‘এখন তো আর মেয়েটিকে খুঁজে বার করা সম্ভব নয় যে, তার হাতে দিয়ে আসবে।’
বাস কাঁকুড়গাছির মোড়ে। রোহিণী ধড়মড়িয়ে উঠে ধাক্কাধাক্কি করে সিঁড়িতে দাঁড়ানো লোকেদের পা মাড়িয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল। খুঁজে বার করা সম্ভব নয়! দেখি তো।
সে বাগমারির দিকে হাঁটতে লাগল। একটা বাড়িতে সার সার লাল—নীল—হলুদ টুনি বালব ঝালরের মতো চারতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত জ্বলছে। ফটকে উজ্জ্বল আলো, অবশ্যই বিয়েবাড়ি। মেয়ে—পুরুষ, বাচ্চচাদের পোশাক, হাতে রাখা প্যাকেট, গহনা এমনকী আকণ্ঠ খাওয়ায় মুখের হাসফাঁসানি দূর থেকে দেখেই বোঝা যায়, কাছাকাছি বিয়ে কী বউভাত হচ্ছে। রোহিণীর ভরসা এখন, বেনারসী—পরা, খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়ানো মেয়েরা। এদের ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় বেরিয়ে পড়বে, রানি মণ্ডলের বিয়ের ছাদনাতলাটা।
‘আচ্ছা, আপনারা কি কোনো বিয়ে বা বউভাতে যাচ্ছেন?’
বউটি ভ্রু তুলে বলল, ‘বিয়েতে যাচ্ছি।’
‘কনের নাম কি রানি মণ্ডল?’
‘শুচিস্মিতা গাঙ্গুলি।’
‘মাপ করবেন, আমার ভুল হয়ে গেছে। আসলে ঠিকানাটা মনে করতে পারছি না… অফিস কলিগ, তাই এইভাবে জিজ্ঞেস করে করে…।’
রোহিণী ঠিক করল, প্রথমে বাসস্টপগুলো দেখবে। নিমন্ত্রণ খেয়ে ফেরা লোকেদের কেউ—না—কেউ নির্ঘাৎ বাস ধরতে এখানে থাকবেই। রেল ব্রিজের তলা দিয়ে এগিয়ে সে দু—ধারের বাড়িগুলোর একটাতেও বিয়েবাড়ির আলো দেখতে পেল না। ফুল সাজানো একটা মোটরও রাস্তায় দাঁড়িয়ে নেই, বরযাত্রীদের মিনিবাসও নয়। অ্যামপ্লিফায়ারে সানাই, হিন্দি গান এমনকী রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডও বাজতে শুনল না। দু—দিকে গলি দেখলেই থমকে গিয়ে ভিতর দিকে চোখ পাঠিয়ে দিচ্ছে। বাসস্টপে চারজন। তাদের একজনের হাতে রংচটা একটি থলি, দু—জনের মুখে খিদে, অন্য জন এক শিখ।
হতাশ হল রোহিণী। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে রইল বাসস্টপে, যদি ফুল, শাড়ির প্যাকেট হাতে ধুতি—গরদের পাঞ্জাবি বা ফাউন্ডেশন—ব্লাশার—কমপ্যাক্ট—গ্লো—গেটার লাঞ্ছিত মুখ একবারের জন্যও নজরে পড়ে।
একটা মিনিবাস থামল। তা থেকে পাঁচ জনের একটা পরিবার নামতেই রোহিণীর মুখে হাসি ফুটল। বিয়েবাড়ি যাওয়ার নিখুঁত প্রমাণ মহিলার শাড়িতে, গহনায়, বড়ো মেয়ের হাতে ধরা শাড়ির বাক্সে, কর্তার সাদা চটিতে।
‘কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব… আপনারা কি কোনো বিয়েতে যাচ্ছেন?’
মহিলা প্রথমে হকচকালেন, তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ যাচ্ছি, কেন?’
‘আচ্ছা, কনের নাম কি রানি মণ্ডল?’
‘তা তো বলতে পারব না। ওনার বন্ধুর ভাইয়ের বিয়ে। আমরা বরযাত্রী। হ্যাঁ গো, কনের নামটা কী?’
