‘আপনি বউবাজারের বাড়িতে গিয়ে কখনো কি খোঁজ নিয়েছিলেন, ওদের এই জেনারেশনের কেউ পাগল হয়েছে কি না?’
‘না খোঁজ করিনি। আপনিও করেছেন?’
‘না। আমি তো আপনার লেখাটা পড়ার আগে পর্যন্ত এ সম্পর্কে কিছু জানতাম না।’
‘তবে আমি গঙ্গাপ্রসাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি প্রথমে তো সন্দেহের চক্ষে আমাকে দেখলেন। নানান প্রশ্ন করলেন লেখাটার উদ্দেশ্য নিয়ে। বললেন, পাগলামির লক্ষণ মাঝে মাঝে শোভনেশের মধ্যে দেখা দিত। তবে দ্বিতীয় বিয়ের পর স্পষ্ট হয়েই দেখা দেয়। ওঁর মতে এজন্য দায়ী শোভনেশের নতুন বউ রোহিণী।’
‘আমি! কীভাবে?’ রোহিণী তার আসনে টলে পড়ছিল। অবশ্য এসপ্ল্যানেড স্টেশনে ট্রেন ব্রেক কষে থামার জন্যই কি না, তা বলা শক্ত।
‘চলুন, কার্জন পার্কে বসে সেটা বলছি।’
.
মেট্রো রেল স্টেশন থেকে বেরিয়েই ওরা একটা মিছিল দেখতে পেল। দক্ষিণ দিক থেকে এসে ধর্মতলার মোড় ঘুরে বাঁদিকে সিধু—কানু ডহরে বেঁকছে। পুব দিক থেকেও লেনিন সরণি ধরে আর একটা মিছিল এগিয়ে আসছে। ফলে ট্রাম বাস মোটর দাঁড়িয়ে ট্র্যাফিক বন্ধ।
‘মিছিল আর ট্র্যাফিক জ্যাম দেখতে আমার খুব ভালো লাগে, আপনার?’ সিদ্ধার্থ এগিয়ে যেতে যেতে বলল।
‘এটা কি একটা ভালো লাগার জিনিস?’ রোহিণী একটু অবাক বিভ্রান্ত হয়ে তার সঙ্গীর দিকে তাকাল। ‘কত লোকের কত অসুবিধে হয়, বলুন তো?’
‘নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা সৌন্দর্য আছে, ছন্দও আছে। আপনাকে সেটা খুঁজে বার করে নিতে হবে। একটা উচ্চচাঙ্গের মার্ডারের মধ্যেও কত যত্ন, কত মাথা খাটানো সূক্ষ্মতা থাকে… ভালো পেইন্টিং কি স্কালপচারেও আপনি সেটা পাবেন, ভালো খেয়াল বা ঠুংরিতেও পাবেন। এত লোকের অসুবিধে ঘটানো—এটা কি সহজ কাজ?’
এই সময় ধুতি পাঞ্জাবি পরা মাঝবয়সি একটি লোক মিছিল থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে ফুটপাতে উঠে মাটির জমিটুকু পার হয়ে লেনিনের মূর্তির প্রায় আট—দশ ফুট কাছে গিয়ে দু—পা ফাঁক করে ধুতির কোঁচা টেনে সরাল। সিদ্ধার্থ মুখ ফিরিয়ে খুব মন দিয়ে লোকটির কাজ দেখতে লাগল। ইতিমধ্যে বোধ হয় এই দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে, ব্রিফকেস হাতে প্যান্ট পরা এক যুবক মিছিলের সারি থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমে মন্থর গতিতে এগোল মূর্তির দিকে, তারপর লেনিনের মূর্তির কাছাকাছি হয়ে চলনের গাম্ভীর্য খসিয়ে প্রায় ছুটেই ধুতি পরার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
‘বেচারা! কতক্ষণ আর প্রকৃতির ডাক প্রত্যাখ্যান করা যায়! নিশ্চয় বহুক্ষণ সংগ্রাম চালিয়ে আসছিল’, সিদ্ধার্থ সখেদে মাথা নাড়ল।
কী ভাবছে বলুন তো?’
