রোহিণী লক্ষ করল, হৃদয়রঞ্জন আড়চোখে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকিয়েই বউয়ের মুখের দিকে তাকালেন। কিন্তু সুজাতার মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটল না। রোহিণী মনে মনে বলল, আজ আমি সারপ্রাইজের মিছিল দিয়ে ধুন্দুমার করে দেব। জ্যাম করব, কনফিউজড করব, টিয়ারগ্যাস, গুলি, অ্যারেস্ট, বোমা—পটকা, স্লোগান দিয়ে একটা বিপ্লব বাধিয়ে দেব। দেখি,কে আমায় আটকায়!
একটা বাস আসছে। ঢিলেঢালা সারি নড়াচড়া করে আঁট হয়ে উঠল। যাত্রীরা নেমে যেতেই কন্ডাক্টর বাসের পিছনের দরজার সামনে দাঁড়াল নতুন যাত্রীদের টিকিট কাটার জন্য। সারিটা এগোচ্ছে। রোহিণী থলি থেকে টাকার ব্যাগ বার করল। বসার জায়গা পাবে কিনা আঁচ করার জন্য দেখে নিল, সারিতে মেয়ে ক—জন রয়েছে। গোটা পনেরো সিট থাকে মেয়েদের জন্য। তার মনে হল, বসার জায়গা হয়তো পাওয়া যাবে, তবে বাসের সামনের দিকে মুখ করে বসার সিট হয়তো পাবে না।
‘টিকিট আমি কেটে নিয়েছি।’ হৃদয়রঞ্জন হাত তুলে রোহিণীকে দেখালেন।
বাসের মধ্যে পা দিয়েই ‘মেসোমশাই বসে পড়ুন, বসে পড়ুন।’ বলতে বলতে রোহিণী সামনের লেডিজ সিটের দিকে ছুটে গেল অনেকটা অপোনেন্ট ডিফেন্সের মধ্য দিয়ে চিমা ওকোরির মতো। পা মাড়িয়ে, পায়ের গোছে লাথি মেরে এবং কাঁধের ধাক্কায় একজনকে হুমড়ি খাইয়ে রোহিণী তার গোল পেয়ে গেল। তবে চিমার থেকে তার কৃতিত্বটা একটু বেশি। শুধু এই কারণেই, বাসের পিছন থেকে সামনে এক হাতে সুজাতাকে ধরে টানতে টানতে ডিফেন্স ভেঙে সে এগিয়েছে! সুজাতাকে ঠেলে সিটে বসিয়ে দিয়েই সে ঝপ করে পাশে বসে পড়ল, সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তার আধাবয়সি এক সালোয়ার—কামিজকে ডজ করে। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সে এক প্লেট সন্দেশের মতো এগিয়ে দিল মিষ্টি হাসি।
‘কম করে পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো থাকতে হবে।’ রোহিণী ফিসফিসিয়ে সুজাতার কানে বলল। তিনি মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
‘তা হলে আপনি আমার প্যাকেটটা ধরুন।’ মেয়েটি ফিথে বাঁধা রঙিন কাগজের প্যাকেটটা এগিয়ে ধরতেই রোহিণী সেটা হাতে নিল।
‘কতদূর যাবে?’
‘বাগমারি।’
‘অনেকটা, প্রায় আধ ঘণ্টা।’
রোহিণী খুঁজল হৃদয়রঞ্জনকে। যা আশঙ্কা করেছিল, তাই হয়েছে। রড ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, বসার জায়গা পাননি।
‘মেসোমশাই বসতে পারেননি।’
‘উনি বাসটাসের ভিড়ে অনভ্যস্ত। চটপটেও নন।’
‘বরাবরই কি?’
‘বরাবরই। আমার বিয়ে হওয়া থেকেই দেখছি। ভীতু ধরনের। ঝগড়াঝাঁটি হবার সম্ভাবনা আছে দেখলে সেদিকে আর মাড়াবেন না।’
অথচ গঙ্গাদা বলেছিলেন, বেধড়ক এমন পিটিয়েছিলেন যে, সুজাতার নড়ে বসারও জোর শরীরে ছিল না। শোভনেশের সম্পর্কে জেলাসি থেকেই নাকি এই হিংস্রতা! তারপর শোভনেশের স্টুডিয়োতে গিয়ে ছবির ফ্রেম ভেঙেছেন, দু—পায়ে ছবি মাড়িয়েছেন, পেপারওয়েট দিয়ে শোভনেশকে মারতেও গেছিলেন। অথচ ইনি বলছেন, ওঁর স্বামী নাকি ভীতু, ঝগড়া—টগড়ার ধার দিয়েও হাঁটেন না।
তা হলে সত্যি কথাটা কে বলছে? কনফিউজড করবে ঠিক করে শেষে কিনা নিজেই সে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে!
