প্রসঙ্গটা এড়াতে রোহিণী বলল, ‘এসব তো তর্কের ব্যাপার। শিল্প সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই এ ধরনের কথা ওঠে। কিন্তু আপনাকে উড়ো চিঠিটা কে লিখল বলে মনে করেন?’
‘দুটো নাম মনে হয়েছিল। শোভনেশ সেনগুপ্তর বন্ধু আপনার ম্যাগাজিনের মালিক গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি আর মীনা, এই দু—জনের একজন।’
‘গঙ্গাদা!’
‘হ্যাঁ। এই দু—জনই বীণা—শোভনেশ সম্পর্কটা জানত। শোভনেশ তার বন্ধুকে আর বীণা তার বোনকে মনের কথা খুলে বলত। ওরা দু—জনে বীণাকে পরামর্শ দিয়েছিল, আমাকে ছাঁটাই করে দিতে।’ সুভাষ গায়েন গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘শুধু ওর জীবন থেকেই নয়, পৃথিবী থেকেও।’
‘বলেন কি! … খুন!’
সুভাষ গায়েন মাথাটা হেলিয়ে দিল।
‘চেষ্টাও হয়েছিল। প্রথমে বিষ দিয়ে, তারপর গাড়ি চাপা দিয়ে। দুটোতেই দৈবক্রমে বেঁচে যাই।’
‘এসব কবে ঘটেছিল? মানে বীণা খুন হবার কত আগে?’
‘চারদিন আগে। রাত্রে টালা ব্রিজে ওঠার মুখে মোটর চাপা দেবার চেষ্টা হয়েছিল, তার চারদিন পরই বীণা ছাঁটাই হয়।’
‘মনে হচ্ছে, আপনি ওই দু—জনের কাউকে খুনি বলে ধরে নিয়েছেন, শোভনেশকে নয়।’
সুভাষ গায়েনের মুখটা মুহূর্তের জন্য কঠিন হয়েই মোলায়েম হয়ে পড়ল। আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে দোকানের ছেলেটাকে বলল, ‘তিনটে চায়ের দাম কত? তারপর রোহিণীকে লক্ষ করে, ‘আপনি ভবানীপুর যাবেন বলছিলেন না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাবটা পেলাম না।’
‘প্রশ্ন আবার কী? কৌতূহল বলুন। এত বছর পর এসব বাসি জিনিস ঘাঁটলে দুর্গন্ধ বেরোবে। যেখানে যাচ্ছিলেন, যান।’
রোহিণীকে ফেলে রেখে সে হনহন করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রোহিণীও বেরিয়ে এল। লম্বা পায়ে, সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে মোড়া শীর্ণ দেহ নিয়ে সুভাষ গায়েন বকের মতোই হেঁটে চলে যাচ্ছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে আবার একটা ধোঁয়াটে যুক্তি ও অযুক্তির মধ্যে পড়ে গেল।
সুভাষ গায়েনকে খুন করার চেষ্টা কে করবে, কেন করবে? মিনিবাসে ভবানীপুর যাবার পথে রোহিণী ভেবে দেখার একটা চেষ্টা করল। যদি ধরা যায় মীনাই, তাহলে কারণটা এইভাবে হতে পারে—শোভনেশকে সে ভালোবাসে সুতরাং মীনা তার মঙ্গলই চায়। বীণাকে ইতিমধ্যে শোভনেশের নেশায় পেয়ে বসেছে, অতএব মীনা তার দিদিকে সূক্ষ্মভাবে ঈর্ষা করতে পারে, মনে মনে রাইভালও ভাবতে পারে। যদিও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়িনীর জন্য কোনো ট্রফি নেই, আছে অহংকার রক্ষার জন্য এক ধরনের তৃপ্তি। অতএব মীনা চাইবে না দিদি সিটিং দিতে যাক। অবশ্য বীণাও নাকি আর চাইছিল না শুধু এই উদ্দেশ্যেই