সুচরিতা খবর পেয়ে ছুটে এল। প্যাকেটটা ওর হাতে তুলে দিতেই, আবেগে দিশেহারা হয়ে সে রোহিণীকে প্রণাম করল। প্রণাম পাওয়া রোহিণীর মনে হল, জীবনে তার এটা দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রাপ্তি। সুচরিতার মাথায় হাত রেখে রোহিণী তৃপ্ত নয়নে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার পরিশ্রমটা সার্থক হল।’
কথাটা বলেই দেখল, বিয়ের জায়গাটা থেকে বেরিয়ে আসছে সুভাষ গায়েন। রোহিণীকে দেখে সে অবাক হয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে? এটা তো আমার বোনের বাড়ি। রানি তো আমার ভাগনি।’
‘এটা আপনার বোনের বাড়ি!’
আজ দ্বিতীয়বার সুভাষ গায়েনের সঙ্গে তার দেখা হল। আর কী অদ্ভুত একটা জায়গায়। বিয়েবাড়িতে, যেখানে সে রবাহূত!
‘হ্যাঁ বোনের বাড়ি, কিন্তু আপনি? রানির সঙ্গে বোধহয় পরিচয় আছে।’
সুভাষ গায়েন ধরে নিয়েছে তার ভাগনি রানি মণ্ডল, যার আজ বিয়ে, রোহিণী বোধ হয় তার বান্ধবী বা ওইরকম কিছু। সুভাষের ভুলটা ভেঙে দিয়ে, এখানে তার আসার পিছনের কারণটা রোহিণী বলল।
‘তাজ্জব কথা! একটা উপহার ফেরত দেবার জন্য এত কাণ্ড করলেন?’
‘এর মধ্যে কাণ্ড দেখলেন? একটু বুদ্ধি আর একটু ইচ্ছা খরচ করে যদি একটা মেয়ের সেন্টিমেন্ট রক্ষা করা যায়, তাতে তাজ্জব হবার কী আছে? এর থেকেও তো কত বড়ো বড়ো কাণ্ড আপনিই করে ফেলেছেন, সেটা কি ভুলে গেলেন?’
‘আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।’ সুভাষ গায়েন প্রসঙ্গটা ঘোরাবার জন্য যেন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ‘এসে যখন পড়েছেন, তখন খেয়ে যেতেই হবে।’
রোহিণী ‘আরে না না’, বলে শুরু করতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুভাষ গায়েন ঝপ করে তার কবজি চেপে ধরে টানল ভিতরে নিয়ে যাবার জন্য। রোহিণী ওর মুখ দেখে বুঝল, অত্যন্ত খুশি এবং প্রীত হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ আপনজনের মতোই তার হাতটা ধরেছে। হঠাৎই এমন এক অতিথি পেয়ে গিয়ে ওর মানসিক ভারসাম্যটা কয়েক ডিগ্রি পড়ে গেছে। রোহিণীর মনে হল সুভাষ গায়েন মোটেই কঠিন, ক্রুর, খল চরিত্রের লোক নয়।
‘না খাবার জন্য আপনি তেত্রিশটা কারণ দেখাবেন, আর আমি ছেষট্টিটা কারণ দাখিল করতে পারি। আচ্ছা শেষ কবে বিয়েবাড়িতে খেয়েছেন বলুন তো?’
রোহিণী ফাঁপরে পড়ল। সত্যিই সে মনে করতে পারছে না। বছর দশেকের মধ্যে তো নয়ই। বিয়ের পর শোভনেশের সঙ্গে কোথাও যাওয়া হয়নি। বোম্বাইয়ে দিদির কাছে থাকার সময় এক গুজরাতি বউভাতে দিদির সঙ্গে গেছিল। একটা সফট ড্রিঙ্ক খেয়েছিল। বাড়ি ফিরে দিদি বলেছিল, ‘এই ভালো। সর্ষের তেল আর বনস্পতি পেটে ঢুকিয়ে গ্যাসট্রিকটাকে বাড়িয়ে শরীরের স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করার থেকে এইসব খাওয়ার পাট তুলে দেওয়াই ভালো।’ বোম্বাই থেকে ফিরে সে যেভাবে জীবন কাটাচ্ছে, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবহীন হয়ে, তাতে বিয়ের নিমন্ত্রণ কপালে জোটার কথা নয়।
‘অনেক দিন খাইনি, আর সেজন্যই আমার স্টমাক বিয়ের ভোজে অভ্যস্ত নয়। সুতরাং সুভাষবাবু, আমাকে মাফ করবেন।’
‘দই সন্দেশেও কি অভ্যস্ত নয়?’