যাত্রা শুরু করল বাস। অসম্ভব ভিড় আজ। রোহিণীর মনে হল ভিড়ের কারণটা বোধ হয় হাজিরা দিয়েই মিটিং থেকে অনেকে সটকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কিংবা আজ টিভি সিরিয়াল বুনিয়াদের তারিখ হয়তো। এটা তো মাঘ মাস, আজ বিয়েরও দিন থাকতে পারে। হাতের প্যাকেটটা দেখে মনে হচ্ছে, উপহারের কিছু এর মধ্যে আছে।
‘মাসিমা এখন কোথা থেকে ফিরছেন?’
‘গেছলাম পূর্ব পুটিয়ারিতে ছোটো ননদের বাড়িতে। ওর সেজোছেলের বিয়ে সামনের বুধবার। ছেলে একটা স্কুলে পড়ায় আর ছবি আঁকে। গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা। মেয়েটিও পাশ করা আর্টিস্ট। ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে। একই সঙ্গে ওরা পাশ করেছে।’ সুজাতা হাসলেন, যার অর্থ হল বিয়েটায় অভিভাবকদের হাত নেই।
‘আর্টিস্টরা দেখছি আপনাকে কোনো—না—কোনোভাবে ছুঁয়ে আছেই।’
‘হ্যাঁ। ওরা বোধ হয় ছুঁয়ে থাকতে চায়, ভালোবাসতেও।’
ভালোবাসে বললেন কেন? রোহিণী সন্ধিগ্ধ হল। তা হলে কি শোভনেশকে ভালোবেসে ছিলেন? এখনও ভালোবাসেন? গঙ্গাদার থিওরি মানলে, স্বামীর ওপর ঘৃণা থেকে রিবাউন্ড করে শোভনেশের কাছে ন্যুড সিটিং দিয়েছেন। এটাকে ভালোবাসা বলা যায় না। এখন তো কেমন দিব্যিই স্বামী—স্ত্রী সুখেই রয়েছেন!
‘তোমার বন্ধুর দেওর বললেন, খারাপ খারাপ ছবি আঁকত? কিন্তু আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে তো ওকে কখনো খারাপভাবে মেয়েদের দেহকে অপমান করে কিছু আঁকতে দেখিনি!’
‘সিদ্ধার্থ বলল, প্রচুর ভালগার ছবি এঁকেছেন।’
‘পরে এঁকেছে, পরে। আমি ওখানে থাকার সময় নয়। আজ আমিও শুনলাম অনুতোষের কাছে, আমার ননদের ছেলে, যার বিয়ে। ওরা তো সব খবরই রাখে বড়ো বড়ো আর্টিস্ট সম্পর্কে। ও—ই বলল, শোভনেশ খুন করে জেল খাটছে এখন।’
‘ওমা, তাই নাকি!’
সুজাতা মুখ ফিরিয়ে রোহিণীর মুখটা যেন মাইক্রোস্কোপে দেখলেন। তাইতে রোহিণী একটু ঘাবড়ে গেল। হাসি চেপে সুজাতা বললেন, ‘শোভনেশ আবার বিয়ে করেছিল।’
রোহিণীর বুকের মধ্যে নিশ্বাস জমে দম বন্ধ হবার উপক্রম হল। জ্যাম হওয়া বোধ হয় একেই বলে। সে ক্ষণেকের জন্যে ভুলে গেল, ভগবান নেই তার এই বিশ্বাসটাকে। মনে মনে কাতরে উঠে বলল, ভগবান আর আমি কখনো ইয়ার্কি করেও মিথ্যে কথা বলব না। এই বুড়ি কতদূর জেনেছে বুঝতে পারছি না, বুঝে কাজও নেই। তবে এখুনি যেন না বলে ফেলে, তুমিই তো সেই বউ, যে পরিচয় লুকিয়ে আমার পেট থেকে কথা বার করেছ! দোহাই ভগবান… এই ভিড় বাসের মধ্যে নয়।