শোভনেশের কাছে যেতে। কিন্তু সুভাষ গায়েন অর্থাৎ স্বামী তাকে বাধ্য করত যাবার জন্য। কিন্তু যাকে ভালোবেসেছে, তার সান্নিধ্য তো সবাই কামনা করে। বীণার তো তা হলে শোভনেশের কাছে যাবার জন্য পা বাড়িয়েই থাকার কথা। অথচ বীণাকে নাকি সুভাষ গায়েন জোরজার করে পাঠাত। তাই কখনো হয়! রোহিণীর বিশ্বাস হচ্ছে না এই মারধোর করে পাঠাবার গল্পটা। বীণার গায়ে সুভাষ গায়েন হাত তুলত, কিন্তু সেটা বোধ হয় অন্য কোনো কারণে।
যাই হোক, রোহিণী ভেবে চলল, সম্ভবত মীনার এই বিশ্বাসটাই হয়ে যায় যে, শোভনেশ তার প্রতিভাকে নষ্ট করছে এইসব ছবি এঁকে, আর তাকে নষ্ট করাচ্ছে সুভাষ গায়েন তার বউকে পাঠিয়ে। সুতরাং প্রচণ্ড ঘৃণায় ক্ষেপে ওঠে মীনা চাইতেই পারে এই বদমাস লোকটা ধরাধাম থেকেই বিদায় হোক। কিন্তু চাওয়া আর সেটাকে কাজের মধ্য দিয়ে বাস্তব করে তোলা তো চাট্টিখানি কথা নয়। আরশোলা দেখলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলে এমন মেয়েও খুনের ব্যাপারে অসম্ভব সাহস দেখাতে পারে। মীনা শক্ত ধরনের মেয়ে, আরশোলা বা চামচিকে দেখলে চিৎকার না করে প্রথমেই সে ঝাঁটা খুঁজবে। অবশ্য গলায় ফাঁস দিয়ে বা বিষ খাইয়ে রক্তপাতহীন খুন করার যোগ্যতা মীনা রাখে। কিন্তু খুনটুন করা মানেই ঝুঁকি নেওয়া আর এই ঝুঁকি সে নেবে কেন?’
রোহিণীর কাছে সুভাষ গায়েনের এই খুনের অভিযোগটা মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। বরং সে যদি বলত, মীনা তার দিদিকে বিষ খাওয়াতে চেষ্টা করেছিল তাহলে নয় টেনেটুনে একটা মোটিভ খাড়া করা যেতে পারে। কিন্তু ওই লোকটাকে? … রোহিণী মাথা নেড়েই দেখল ভবানীপুর থানা থেকে এসে গেছে। নামার জন্য সে উঠে দাঁড়াল।
দশ মিনিট পর সে মুখোমুখি হল যে লোকটির, তার উচ্চচতা ফুট পাঁচেক হলেও ব্যক্তিত্বের দৈর্ঘ্য অন্তত পাঁচ মিটার। তবে রামছাগলে দাড়িটা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এখনও বিয়ে হয়নি, কেননা বউ থাকলে কিছুতেই সে এমন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত চোখা এবং সরল মুখটাকে দাড়ি রেখে ভোঁতা হতে দিত না। রোহিণী এজন্য অতি মৃদু ধরনের আঘাত পেল বটে, কিন্তু ওর কৌতূহল ভরা ঝকঝকে চোখ এবং হাসিটা তাকে আঘাত কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করল।
‘আমি সিদ্ধার্থ সিংহ, আপনি?… দাঁড়ান দাঁড়ান, যদি না আমার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে আপনি রোহিণী, ঠিক?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আমাকে…’
‘কী করে চিনলাম? বলছি। তার আগে বলুন আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন, আমার এ হেন সৌভাগ্যের কারণটা কী?’
‘আপনার একটা লেখা পড়ে কয়েকটা কথা জানতে…।’ রোহিণী তার ঝোলা থেকে ম্যাগাজিনটা বার করল।
