননি এখনও?
একদিন দুপুরে গিয়েছিলাম, বিকেলেই ফিরতে হল…
চলুন একদিন…
গগন আসুক।
এলে আর-একবার হবে, তবে পরশু যদি যেতে চান আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। পরশু দিন আমায় যেতে হবে একবার, কাজ আছে।
কখন যাবেন?
বেলা দশটা নাগাদ—
না, আমার যাওয়া হবে না।
কেন?
হৈমন্তী কী একটু ভাবল, বলল, ওপরঅলার হুকুম নেই। বলে হাসবার চেষ্টা করল।
অবনী মুখ ঘুরিয়ে দেখল। তারা যে ভাবে যে-স্বরে ওপরঅলা শব্দটা বলে হৈমন্তী ঠিক সেইভাবে বলল। অনুকরণে ভুল হয়নি। কিন্তু এ ধরনের অনুকরণে যা থাকার কথা নয় হৈমন্তীর বলার মধ্যে তা ছিল।
অবনী হেসে বলল, আপনার আবার ওপরঅলা কোথায়? সুরেশ্বর…
হৈমন্তী হাসল না। বেলা একটা পর্যন্ত আমার হাসপাতাল; তার এদিক ওদিক করা যাবে না।
ভীষণ কড়া নিয়ম তো।
এই নিয়মটা অবশ্য আমার। ওরা আরও বেশি সময় থাকতে বলে। দিন দুপুর সন্ধে। আমি রাজি না। তাই নিয়ে গোলমাল চলছে।
গোলমাল? অবনী মুখে হাসছিল, কিন্তু মনে মনে সে বুঝতে পারছিল কোথাও একটা মনান্তর চলছে বোধহয়।
হৈমন্তী মাথা নাড়ল, বলল, সেই রকম।
গাড়ি দেখতে দেখতে অনেকটা চলে এসেছে। স্টেশনে আসার শেষ বাসটা পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। দুপাশ উঁচু নিচু মাঠ, আর গাছপালা; অন্ধকারে খুব ফিকে চাঁদের আলো জড়ানো, মাঠময় বাতাস ছুটছিল, শীত যেন আরও ঘন হয়ে এসেছে এখানে।
অবনী গাড়ি চালাতে চালাতেই একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। বলল, আপনার ওপরঅলা কিন্তু সব সময় আপনার সুখ্যাতি করেন।
করেন…
সেদিনও আমার কাছে প্রচণ্ড সুখ্যাতি করছিলেন।
কী হিসেবে? ডাক্তার হিসেবে তো?
হ্যাঁ; আর কীসের করবেন?
ডাক্তার হিসেবেই আমার যেটুকু দাম… হৈমন্তী হঠাৎ বলে ফেলল। বলে চুপ করে গেল।
অবনী এবার আর মুখ ফেরাল না। সে অনুভব করতে পারল হৈমন্তীর কোথাও যেন একটা ক্ষোভ জমে জমে ভারী হয়ে গেছে। আগে বোঝা যেত না, পরে অল্প অল্প বোঝা যাচ্ছিল, এখন তা আরও স্পষ্ট, প্রকাশ্য। সুরেশ্বরের সঙ্গে হৈমন্তীর ঠিক কোথায় যে মনোমালিন্য ঘটতে পারে অবনী তা অনুমান করে আজকাল। কিন্তু সে বুঝতে পারে না–স্বেচ্ছায় যে কলকাতা থেকে নির্বাসন নিয়ে এই বন-জঙ্গলের দেশে চলে এসেছে তার মধ্যে হটকারিতা বেশি, না কি অনুরাগ, অথবা আদর্শ? আদর্শ নয়। কেন না এই কমাসের পরিচয়ে অবনী নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছে অন্ধ আশ্রমের আদর্শ বা আকর্ষণ হৈমন্তীর নেই। আদর্শ যখন নেই তখন অনুরাগ ভিন্ন আর কিছু থাকে না; সুরেশ্বরের প্রতি অনুরাগবশেই হৈমন্তী সব ছেড়ে এসেছে। এই অনুরাগ কী এখানে এসে ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেন? হৈমন্তী কী আশা নিয়ে এসেছিল, কোথায় সে ব্যর্থ হল, তার আশাভঙ্গের যথার্থ কারণ কী? হৈমন্তী কি তার দিল্লির বান্ধবীর মতন হতে পারলে সুখী হত?
অবনী লাটঠার মোড় সামনে দেখতে পেল; বলল, গুরুডিয়ায় যাবেন, না বেড়াবেন একটু?
বেড়াই…
শীত করছে না?
না, তেমন নয়।
আর একটু সরে বসুন, বাতাস লাগবে না।
হৈমন্তী আরও একটু অবনীর দিকে সরে বসল। অবনী সামনে তাকিয়ে খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে লাগল, যেন এই পথে, নির্জনে, প্রান্তর আর অতিম্লান ঈষৎ নক্ষত্রের আলোর মধ্যে তারা দুজনে ঘনিষ্ঠ ও অন্যমনস্কভাবে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।
