মহিন্দর চলে গেলে হৈমন্তী চা ঢেলে অবনীর দিকে এগিয়ে দিল।
অবনী বলল, আসছে হপ্তায় আমাকে হয়তো একবার পাটনা যেতে হবে।
পাটনা! কেন?
ওপরঅলার ডাক।
সেই ব্যাপারটা নাকি?
বুঝতে পারছি না। হতেও পারে। অবনী একটুকরো ওমলেট মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে চিবোতে লাগল। তারপর বলল, নতুন যে কনস্ট্রাকসানের তোড়জোড় হচ্ছে সে ব্যাপারেও হতে পারে।
হৈমন্তী চায়ের পেয়ালা নামিয়ে রেখে চামচ করে ওমলেট কাটতে বলল, জীবনে উন্নতি হয় না বলে লোকে আফশোস করে, আর আপনার ঠিক উলটো; উন্নতি পায়ে ধরে সাধছে আপনিই মুখ ফেরাচ্ছেন।
অবনী হাসির মুখ করল। বিজলীবাবুও তাই বলেন।
সকলেই বলবে; বিজলীবাবু আপনার বন্ধু.
সামান্য চুপ করে থাকল অবনী, চা খেলা শেষে বলল, এই তো বেশ আছি এখানে। উঁচু চেয়ারে বসার অনেক ঝামেলা।
ঝামেলা এড়াবার জন্যে প্রমোশান নেবেন না?
অবনী হৈমন্তীর চোখে চোখে তাকাল, পরে চোখ সরিয়ে নিল। এসব চাকরি–বিশেষ করে এখানে বাঙালি হয়ে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা মুশকিল। অনেক রকম ক্লিক থাকে। আমার কোনও ইন্টারেস্টও নেই।
হৈমন্তী ওমলেট মুখে তোলার আগে অবনীকে দেখতে দেখতে বলল, আপনার যেন কোনও বড় অ্যামবিশানও নেই।
না, নেই। অবনী হাসিমুখে জবাব দিল।
কেন?
কী হবে বড় অ্যামবিশনে।
বেশি মাইনে, প্রতিপত্তি, খ্যাতি। হৈমন্তী হাসি হাসি মুখে বলছিল, এসব তো শুনেছি হয়।
এই মাইনেতে আমার কুলিয়ে যায়, খুব একটা অভাব বোধ করি না।
একলা আছেন বলে। পরে… হৈমন্তী অসতর্কভাবে বলে ফেলল।
অবনী আবার চোখ তুলে স্পষ্ট করে হৈমন্তীর চোখ মুখ দেখল। পরিহাস হয়তো, তবু মেয়েলি কৌতূহলে হৈমন্তীর একথা মনে হওয়া বিচিত্র নয় বা সে-কৌতূহল প্রকাশ করাও অন্যায় নয়। অবনী বলল, ভবিষ্যতের কথা আমি বড় একটা ভাবতে পারি না। ওটা আমার ডিফেক্ট.
প্রতিপত্তি চান না–এটাও বোধহয় তাই, হৈমন্তী যেন আগের অসতর্ক কথাটা মোছবার জন্যে বলল, বেশ জোরে জোরে হেসে।
অল্পস্বল্প প্রতিপত্তি আমার এখানেও আছে– অবনীও পরিহাসের গলায় জবাব দিল।
পুরুষমানুষ প্রতিপত্তির খুব ভক্ত। অহঙ্কার, প্রতিপত্তি, মর্যাদা–এসব তার ভূষণ… হৈমন্তী যদিও পরিহাসের মতন করে বলেছিল তবু কথাগুলো ঠিক পরিহাসের মতন শোনাল না।
অবনী অনুভব করতে পারল হৈমন্তীর বলার ভঙ্গিতে পরিহাসে থাকলেও কেমন এক তিক্ততা প্রচ্ছন্ন রয়েছে, যেন চাপা উপহাস করল হৈমন্তী। অবনী স্পষ্ট কিছু অনুমান করতে পারল না, তবে তার মনে হল, হৈমন্তীর আজকের আচরণটা কিছুটা বিসদৃশ।
এত ভূষণ গায়ে চাপালে হাঁটা যায়? লঘু স্বরে অবনী বলল।
যাবে না কেন, যায়। হৈমন্তীর ঠোঁটের কিনারা বঙ্কিম হল।
তবে তিনি পুরুষ নয়, মহাপুরুষ। অবনী ঠাট্টা করে বলল। চা শেষ করেছে অবনী, ধীরে সুস্থে সিগারেট ধরাল।
আরও একটা বই বেছে নিয়ে হৈমন্তী অন্যগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে মুখ নিচু করে বলল, আপনার উদ্যোগ নেই, উদ্যোগ থাকলে মহাপুরুষ হওয়া যায়।
হ্যাঁ, আমি স্বভাবে খানিকটা ইন-অ্যাকটিভ অবনী হাসল।
বই থেকে চোখ তুলে হৈমন্তী বাকি চাটুকু শেষ করে অবনীর দিকে তাকাল। দুমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, উঠবেন?
