‘তাই নাকি?’ রোহিণী ফ্যাকাসে মুখে বলল।
‘অনুতোষ বলল, এই দ্বিতীয় বউটা নাকি খুব মানসিক টর্চার করত। ওর ছবিটবি নিয়ে খোঁটা দিত, কখনোই ভালো বলত না। উৎসাহ দেওয়া, প্রেরণা দেওয়া এসবের ধারেকাছেও ছিল না। নিজেকে নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকত। খুব খরচেও ছিল। খালি টাকা চাইত। আর সেই টাকা জোগাতে গিয়েই শোভনেশ অশ্লীল ছবি আঁকার কারবার শুরু করে।’
এবার রোহিণী টেলিস্কোপ দিয়ে সুজাতার মুখভাব লক্ষ করে যাচ্ছে। টিয়ার গ্যাস,বোমা পটকা তো তুচ্ছ জিনিস, উনি তো পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক গুলি চালিয়েছেন। ছুটে পালাতেও দিচ্ছে না। হাত তোলারও উপায় নেই। কী সব কথা বলছেন! প্রত্যেকটাই ডাহা মিথ্যে, এত মিথ্যে যে, কলকাতার টেলিফোনের থেকেও কম বিশ্বাসযোগ্য, এমনকী লোকাল ট্রেনের টাইমটেবলের থেকেও!
‘শোভনেশের যে শেষে এই পরিণতি হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। শুনে মনটা যে কী খারাপ হয়ে গেল।’
সুজাতা বেদনায় অতঃপর স্তব্ধ হবার জন্য জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। রোহিণীও তাকাল। বউবাজারের মোড় ছাড়িয়ে বাস কলেজ স্ট্রিটে চাকা রাখছে।
‘আপনার ওই অনুতোষ এতসব ব্যক্তিগত খবর পেল কী করে? বউ খোঁটা দিত, টাকা চাইত, খরচে ছিল এসব তো বাইরের লোকের জানার কথা নয়?’
‘শুনেছে কোথাও থেকে।’
সুজাতা অতি নিরীহ স্বরে ফিসফিস করে তারপর যোগ করলেন, ‘আমার নামেও তো একসময় কত কথা লোকে বলত শোভনেশকে জড়িয়ে। উনি বলতেন, কান দিয়ো না। স্বার্থান্বেষীরা এইভাবে রটায়, চরিত্র হনন করে।’
‘ঠিক বলেছেন মাসিমা, আমাদের কাগজের মালিক, একসময় শোভনেশ সেনগুপ্তের বন্ধু ছিলেন, ওদের বাড়িতে অল্পবয়স থেকেই যাতায়াত ছিল। তা তিনি একবার কথায় কথায় বলেছিলেন,ওর একটা ছবির মডেলকে তার স্বামী এমন বেধড়ক পিটিয়েছিলেন যে, মডেল বেচারা বিছানা থেকে সাতদিন উঠতে পারেনি। তাই নয়, সেই স্বামী ছবিটার ফ্রেম ভেঙে, মাড়িয়ে একসা কাণ্ড করেন। পেপারওয়েট দিয়ে মারতেও যান শোভনেশকে। শুনে আমি বললাম, এত কথা জানলেন কী করে? বললেন, ওখানে নিত্য নামে যে চাকরটা তখন ছিল, তার কাছ থেকে শুনেছেন। বুঝুন মাসিমা, চাকরবাকরের কথা শুনে এইসব গুজব ওঁর মতো শিক্ষিত লোকও কিনা রটাচ্ছেন! কী যে দেশের অবস্থা!’
রোহিণীর টেলিস্কোপ ও সুজাতার মাইক্রোস্কোপ এখন মুখোমুখি। একজন দেখতে পেল, গ্রহ—নক্ষত্রমণ্ডলীতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে, অন্যজন দেখলেন, নানাবিধ ভাইরাস কিলবিল করছে।
‘তোমার কাজের মালিকের নাম কী?’
‘গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি।’
শুনেই সুজাতার মুখের উপর দিয়ে কালো মেঘ ভেসে গেল। ঠোঁট টিপে ধরলেন, চোয়ালের পেশি শক্ত হল।
‘মনে হচ্ছে, লোকটাকে তখন দেখেছি। অনুতোষের কাছে শুনলাম, শোভনেশের ভালো ভালো বহু ছবি নাকি ওর কাছে আছে। চড়া দামে নাকি একটা দুটো বিক্রি করছে আর টাকাটা পকেটে পুরছে। আবার ছবি জাল করার ব্যবসাও নাকি আছে।’
‘কার, গঙ্গাপ্রসাদের?’
