সিদ্ধার্থ একনজর দেখেই বলল, ‘আমার আজ আর ক্লাস নেই। মিনিট দু—তিন দেরি করে এলে আপনার সঙ্গে দেখা হত না। বাড়ি চলে যেতাম।’
‘তাহলে চলুন, বাইরে গিয়েই বলব।’
কলেজের ফটক থেকে বেরিয়েই রোহিণী কৌতূহলটা আর চেপে রাখতে পারল না। ব্যগ্র হয়েই বলল, ‘আমাকে আপনি চিনলেন কী করে?’
‘ওই লেখাটা তৈরি করার জন্য তিন—চারটে খবরের কাগজের পুরোনো ফাইল ওলটাতে হয়েছিল। দুটো কাগজে আপনার ছবি দেখেছিলাম, শুধুই মুখটুকু। বাকি অংশটুকু আর দেখা হয়ে ওঠেনি।’
ফিচেল। বিচ্চচু। দাড়িটা ধরে একটা টান মারলে কেমন হয়। রাজেনেরই বয়সি। ওরা একই সময়ে যাদবপুরের ছাত্র ছিল। বয়সে তার থেকে ছোটোই হবে। এটা ভেবেই রোহিণীর মেজাজ লঘু হয়ে এল। সিংহ মশাই আসলে কতটা কেশর ফোলাতে পারে দেখার জন্য সে বলল, ‘বাকি অংশটুকু দেখে কী ধারণা হল?’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত ভালো আর্টিস্ট ঠিকই, কিন্তু ভালো বুদ্ধির লোক ছিলেন না। চোদ্দ বছর নির্বাসনে যান যে লোক এইরকম ‘বাকি অংশটুকু’ ফেলে রেখে, তাঁকে আমি… আপনিই বলুন বোকা নন কি?’ সিদ্ধার্থ নকল গাম্ভীর্য ভরা মুখটা ফিরিয়ে তাকাল পাশে হেঁটে চলা রোহিণীর দিকে। রোহিণীর ভ্রূ দুটি কৌতুকে একবার ওঠানামা করল।
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত কতটা লম্বা ছিল তা জানেন? ওর বুদ্ধিটাও ছিল ওর হাইটের সঙ্গে মানানসই। কিন্তু কোথায় যেন একটা গোলমাল হয়ে বুদ্ধিটা নেমে এসে, মানে আমার হাইটের থেকেও নেমে এসে বোকামি করত। জানেন, একবার তো দাড়িও রেখেছিল।’
রোহিণী ভেবেছিল, সিদ্ধার্থ এবার রেগে উঠবে। তার বদলে হাসতে শুরু করল। হাসিটা ওর সারা অঙ্গে ছড়িয়ে গিয়ে দমকা বাতাসে নুয়ে পড়া গাছের ডালের মতো ওর শরীরটাকে বাঁকিয়ে দিল আর ‘উ হু হু হু’ ধরনের একটা শব্দ মুখ থেকে বেরোতে লাগল। রাস্তার কিছু লোক ওর দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারল না।
‘বলেছেন ভালো। সত্যিই আমি খুব শর্ট হাইটেড, এজন্যই আর ছাদনাতলায় দাঁড়ানোর সুযোগ হল না। উ হু হু হু… দাড়িটা…উ হু হু হু… এটা বোধ হয়।’
‘হ্যাঁ, ওটা কালই নির্মল করুন। দেখবেন, ছাদনাতলার রাস্তাও পরিষ্কার হয়ে যাবে। সবাইকে কী সব জিনিস মানায়?’
‘আমার বউদিও ঠিক এই কথাই বলেছে, আর আপনার সঙ্গেই বউদি লেডি ব্রেবোর্নে পড়েছে। আপনার বাকি অংশের খবর তার কাছ থেকে আগেই পেয়েছি।’
‘বউদি আমার সঙ্গে পড়ত? কী নাম?’
‘শেফালি কর এখন সিংহ। আপাতত লস অ্যাঞ্জেলিসের ইউসিএলএ—তে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো স্বামীর রান্নাঘর সামলাচ্ছেন।’
‘ওম্মা! শেফালি আপনার বউদি? সেই কবে কত বছর আগে—।’ রোহিণী আর কথা বলতে পারল না।
‘চলুন মেট্রোয় উঠি। আপনি এখন কোনদিকে যাবেন?’