‘একটা সন্দেশ ব্যস।’
‘তাহলে ভেতরে আসুন একবার।’
সংসার করার যাবতীয় জিনিসে ভরা একটি ছোটো ঘর। খাটের কোণে মেঝেয় বসে আছে কনে। তাকে ঘিরে রয়েছে নানা বয়সি স্ত্রীলোক। উপহারগুলো কনের পাশে জড়ো করে রাখা। একটি মেয়ের হাতে খাতা কলম। ঘরে পা ফেলার জায়গা নেই। বিয়ের লগ্ন দশটায় শুরু। বর এখনও আসেনি। প্রথম ব্যাচ খেয়ে উঠেছে। বিয়ে দেখে যাওয়ার সময় তাদের নেই। তাদের বাড়ি ফেরার বাস পাবে না। কলকাতায় সামাজিকতা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবহন ব্যবস্থা। সমস্যাটা রোহিণীরও। অজ পাড়াগাঁর লোকেদের মতো রাত ন—টা বেজে গেলেই তারও উসখুশানি শুরু হয় সল্ট লেকের বাসের কথা ভেবে।
সুভাষ গায়েন তাকে পরিচয় করিয়ে দিল এই বলে, ‘বিখ্যাত আর্টিস্ট শোভনেশ সেনগুপ্তর স্ত্রী। কাজ করেন মহারানি ম্যাগাজিনে। আজ সকালে মীনার ইন্টারভিউ নিতে গেছিলেন, তখনই ওনাকে নেমন্তন্ন করছিলুম। অবশ্য আর একটা ব্যাপারও ঘটে গেছে এর মধ্যে। বাসে ওঁর হাতে একটি মেয়ে উপহারের প্যাকেট ধরতে দিয়ে ভুলে গিয়ে নেমে যায়। উনি সেটা ফিরিয়ে দেবার জন্য খুঁজে খুঁজে শেষকালে এইখানেই পৌঁছে গেছেন। একেই বলে ভগবানের হাত! কী অদ্ভুত যোগাযোগ!’
ঘরের দরজার কাছ থেকে রোহিণী নমস্কার জানাল। কনে স্কুল শিক্ষিকা, বয়স বছর ত্রিশ। রোহিণীর মজা লাগল ঘরের সকলের অবাক চাহনি দেখে। তার ক্ষীণভাবে ইচ্ছে হল, এদের সঙ্গে বসে গল্প করার। এরা সবাই মা, মাসি, পিসি—বোনঝি—ভাইঝি, প্রত্যেকেই কিছু—না—কিছু সামাজিক, পারিবারিক পরিচয়ে চিহ্নিত। তার পরিচয় শুধু কিনা আর্টিস্টের স্ত্রী, যে আর্টিস্ট এখন জেল ভেঙে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কেউ জানে না, আর সে নিজে কিনা কোন এক মহারানিতে কাজ করে! এটা কি কোনো মেয়ের পরিচয় হল? সে কারোর ননদ নয়, ভাজ নয়, বউদি নয়, কাকিমা নয়।
হঠাৎ রাজেনকে তার মনে পড়ল। এতক্ষণে জয়পুরে কোনো হোটেলে নিশ্চয় গা এলিয়ে খাটে শুয়ে। ফিরে এলেই বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়িতে রাজেন তার সম্পর্কে কী বলেছে সেটা ভালো করে ভেঙে বলছে না। নিশ্চয় কিছু কিছু ব্যাপার চেপে গিয়েই বলেছে। এটা উচিত নয়। সে নিজে গিয়ে রাজেনের মা—র সঙ্গে কথা বলে আসবে।
