‘না।’
সিদ্ধার্থ মুখ ঘুরিয়ে এধার—ওধার তাকিয়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করল, নিজের মনেই বলল:
‘নাহ জ্যামেই আটকা পড়েছে।’
‘ঝালমুড়ি খাবেন?’
রোহিণীর এখন ইচ্ছে করছে মুখরোচক কিছু চিবোতে চিবোতে শোভনেশের কাহিনি শোনার। অনেকগুলো প্রশ্ন তার করতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটাই বাদ সাধল। গঙ্গাদার চরিত্রটাও রীতিমতো ইন্টারেস্টিং, ক্রমশই কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠছে। শোভনেশ পাগল হয়ে উঠছিল আর জন্য সেজন্য দায়ী কিনা আমি! অথচ এই সেদিন বললেন, ওদের বংশে পাগল হওয়াটা তার কাছে নাকি নতুন কথা! এইরকম উলটোপালটা কথা বলার উদ্দেশ্যটা কি? কিছুর থেকে যেন নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন।
‘খাব। অনেকদিন খাইনি আর এভাবে অনেকদিন ঘাসের উপর বসিওনি। আপনি?’
রোহিণী বলতে যাচ্ছিল, এই তো সেদিন ইডেনে… কিন্তু রাজেন আবার এসে পড়বে কথার মধ্যে, এই ভেবে বলল, ‘আমিও অনেকদিন ঘাসে বসিনি।’
ঝালমুড়ি কিনে ঠোঙা থেকে মুখে কিছুটা ঢেলে সিদ্ধার্থ বলল, ‘বীণাদের গোয়াবাগানের বাড়িতে শোভনেশ সেনগুপ্ত গেছিল, এই পর্যন্ত বলে গঙ্গাপ্রসাদ বাঁড়ুজ্যে আর কিছু আমাকে জানাতে পারেননি বা জানাতে চাইলেন না। কেন জানি আমার মনে হল, এইখানে একটা ভাইটাল লিঙ্ক রয়েছে এই ঘটনা পরম্পরার। কিন্তু বাড়িটা যে ঠিক কোথায়, ঠিকানাই বা কি, তা আমি জানি না। বীণার স্বামীই বা এখন কোথায়, তাও জানি না।’
সিদ্ধার্থ ঠোঙা তুলল মুখে মুড়ি ঢালার জন্য। রোহিণী ভাবল,সুভাষ গায়েনের হদিশ যে আমি জানি, সেটা কি ওকে বলা উচিত হবে? বরং আরও কি বলে শোনা যাক। নিজেকে জাহির করার সময় এটা নয়।
.
‘আমার এক আত্মীয় থাকে গোয়াবাগানে। গেলাম তার কাছে। কত বছর আগে খুনটা হয়েছে, তখন ওখানে একটু চাঞ্চল্যও পড়েছিল, যদিও খুনটা হয় বউবাজারে। তাহলেও বীণার বাড়ি কিছুটা তো তখন বিখ্যাত হয়ে গেছিলই। আত্মীয়কে বলতেই সে বলল, এখুনি দেখিয়ে দিচ্ছি বাড়িটা, গোবরবাবুর আখড়ার খুব কাছেই। গিয়ে দেখলাম বাড়িটা। ওরা মাস কয়েক মাত্র ছিল। কারোর সঙ্গে মিশত না। একতলায় থাকত, দুটো বড়ো ঘর আর লম্বা দালান নিয়ে। এখন অবশ্য অন্য লোক থাকে। শুনলাম, বীণার স্বামীর নাম সুভাষ গায়েন। ছবির ব্যবসা করত। আরও শুনলাম, লোকটার ঘরে আর দালানেই ছবি আঁকা হত। পাঁচ—ছ’জন লোক বসে ছোটো—বড়ো নানান আকারের ছবি আঁকত। বাইরের কাউকে আঁকা দেখতে দেওয়া হত না। ওখানেই ছবির ফ্রেম তৈরি হত। বাঁধানো হত। মাঝে মাঝে লোকজন আসত, ছবি নিয়ে চলে যেত। বীণা মারা যাবার পরও তার স্বামী কয়েক মাস ওখানে ছিল। তারপর কোথায় যে চলে গেল, কেউ তা আর বলতে পারল না।’