‘আমি কাজ করি মহারানি পত্রিকায়, থাকি সল্ট লেকে। দুটোই এখান থেকে উত্তরে। আপনি তো—।’ রোহিণী থেমে গেল। রাজেন বলেছিল, অরবিন্দ সরণিতে নাকি সিদ্ধার্থর বাড়ি। কিন্তু এখন রাজেনকে টেনে এনে সিদ্ধার্থর সামনে দাঁড় করানোর দরকার নেই।
‘আমিও উত্তরে। চলুন পাতালে প্রবেশ করা যাক।’
সিদ্ধার্থ টিকিট কাটল। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার সময় সে বলল, বলুন কী জানতে চান। তবে তার আগে বলে রাখি, এই লেখাটা তৈরি করার জন্য আমি অনেকের কাছে গেছি। প্রশ্ন করেছি আপনাকে খুঁজতে মহারানি অফিসেও গেছিলাম। কিন্তু আমাকে ওখানে বলা হয়, আপনি দু—মাসের ছুটি নিয়ে বোম্বাইয়ে দিদির বাড়ি গেছেন।’
‘সে কী! কে বলল এ কথা? আমি তো আজ পর্যন্ত দু—সপ্তাহও ছুটি নিইনি। কবে বলেছেন?’
‘বলেছেন গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি, তা প্রায় সাত—আট মাস আগে। আমি তাঁকেও কিছু প্রশ্ন করেছিলাম শোভনেশ সেনগুপ্ত সম্পর্কে।’
‘কিন্তু গঙ্গাদা এমন মিথ্যা কথাটা বললেন কেন!’ রোহিণী বিস্ময়টা মুখ থেকে বার করে ফেলেই মনে মনে নিজেকে ধমকাল। আবার নিজেকে প্রকাশ করছ? বেশি কথা না বলে নিজেকে আড়ালে রেখে শুধু অন্যদের খবরই নেবার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কী হল?
‘সেটা আমি কয়েকদিন পর বুঝতে পারি। তবে গঙ্গাপ্রসাদবাবু কিছু উলটোপালটা কথা আমায় বলেছিলেন, যা আমি লেখায় ব্যবহার করিনি। আমি অনুমান করছি, আপনি বোধ হয় জানতে চান, সেনগুপ্তদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি আমি জানলাম কীভাবে, ঠিক?’
‘ঠিকই।’
‘ট্রেন আসছে। আগে উঠি, তারপর বলছি।’
এসপ্ল্যানেডগামী ট্রেনে এই সময় ভিড় থাকে না। ওরা বসার জায়গা পেল। ‘দরজা বন্ধ হচ্ছে’ কথাটা তিনটি ভাষায় ঘোষিত হবার পর দরজা বন্ধ হয়ে ট্রেন চলতে শুরু করলে সিদ্ধার্থ বলল, ‘আমার ঠাকুর্দার মেজোভাই সেনগুপ্তদের এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। তাঁর একটু লেখালেখির বাতিক ছিল। ডায়েরিও রাখতেন। সেটা আমি পেয়ে যাই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি ধনী ব্যবসায়ীদের, জমিদারদের উত্থান আর পতন নিয়ে এখন অনেকেই কিছু একটা করার, অবশ্য সমাজবিজ্ঞান বা অর্থনীতির কিছুই তিনি জানতেন না। না জানলেও, একটা ফ্যামিলিকে ধরে তাদের কয়েক পুরুষের ওঠা আর পড়ার ঘটনাগুলো সাজিয়ে তিনি বাংলার, ওঁর মতে বাঙালি ধনীদের পিছু হটার কারণ দেখতে চেয়ে ডায়েরিতে কিছু কিছু কথা লিখে রাখেন, পরে কাজে লাগাবেন বলে। তাতে বেশিরভাগ তথ্য ছিল সেনগুপ্তদের সম্পর্কেই।
‘উনি কি বেঁচে আছেন?’
‘আমি যখন স্কুলে পড়ি তখনই মেজো ঠাকুরদা মারা যান, বছর পনেরো তো হলই।’