‘কে, লেনিন? না, না, উনি মোটেই কিছু ভাবছেন না—বুদ্ধিমান লোক, এই ক—বছরে কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতাকে চিনে ফেলেছেন ঠিকই।’
‘আমি বলছিলাম, চারপাশের হাজার হাজার মানুষ, তারা দেখে কী ভাবছে?’
‘মানুষ!’ সিদ্ধার্থ অবাক চোখে এধার—ওধার তাকাল, ‘মানুষ কোথায়? হাজার হাজার ধ্যানমগ্ন নির্বিকার ঋষি বলুন। চলুন, এই তপোবন থেকে অচিরে এবার বিদায় নেওয়া যাক।’
‘জায়গাটা ঘিরে দেওয়া উচিত।’
‘একটা কোনো উপলক্ষ আসুক, দেখবেন তখন ঢাকঢোল পিটিয়ে, মঞ্চ বেঁধে বক্তৃতা করে লেনিনের পবিত্রতা রক্ষার ব্যবস্থা হবে।’
কার্জন পার্কের দিকে যেতে যেতে সিদ্ধার্থ আবার তিক্তস্বরে বলল, ‘ড্রাগের নেশায় নাকি আমাদের তরুণসমাজ ধ্বংসের পথে… কিন্তু মনে হয় নাকি গোটা কলকাতাটাই হেরোইন খেয়ে ঝিমোচ্ছে? সেলফ ডিগনিটি বোধটাও আর অবশিষ্ট নেই।’
দু—জনে পার্কের দক্ষিণ দিকে রানি রাসমণির মূর্তির কাছাকাছি বসল।
‘একজনের আসার কথা, এইখানেই। তবে মনে হচ্ছে, জ্যামের জন্য দেরি হবে।…হ্যাঁ এইবার কাজের কথায় আসি।’ সিদ্ধার্থ বাবু হয়ে মুখোমুখি। চোখ বুজে কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিল। ‘শোভনেশ সেনগুপ্তর মধ্যে পাগলামি দ্বিতীয় বিয়ের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অন্তত গঙ্গাপ্রসাদের মতে, আর সেজন্য দায়ী আপনি।’
সিদ্ধার্থর কথার মধ্যে বিঘ্ন না ঘটাবার জন্য রোহিণী চুপ করে শুধু তাকিয়ে রইল।
‘আমি তখন কারণ জানতে চাইলাম। উনি বললেন, শোভনেশ তিন—চারবার তার কাছে অভিযোগ করে, বীণা চ্যাটার্জির স্বামী তাকে ব্ল্যাকমেইল করছে। বীণার যে স্বামী আছে, এটা সে আগে জানত না। এই স্বামীটি তাকে প্রায় বাধ্যই করছে আজেবাজে ছবি আঁকতে। যদি না আঁকে, তাহলে পরস্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারের মামলা করবে বলে শাসানিও দেয়। এতে শোভনেশ ভয় পেয়ে যায়। এতই সে মামলাকে ভয় করত যে, বীণার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে। বাড়িতে দরজা বন্ধ ঘরে বেশিরভাগ দিনই কাটাচ্ছিল। বীণা শোভনেশের নানারকম মানসিক বিকার দেখা দিতে শুরু করে। গঙ্গাপ্রসাদ এর পর পাঁচ মাস ছিল নির্বাসিতের মতো। সেখানে শোভনেশ অনবদ্য কিছু ল্যান্ডস্কেপ, গ্রামজীবনের কিছু ছবি আঁকে আর স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকে। তারপর ছবির প্রদর্শনী, সেখানে আপনার সঙ্গে দেখা, আর সেই দেখাতেই ওর মধ্যে আবার অস্থিরতা জেগে ওঠে। গঙ্গাপ্রসাদের ধারণা বিশেষ একটা ধাঁচের মেয়েদের শরীর ওকে উত্তেজিত করে। বীণার সেই ধাঁচের শরীর ছিল, আর আপনার রয়েছে। আবার ন্যুড আঁকার জন্য অশান্ত হয়ে ওঠার পরিণতিতেই এই বিয়ে। কিন্তু আপনি সিটিং দিতে রাজি না হওয়াতে উনি ক্ষেপে ওঠেন আর আবার বীণার কাছে ছুটে যান। কিন্তু বীণা এবার ওকে প্রত্যাখ্যান করে, ওর স্বামীও শোভনেশকে তাড়িয়ে দেয়। এর কারণটা কি জানেন?’
