তারপরই কি সুভাষ গায়েনকে খুন করার চেষ্টা হয়? লোকটা হয়তো মিথ্যে বলেনি। রোহিণী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সন্দেহটা করে ফেলেই বলল, ‘শোভনেশের ছবি নাকি এখন বাজারে আসছে কোনো এক অজ্ঞাত জায়গা থেকে?’
‘তাই নাকি!’ সিদ্ধার্থ নড়েচড়ে বসল। ‘আমি অবশ্য ছবির বাজার সম্পর্কে খবর রাখি না।’
‘তাহলে এখন আরও বেশিই হবে। ফিদা হুসেইনের ছবিই পাঁচ লাখে বিক্রি হয়েছে। তাহলে শোভনেশ সেনগুপ্তর ছবি, যদিও হুসেইনের মতো পাবলিসিটি পাননি, হাজার পঞ্চাশ তো পেতে পারেই। কিন্তু ছবিগুলো কোথা থেকে বাজারে আসছে, ফেক না অরিজিনাল?’
‘বলতে পারব না, ছবির এসব আমি কিছুই বুঝি না।’ বলতে বলতে রোহিণীর চোখ পড়ল ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি লোকের থমকে পড়ার দিকে। অফিসের উৎপল। অবাক হয়ে সে পার্কের রেলিংয়ের কাছে এসে চেঁচিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে বসে?’
রোহিণী গলা চড়িয়ে বলল, ‘এনার সঙ্গে একটু গল্প করছি।’
সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে উৎপল, ‘অ’। বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।
‘ওই লোকটা মহারানির কাজ করে না? আমি প্রথমে এর কাছেই আপনার খোঁজ করেছিলাম। খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিল, এডিটারকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কিছু জানি না। এডিটার প্রশান্তবাবু তখন ছিলেন না।’
শুনে রোহিণী হাসল। বলল, ‘আপনার লোক এখনও এল না কিন্তু।’
‘চলুন ওঠা যাক, বাড়িতে গিয়ে একটা লেখায় বসতে হবে।’
দু—জনে উঠে পড়ল। বাস টার্মিনাসের দিকে যেতে যেতে রোহিণী বলল, ‘সব তো শোনা হল না, বাকি অংশটুকু পরে—’
সিদ্ধার্থ হঠাৎ দাঁড়িয়ে চোখ বিস্ফারিত করে বলল, ‘কার বাকি অংশটুকু?’
রোহিণী পুরুষ হলে অবশই হো হো করে হেসে উঠত। তার বদলে মুখে একরাশ নীরব হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘অবশ্যই শোভনেশের। ওর বাড়ির বিষয়ে আর কী আপনি জানেন সেটা একটু জানতে হবে।’
‘আর বিশেষ কিছু জানবার মত নেই।…ওহ ভালো কথা, বউবাজারের বাড়িটার এখন মালিক কে বলুন তো?’
‘জানি না, আমি কোনো খবর রাখি না ওর বিষয়—সম্পত্তির। যাতে আমার প্রয়োজন নেই, তা নিয়ে মাথাব্যথা করে লাভ কী?’
‘এ জিনিসটা যদি সবাই বুঝত, তাহলে পৃথিবী থেকে কত কোটি কোটি টন ব্যথা যে কমে যেত! আপনি কত নম্বরে উঠবেন? আমার বাসস্ট্যান্ড আর একটু ওধারে… বউদিকে জানাব আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে।’
‘জানাবেন। একটা কথা কিন্তু আপনাকে জানাতে ভুলে গেছি, শোভনেশ বহরমপুর হাসপাতালে ভরতি হয়েছিল, সেখান থেকে দিন কয়েক আগে পালিয়েছে।’
‘বলেন কি! এটা তো দারুণ খবর!’
‘নিদারুণ আমার পক্ষে। পুলিশের হাতে যদি ইতিমধ্যে ধরা পড়ে যায় তো ভালো, নইলে কোনোভাবে যদি আমার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে বিপদে পড়ে যাব।’
আমার মনে হয় না আপনার কাছে যাবে। গঙ্গাপ্রসাদবাবুর কাছে যা শুনেছি তাতে মনে হয়েছিল, আপনার ওপর শোভনেশ খুব চটা। আপনি যাতে বিষয়—সম্পত্তি কিছু না পান, সেজন্যই নাকি বাড়িটা বিক্রি করে দেন যখন মামলা চলছিল।’
‘বিক্রির টাকাটা কী হল?’