আমার তাড়া নেই; আরও কিছুক্ষণ বসতে পারেন।
আমার বই বাছা শেষ হয়ে গেছে–আর মাত্র একটা নেব… বলে হৈমন্তী সামান্য দ্রুত হাতে অন্য একটা বই বাছতে লাগল।
অবনীর একটা বইয়ের ওপর চোখ পড়েছিল। বলল, ওই–ওই বইটা নিতে পারেন, ঠিক ক্রাইম বা মিস্ত্রি নয়, তবে পড়তে মন্দ লাগবে না।
এইটে…? হৈমন্তী একটা বই তুলে দেখাল।
না, নীচেরটা, আপনার কোলের ওপর
হৈমন্তী কোল থেকে বইটা তুলে নিল: এ রুম ফর টু। নামটা দেখল হৈমন্তী, মুখে কিছু বলল না, বেছে রাখা বইয়ের মধ্যে রাখল।
সন্ধে গাঢ় হয়েছে। অবনী ঘড়ি দেখল। পৌনে সাত। হৈমন্তী সময় জিজ্ঞেস করল, সময় বলল অবনী। তারপর চুপচাপ, যেন এখানে কাজ হঠাৎ সব ফুরিয়ে গেছে। নীরবে বসে হৈমন্তী তার ব্যাগের মধ্যে বইগুলো ভরতে লাগল। অবনী চুপচাপ। ঘরের বাতিটা সামান্য মৃদু হয়ে আবার জোর হয়ে উঠল। বাইরে বাতাসের শব্দ প্রখর হলে শোনা যাচ্ছিল।
চলুন উঠি, হৈমন্তী বলল।
চলুন। একটু দাঁড়ান, জুতোটা পায়ে গলিয়ে আসি। অবনী উঠল, উঠে পাশের ঘরে চলে গেল।
হৈমন্তী ব্যাগের মুখ বন্ধ করল, মুখ মুছল রুমালে, দুহাতে কপালের চুলগুলো সামান্য ঠিক করল। বসে থাকতে ভাল লাগছিল না, উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করল সামান্য, দেওয়ালে টাঙানো অবনীর তরুণ বয়সের ছবিটা দেখল। খুব নিরীহ আর ভিতু ভিতু দেখায়, এখানকার চেহারার সঙ্গে বেশ তফাত। অবনী কখনও নিজের পারিবারিক কথা বলে না কেন? হৈমন্তী প্রায় সবই বলেছে, মা মামা দাদা বউদি গগনের কথা। অবনীর যেন এসব পারিবারিক কথায় আগ্রহ নেই। হৈমন্তী জানলার দিকে সরে গেল। বাইরে অন্ধকারে হিমের সঙ্গে ধোঁয়া জমেছে সামান্য, কাছে স্টেশন, ইঞ্জিনের ধোঁয়া এ-সময় একটু জমে থাকে এখানে, উত্তরের বাতাস শনশন করে বইল, এই ঠাণ্ডায় এবং বাতাসে অবনী গুরুডিয়ায় যাবে আবার আসবে ভেবে যেন হৈমন্তী কিছুটা সঙ্কোচ অনুভব করল।
আজ তার কী রকম যেন লাগছে। অবনীর বাড়িতে সে একটু দেরি করেই এল। কেন এল? একবার এমন কথাও মনে হয়েছিল আসবে না। আজ অকারণে তার কোথাও যেন কিছুটা দ্বিধা এবং সঙ্কোচ জাগছিল। সেই-তখন থেকে লাঠায় আসবার সময় থেকে বাসে ওঠা, এবং বাসে আসতে আসতে, বাজারে নেমে (বাজারে সে ইচ্ছে করেই আগে ভাগে নেমে সময় কাটাচ্ছিল এবং মন স্থির করে নিচ্ছিল) বাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসার সময় প্রায়ই তার ওই বিশ্রী চিন্তাটা কাঁটার মতন ফুটছিল; সুরেশ্বরের ঈর্ষা ও সন্দেহ, এবং অবনীর মুখ মনে ভাসছিল। এ বড় অদ্ভুত চিন্তা। যেন একের সঙ্গে অন্যটা জড়ানো। যদিও এই ঈর্ষা ও সন্দেহ অসম্ভব। হৈমন্তী বিশ্বাস করে না। তবু..তবু। অবনী সম্পর্কে তার এধরনের কোনও কোনও ভাবনা সজ্ঞানে হয়নি এযাবৎ, এখন হচ্ছে, যদিও সেটা প্রায় কিছুই নয়, তবু ভাবনাটাই কেমন অকারণে তাকে সঙ্কুচিত করছিল। শেষ পর্যন্ত হৈমন্তী চলে এল, কিন্তু অবনীর সামনে মাঝে মাঝে অস্বস্তি বোধ করেছে যে তাতে সন্দেহ নেই। এ রকম কেন হবে সে বুঝতে পারছিল না। আজ সে অবনীর সামনে হয়তো কিছু এলোমেলো কথা বলেছে, হয়তো অন্য দিনের মতন সপ্রতিভ হতে পারেনি। যদিও তার চেষ্টা করেছিল। এমনকী হৈমন্তী যেন গোপনে সুরেশ্বরের প্রতি তার মনের বিরূপতাও আজ কিছু প্রকাশ করে ফেলেছে। অবনী বোধহয় কিছু বুঝতে পারেনি। কিংবা পেরেছে হয়তো। কে জানে!
