এরপর রোহিণীর মাথার মধ্যে আগুনটা একটু একটু করে নিভে আসতে লাগল, যখন বিধান সরণি থেকে বাসটা বিবেকানন্দ রোড ঘুরল। তার সম্পর্কে কে কী বলল, কে কী ভাবল, তাই নিয়ে মাথা গরম করে লাভ নেই। যে জীবন ছেঁড়া কাপড়ের মতো ফেলে দিয়ে এসেছে, সেটাকে আবার কুড়িয়ে নিয়ে তার খুঁটে কিছু বাঁধা আছে কিনা দেখার ইচ্ছেটা আর নেই।
তবে গঙ্গাপ্রসাদ সম্পর্কে সুজাতা যা বলল, সেটা রোহিণীকে আশ্চর্য করল না। এইরকমই একটা সন্দেহ তার হচ্ছিল যে, শোভনেশের ছবিগুলো গঙ্গাদাই হাতিয়েছেন, হয়তো বাড়িটাও কবজা করেছেন, সিদ্ধার্থ বলল, মামলা চলার সময়ই বাড়িটা বিক্রি হয়েছে। কে কিনেছে? গঙ্গাদাই কি? ছেলের নামে কিংবা বউয়ের নামে।
ছবি জাল করার ব্যবসায় কি গঙ্গাদা নামবেন? আর একটা লোকের সঙ্গে মিলে এই ব্যবসাটা গঙ্গাদা চালাচ্ছিলেন। লোকটা তো অবশ্যই সুভাষ গায়েন। কিন্তু কথাটা কি বিশ্বাস করার মতো? এই দুটো লোক একসঙ্গে জুটল কী করে? জুটতে পারে। স্বার্থ যদি একই হয়, তখন সাপও ব্যাঙের গালে চুমু খায়। গঙ্গাদার কাছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, ছবি জালের কারবার, সুভাষ গায়নকে খুনের চেষ্টা, তাকে লেখা উড়ো চিঠি, এবং গায়েনের সন্দেহ—এইসব কথা পেড়ে দেখতে হবে কীভাবে রিয়্যাক্ট করেন।
কিন্তু এই যে বুড়ি, গঙ্গাপ্রসাদের নাম শোনামাত্র মুখ কালো করে দাঁতে দাঁত ঘষার মতো একটা মুখভাব করল, নিশ্চয় এও গঙ্গাদা সম্পর্কে কিছু জানে, ওর পেট থেকে আর কিছু বেরোয় কিনা সেটা দেখতে হবে। খুন হলেই নাকি মেয়েছেলে খোঁজা হয় পিছনের উদ্দেশ্য আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, টাকাই মূল মোটিভ। কিন্তু তাই বলে দ্বিতীয় বউয়ের ঘাড়ে দোষ চাপানো?
মানিকতলার মোড় পেরোনোর সময় বড়ো বড়ো গর্তে পড়ে বাসটা এমনই লাফালাফি করল যে, রোহিণীর গতিপথটাই বদলে গেল। হঠাৎ তার মনে হল, খুনটা যদি টাকার জন্যই হয়, তাহলে টাকা কামাবার জন্য শোভনেশ বাধ্য হয়েছিল, যেহেতু তার দ্বিতীয় বউটা তাকে অবিরাম টাকার জন্য খোঁচাত, গঞ্জনা দিত। এইরকম একটা ধারণা বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারলে দোষটা রোহিণীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।
আর এই ছড়ানোর কাজটাই বোধ হয় নিয়েছে সুজাতা গুপ্ত। ওর ননদের ছেলে অনুতোষ তাকে এইসব বলেছে—একদম বাজে কথা। গঙ্গাদা যে সেদিন বললেন, ‘সী ইজ এ লায়ার’, বোধহয় ভুল বলেননি। অনুতোষের নাম করে নিজেই এসব বানিয়েছে। এখন নানান জায়গায় বলে বেড়াবে। নানান জায়গা বলতে তো কয়েকটা ফ্ল্যাট!
ওদের সামনে তুষার দত্তরা, রোহিণীর সামনের শ্রীনিবাসনরা, নীচের দোতলার দত্তরায়রা, কী যেন মেয়েটির নাম?রোহিণী অবাক হল! এর মধ্যেই নামটা ভুলে গেলাম। মাথাটা কী যে গণ্ডগোল করছে না! সে প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। আর এই চেষ্টাটায় সফল হয়ে যখন সে আপন মনেই ‘কুন্তী, হাঁ কুন্তী,’ বলে উঠল, তখন সুজাতা গুপ্ত ঝুঁকে বললেন, ‘কিছু বলছ?’