‘মামলার খরচে লেগেছে।’
অথচ গঙ্গাদা বলেছিলেন, বাড়িটা তাদের বিয়ের আগেই মর্টগেজ ছিল একজনের কাছে। ব্যাঙ্কে সতেরো হাজার টাকা ছিল, যা তিনি মামলার জন্য উকিলকে দিয়েছেন। রোহিণী ছোটো করে মাথা ঝাড়া দিল। ভিতরে ভনভন করে একটা সন্দেহের পোকা উড়ছে। সেটাকে বার করে দেবার চেষ্টায় সে বলল, ‘বন্ধুকে বাঁচাতে উনি নিজেও অনেক খরচ করেছেন।’
‘হ্যাঁ, তাও বলেছেন।’
রোহিণীর চোখে পড়ল সুজাতা আর হৃদয়রঞ্জন বাসের জন্য দাঁড়ানো যাত্রীদের লাইনের শেষ মাথা খুঁজছে।
‘আচ্ছা তাহলে এবার চলি, আমার বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। স্টেট বাস, বুঝতেই পারছেন, এটা মিস করলে পরেরটার দেখা কখন যে পাব!’
‘আমার কার্ডটা রাখুন। যদি কখনো আবার দরকার পড়ে!’
সিদ্ধার্থর হাত থেকে কার্ড নিয়ে রোহিণী থলির মধ্যে সেটা রেখে যাত্রী—লাইনের শেষে দাঁড়ানো গুপ্ত দম্পতির দিকে এগিয়ে গেল।
.
‘মাসিমা! কোথায় গেছলেন?’ রোহিণী ভীষণভাবে অবাক হয়েই বুঝল অবাক হওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। তাই পরিমাণটা কমিয়ে আবার বলল, ‘এই একটু আগে আপনার কথা একজনকে বলছিলাম।’
সুজাতা এবং হৃদয়রঞ্জন একই সঙ্গে জিজ্ঞাসু চোখে রোহিণীকে ছেঁকে ধরলেন। রোহিণী ঠোঁট দুটো ইলাস্টিকের মতো টেনে হৃদয়রঞ্জনের দিকে আলাদাভাবে তাকিয়ে মাথাটা হেলাল।
‘আমার কথা! কেন, কাকে বলছিলে? আমি আবার কী অপরাধ করলাম?’ সুজাতাও তাঁর অবাক হবার ক্ষমতা দেখালেন, তবে তাঁর বিস্ময়টা যে কৃত্রিম সেটা বোঝাবার জন্য জুড়ে দিলেন, ‘বাব্বাঃ, আজ দেখছি সারপ্রাইজের মিছিলের মধ্যে পড়ে গেছি।’
‘আপনাকে তা হলে আরও সারপ্রাইজ দেব। আমার এক বন্ধুর দেওর, নাম সিদ্ধার্থ সিংহ, অ্যাবনরম্যাল সায়কোলজি নিয়ে রিসার্চ করছে। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে শোভনেশ সেনগুপ্তর কথাটা বললাম। আপনার কাছে যা যা শুনেছি ঠিক সেই সেই কথাগুলোই বললাম। পাগল হবার ভয়ে একটা লোক কীরকম উদ্ভট আচরণ করছে। তাই আমি ভাবলাম, এই ব্যাপারটা জানলে হয়তো ওর রিসার্চের কাজে লাগতে পারে। কিন্তু সব শুনে টুনে সিদ্ধার্থ কী বলল জানেন? বলল, শোভনেশ সেনগুপ্তদের বংশে কেউ কখনো পাগল হয়নি, তবে ছিটগ্রস্ত ছিল কেউ কেউ। আমি বললাম, তুমি জানলে কী করে? তুমি কি লোকটাকে চেনো? বলল, শুধু চিনিই নয়, ওর নাড়িনক্ষত্রেরও খবর জানি। একটু পারভার্ট ধরনের ছিল, মেয়েদের খারাপ খারাপ ছবি আঁকত।’