‘হ্যাঁ। এই গঙ্গাপ্রসাদ আর একটা লোক মিলে নাকি জাল করার ব্যবসাটা চালাচ্ছিল। অনুতোষ তখন বেকার। ও তখন কিছুদিন কাজ করেছিল।’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত কি জানত না, তার ছবি নিয়ে জালিয়াতি কারবার চলছে?’
‘হয়তো জানত, হয়তো জানত না। আমি সে কথা আর বলি কী করে! তবে বউয়ের গঞ্জনায়, টাকা রোজগারের জন্য হয়তো জেনেও টাকা খেয়ে চুপ করেছিল।’
‘অনুতোষ কোথায় গিয়ে কাজ করত?’
‘জায়গাটার কী একটা নাম যেন বলল…কী একটা বাগান দিয়ে নাম।’
‘চোরবাগান, মোহনবাগান, লাটবাগান, জোড়াবাগান, গোয়াবাগান, নাথেরবাগান…।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, গোয়াবাগান, হেদোর কাছে।’
‘বউটাই তা হলে আসল পাজি।’
রোহিণী জ্যাবজ্যাবে সারল্য মুখে লেপে, দৃঢ় সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেখল ঠনঠনে স্টপে বাস হাজির।
তার হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছিল যে মেয়েটি, সে কপালে ও বুকে দু—বার আঙুল ছুঁইয়ে কালীপ্রণাম সেরে নিল।
‘এইসব মেয়েরাই পুরুষদের নষ্ট করে। মাসিমা, এই ব্যাপারটা নিয়ে অমি একটা ফিচার লিখব মহারানিতে। আপনি আমায় মেটিরিয়াল দেবেন? নাম ঠিকানা কি জানেন এই বউটার? তা হলে একবার কথাও বলে নিতাম।’
আবার টেলিস্কোপ! সুজাতা কী একটা বলতে গিয়ে হাঁ করেও মুখ বন্ধ করলেন।
‘এসব কথা এখন থাক।’
রোহিণী ভেবে দেখল, ঠান্ডা যুদ্ধটা যখন শুরু হয়েই গেছে, তখন বার্লিন প্রাচীরের মতো একটা টেনশান দিয়ে সেটা মুলতুবি রাখলে কোনোদিনই এর মীমাংসা হবে না। সুজাতা জেনেছে সে কার বউ, আর সেও জানিয়ে দিয়েছে হৃদয়রঞ্জনের হাতে মার খেয়ে সুজাতা সাতদিন বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। কিন্তু ননদের ছেলে অনুতোষের নাম করে তার সম্পর্কে যেসব কথা বলল, সেটা তো হিরোসিমার উপর নামিয়ে দেওয়া অ্যাটম বোমাটার থেকেও ভয়ঙ্কর! সে কিনা শোভনেশকে মেন্টাল টর্চার করত? সে কিনা খুব খরচে ছিল? খালি টাকা চাইত? গঞ্জনা দিত? এইরকম মিথ্যে কথা তো গোয়েরিংয়ের জিভেও আটকে যাবে।
মাথার মধ্যে দাউ দাউ করে উঠল রোহিণীর। বুড়িটা নিশ্চয় কথাগুলো বানিয়ে বলল। আসলে তাকে টর্চার করে মজা পাবার জন্য এই বিটলেমিটা করল। ঠিক আছে, এর শোধ কীভাবে নিতে হয় তা দেখাব। রোহিণী মুখ ঘুরিয়ে দেখল হৃদয়রঞ্জন একই জায়গায় একইভাবে রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নির্লিপ্ত গোবেচারা মুখ। ওটা ঘুমন্ত ভিসুভিয়াস বা ক্রাকাতোয়া কিনা, সেটা একবার খুঁচিয়ে দেখলে কেমন হয়। বউকে পিটিয়েছিল যে—জ্বলুনিতে, সেটার উৎপত্তি যদি ঈর্ষা থেকে হয় তাহলে ওর বুকের মধ্যে আগ্নেয়গিরিটা এখনও থাকারই কথা। ঈর্ষা কখনো নেভে না। নিশ্চয় শোভনেশ সম্পর্কে ওরও কিছু বলার কথা আছে।