‘না।’ রোহিণী বাধ্য হল বোকার মতো হাসতে। ‘একটা নাম মনে আসছিল না, এখন মনে এল।’
‘তুমি তো অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি বিড়বিড় করে কী যেন আপন মনে বকে যাচ্ছিলে, মাথা নাড়ছিলে। ভাবলাম পাগল—টাগল হয়ে গেলে নাকি?’
পাগল—টাগল বললেন কেন? রোহিণী টেলিস্কোপ তাক করল। সৌরমণ্ডলে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে কি ধরে নেবে, পাগল—টাগল বলার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য নেই? পাগলের বংশে বিয়ে হওয়ার খোঁচা তাহলে বোধ হয় নয়! হতে পারে।
‘তোমার হাতে প্যাকেট রেখে মেয়েটা গেল কোথায়?’ সুজাতা ভিড়ের মধ্যে দৃষ্টি সেঁধোবার চেষ্টা করতে করতে বললেন ‘তাই তো। গেল কোথায়? আমরা এলাম কোথায়?’ রোহিণী সামনে দাঁড়ানো লোকটিকেই জিজ্ঞাসা করল। প্যাকেটটার গায়ে আঠা দিয়ে একটা কাগজ আঁটা। লতাপাতার নকশার মধ্যে তাতে লাল কালিতে সুন্দর হস্তাক্ষরে বড়ো বড়ো করে লেখা : ‘সুধীর সরকারের সঙ্গে রানি মণ্ডলের বিয়েতে প্রীতি উপহার—প্রণতা খুকু (সুচরিতা দত্ত, ক্লাস নাইন।)
কোথায় এসেছে সেটা জানালা দিয়ে দেখার জন্য লোকটি নীচু হল। রোহিণীর মুখের কাছে মুখ। মুখে ভালো জর্দার গন্ধ।
‘মাড়োয়ারিবাগান ছাড়িয়ে এখন কাঁকুড়গাছি যাচ্ছে।’
জায়গা চিনতে লোকটি একটু বেশিক্ষণই নীচু হয়ে রইল। কিছু করার নেই। কিন্তু মেয়েটি বলেছিল বাগমারিতে যাবে। তাহলে অন্তত তিনটে স্টপ আগে নেমে গেছে। ভিড় বাস থেকে নামার জন্য অনেক আগে থেকে একটা মানসিক অঙ্ক কষতে শুরু করতে হয়। তার উপর ধাক্কা, চাপ এবং ঝাঁকুনি সামলাতে দুটো হাতকেই কাজে নিযুক্ত রাখতে হয়। মন এবং হাত ব্যস্ত থাকলে হাতে রাখার জিনিসটা ভুলে যাওয়াই সম্ভব।
তাহলে কী করবে সে এখন?বেচারা নিশ্চয় বিয়েবাড়িতেই যাচ্ছিল উপহার নিয়ে। প্যাকেটটার ওজন খুব বেশি নয়। সামান্য দামের জিনিসই হবে।
‘কী করি মাসিমা?’ রোহিণী অসহায় স্বরে পরামর্শ চাইল।
‘কন্ডাক্টরকে দিয়ে দাও। ও জমা দিয়ে দেবে বাসের অফিসে। যার জিনিস সে নিশ্চয় একবার খোঁজ করবে, তখন পেয়ে যাবে।’
‘হ্যাঁ, তাই করা উচিত। কিন্তু এখন তো সে হাতে করে উপহারটা দিতে পারছে না। নিশ্চয়ই খুব লজ্জায় পড়ে যাবে। সবাই দিচ্ছে, অথচ সে খালি হাতে যেন শুধু খেতেই এসেছে। অবশ্য ও বলবেই যে, বাসে একজনকে ধরতে দিয়েছিল, কিন্তু তাড়াহুড়োয় নামতে গিয়ে ভুলে গেছে আর যার হাতে রাখতে দিয়েছিল, সেও বেমালুম চেপে গেছে। না, না, আমার খুব বিশ্রী লাগছে।’