কর্তা বিব্রত হলেন। সেটা কাটাতেই একটু বিরক্তি দেখিয়ে বললেন, ‘কেন, তা দিয়ে কী হবে?’
‘আমি একটু মুশকিলে পড়ে গেছি। একটা বিয়েবাড়িতে যাব, কিন্তু ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলেছি। শুধু বরকনের নামটাই—।’
‘খেতে যাবেন অথচ বাড়িটাই চেনেন না!’
‘আপনি কি কনের নামটা জানেন?’ রোহিণী গলার স্বর খরখরে করল।
‘বরের নাম জানি, অচ্যুত মুখার্জি। রাইটার্সে কাজ করে।’
‘নাহ। ধন্যবাদ!’
রোহিণী আর দাঁড়াল না। পরের স্টপের জন্য বাগমারির দিকে হাঁটা শুরু করল।
পেয়েছি। রজনীগন্ধার ছড়, প্রেশার কুকারের বাক্স নিয়ে সাত—আটজনের একটা দল। একজন বাদে সবারই পরনে প্যান্ট। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রোহিণী গতিরোধ করল এবং ‘আমি একটু মুশকিলে পড়ে গেছি’ দিয়ে শুরু করল।
‘কনের নাম? অ্যাই কার্ডটা দ্যাখ তো। মানে বিয়েটা আমাদের কলিগের বোনের।’
‘বরের নাম সুধীর সরকার কি?’
‘না তো’, একজন নিমন্ত্রণপত্র বার করে পড়ে বলল, ‘নীলোৎপল ঘোষ আর মানসী গুহ।’
‘সরি আপনাদের ট্রাবল দিলাম।’
‘না না, এ আর…’
রোহিণী পা বাড়াল। কানে এল চাপা মন্তব্য ‘খিদেটা মাইরি বেড়ে গেল।’ বাগমারি বাজারের স্টপে কিছু লোক। এইটাই তার শেষ চেষ্টার জায়গা। তিনটি কিশোরী। বিয়েবাড়িরই সাজগোজ। একটু নিশ্চিত হবার জন্য রোহিণী ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, কথা শোনার জন্য।
ওরা কথা বন্ধ করে তাকে দেখতে লাগল। কানে কানে কিছু বলে মুখটিপে হাসলও। রোহিণী একটু বিব্রত হল। নিজের শাড়ি ঠিক আছে কিনা দেখল। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে রুমালটা দেখল। কিছু লাগেনি মুখে। তাহলে হাসল কেন?
‘আচ্ছা, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করব?’ তিনজনের একজন সপ্রতিভভাবে রোহিণীকে বলল।
‘বলো।’
‘আমাদের এক বন্ধু ঠিক আপনার মতো দেখতে একজনকে বাসে একটা জিনিস, আজকেই, এই আধ ঘণ্টাটাক আগে—’
‘আরে, আমি তো তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি। সেই কত দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছি। যদি রাস্তায় দেখা হয়ে যায়, এই ভেবে আন্দাজেই আসছি। শুধু বলেছিল, বাগমারিতে নামব। তোমার বন্ধুর নাম কী?’
‘সুচরিতা।’
‘ব্যস, মিলে গেছে। এই নাও, তাকে গিয়ে দিয়ে দাও। বাব্বা হাঁফ ছাড়লাম।’
‘আপনি গিয়েই বরং ওকে দিন। এই তো খুব কাছেই এক মিনিটের পথ। ও চুপ করে বসে আছে। কাঁদছিল।’
‘আহা রে, চলো চলো। কার বিয়ে? স্কুলের ক—জন এসেছে?’
‘রানিদির বিয়ে। আমাদের ফিজিক্যাল সায়ান্সের টিচার। আমরা চারজন যারা ওঁর কাছে প্রাইভেটে পড়ি, তাদেরই শুধু বলেছেন।’
মিনিট দুই হাঁটতে হল। ছোটো একতলা বাড়ি। দরজায় একটা দুশো ওয়াটের বালব আর ভেলভেটের পর্দা। বাইরে কয়েকটা চেয়ারে বরযাত্রীরা বসে। ভিতরে মাটির উঠোনে সামিয়ানার এক ধারে খাওয়ার জায়গা, অন্য ধারে কাপড় ঘেরা জায়গায় বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে।