‘ছবির বিষয় সম্পর্কে জানা গেলে হয়তো বলা যেত, আসলে ঠিক কি কারবার বীণার বাড়িতে ঘটছিল।’
‘হ্যাঁ। সেটা সুভাষ গায়েন বলতে পারে আর পারে সেই সব আর্টিস্টরা, যারা ওখানে বসে ছবি আঁকত। এই প্রসঙ্গে একটা খবর জানাই, কিছুদিন আগে কাগজে পড়লাম, বোম্বাইয়ে এক বাড়ি তৈরি করার ব্যবসায়ী, ছবি নকল করার এক কোম্পানি খুলেছে। ইউরোপিয়ান পেইন্টিংসের ওল্ড মাস্টার্সদের—দা ভিঞ্চি, দিউরার,কোরেগ্গিও, রেমব্রান্ট, রুবেনস, বোত্তিচেল্লি, টিশিয়ান, গোইয়া, কার নাম করব, সবারই কাজ নকল করার এক কারখানাই খুলে ফেলেছে জনা পঞ্চাশ বেকার ফ্রিলান্স পেইন্টারসকে কাজে লাগিয়ে। সবগুলোই যে অরিজিনাল সাইজের তা নয়, তবে স্কেল অনুসারে আসলের সঙ্গে মেপে ছোটো করা হয়। দাম কত জানেন? পনেরো হাজার থেকে শুরু তারপর কুড়ি, পঁচিশ, তিরিশ!’
‘এসব জিনিস লোকে কেনে!’
‘এদেশে দুধের বদলে পিটুলি গোলা খাবার লোকের অভাব আছে নাকি! লতা মঙ্গেশকর, কী রফি, কী কিশোরকুমারকে যদি পাড়ার ফাংশানে না আনা যায়, তাহলে কুছ পরোয়া নেই। লতাকণ্ঠী, রফিকণ্ঠ দিয়েই রমরম করে ফাংশন হবে। অ্যামপ্লিফায়ারে চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়া হয় নকলরা, ভেজালরা গান গাইবে, আপনারা পয়সা খরচ করে তাদের গান শুনতে আসুন। দলে দলে ছেলে বুড়ো সেই গান গিলতে টিকিট কাটে না কি? যারা কলোনিয়াল স্টাইলে বাস করতে চায়, বাড়ি সাজাতে চায়, তারা যদি রিনেইসান্স পিরিয়াডের নকল ছবি কেনে, তাহলে দোষ দেবেন কেন? বড়োলোক, মধ্যবিত্ত আর গরিব সবাই তো পিটুলি গোলা পান করার ব্যাপারে একই সারিতে দাঁড়িয়ে।’
রোহিণী এতক্ষণে বুঝে গেছে, প্রসঙ্গান্তরে ছিটকে যাবার একটা প্রচণ্ড প্রবণতা সিদ্ধার্থর মধ্যে রয়েছে। কলেজ মাস্টারদের এই এক ব্যাধি, সামান্য চান্স পেলেই লেকচার দিতে শুরু করে। আর তাতে যদি ব্যঙ্গ—বিদ্রূপের মওকা থাকে তো কথাই নেই!
‘কিন্তু সুভাষ গায়েন কি এইরকম একটা ছবি নকলের ব্যবসা শুরু করেছিল বলে আপনার মনে হয়েছে?’
‘ভীষণভাবে মনে হয়েছে। আরও মনে হয়েছে, শোভনেশ সেনগুপ্ত এটা জেনে ফেলেছিল।’
‘তাহলে গঙ্গাদাও জেনেছিলেন।’
কথাটা বলেই রোহিণী জিভ কামড়াল। এটা তো সিদ্ধান্ত—বিরোধী কাজ হয়ে গেল। তার চিন্তাটা এভাবে আচমকা মুখ থেকে বেরিয়ে এল কেন? গঙ্গাপ্রসাদ সম্পর্কে কি তার অবচেতনে বাজে কোনো ধারণা তৈরি হয়ে গেছে?
সিদ্ধার্থ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কী যেন ভাবল। ‘হতে পারে, হতে পারে। গঙ্গাবাবুকে হয়তো শোভনেশ বলেছিল।’
