‘কী করেন তখন?’
‘দেখতেই তো পাচ্ছেন, রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকি।’
‘মীনাকে আপনি আমার পরিচয়টা দেননি?’
‘নাহ, দিতে যাব কেন? আপনি একটা ম্যাগাজিন থেকে এসেছেন একটা কাজে, আপনার পরিচয় হল ইন্টারভিউয়ার, ব্যস।’
রোহিণী ঘড়ি দেখল। দু—ধারে তাকিয়ে বলল, ‘ভবানীপুর যাব, বাস বা মিনিবাস এখান থেকে পাওয়া যাবে কি?’
‘একটু হেঁটে যদি সার্কুলার রোডে যান, তাহলে পাবেন।’ সুভাষ গায়েন আঙুল তুলে দেখাল কোন রাস্তা ধরে হাঁটতে হবে। রোহিণী সেই আঙুলের ডগামত হাঁটার জন্য দু—পা গিয়েই ফিরে দাঁড়াল।
‘আমি কিন্তু ওকে বলেছি আমি শোভনেশের স্ত্রী।’
যা দেখার জন্য রোহিণী কথাটা বলল, ঠিক তাই দেখতে পেল। সুভাষ গায়েনের মুখে চমকানিটা গান্ধীজির প্রশান্তিকে খান খান করে একটা নাথুরাম গডসে হয়ে বেরিয়ে এল।
‘সে কি, বলতে গেলেন কেন? তা মীনা কী বলল?’
রোহিণী তখন হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। প্রায় দৌড়েই সুভাষ গায়েন তার পাশে এসে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
‘শুনে মীনা কী বলল?’
‘অনেক কথাই বলল।’
‘আমার সম্পর্কে কিছু?’
‘যৎসামান্য। তাতেই আপনাকে যা বোঝার বুঝে গেছি।’
‘কী বুঝেছেন?’
‘মিথ্যেবাদী আর…।’
দশ—বারো পা নীরব থেকে সুভাষ গায়েন বলল, ‘এই চায়ের দোকানটায় একটু বসবেন? তা হলে দুটো কথা বলব।’
রোহিণী ঠিক করল, লোকটাকে এবার দুড়ুম দাড়াম কয়েকটা কথা বলবে।
রেস্টুরেন্টে এই সময় লোক থাকায় কথা নয়। ফাঁকা টেবিলে ওরা বসল। দু—কাপ চায়ের বরাদ্দ দিয়ে সুভাষ গায়েন বলল, ‘চা খাবেন তো?’
‘হ্যাঁ। বলুন কী বলবেন?’
কী বলবে সেটা ইতিমধ্যে ঠিকই করে ফেলেছে সুভাষ গায়েন, ভনিতা না করেই শুরু করল। ‘আমার থেকেও অনেক বেশি মিথ্যেবাদী আপনি পাবেন। হ্যাঁ বীণা আমার বউ, রেজিস্ট্রি বিয়ে। ওর বাড়িতে আপত্তি ছিল জাত নিয়ে আর রোজগারপাতিও খুব ছিল না। ইউনিভার্সাল অপেরায় ছোটোখাটো পার্ট করতুম আর ম্যানেজমেন্টের এটা—ওটা কাজ…আমিই বীণাকে যাত্রায় নিয়ে যাই। তখন ইউনিভার্সাল খাবি খাচ্ছে, পরপর তিনটে পালা ফ্লপ করে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, বীণাকে নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি। অ্যাক্টিংয়ের অ্যা—ও জানত না, আর কিছু বাজে লোকের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে। চতুর্থ পালাটা ফ্লপ করতেই ইউনিভার্সালের গদি ওলটায়। তখনই বিয়ে করি, মীনা তার একজন সাক্ষী ছিল।
‘হ্যাঁ, টাকা আমাদের দরকার ছিল, আর সেজন্য বীণার মডেলের কাজে আমি আপত্তি তো নয়ই বরং মনেপ্রাণেই চাইতাম। ওর একদমই ভালো লাগত না স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে থাকতে। পঞ্চাশ টাকা পেত, মাসে কয়েকদিন, তাও অনেক সময় টাকা বাকি থাকত। তখন একটা ডীল করি শোভনেশ সেনগুপ্তর সঙ্গে। সরাসরি আমি নয়, বীণাকে দিয়েই বলাই, নগদের বদলে ছবি দিয়ে টাকা শোধ করতে। ওই ধরনের ছবি কেনার খদ্দের অনেক আছে। তবে বিশেষ ধরনের পোজের ছবি। এমনকী এও বীণাকে দিয়ে বলাই, যদি টাকা রোজগার করতে চান তা হলে বেশি করে এই ধরনের ছবি আঁকুন, বিক্রি করে দোব পঁচিশ পারসেন্ট কমিশন নিয়ে। তখন ওনার খুব টানাটানির অবস্থা, রাজি হয়ে যান।’
চা এল। দু—জনে চুমুক দিল। রোহিণীর এখন মীনাকে বলা শোভনেশের কথাগুলো মনে পড়ছে: ‘যা এঁকেছি, সব বাজে। নষ্ট মনের কাজ। ওগুলো পুড়িয়ে ফেলা উচিত। লোকের চোখে যাতে না পড়ে সেজন্য ধ্বংস করে ফেলা দরকার।’ সে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘এমন ছবি কতগুলো এঁকেছিলেন?’
‘অনেক অনেক। বিক্রি করে অন্তত হাজার তিরিশ টাকা ওঁকে পাইয়ে দিয়েছি। আমি নিজেই পরে ছবির দালাল হয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করতুম। তবে বীণার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ওঁকে জানাইনি। আর বীণাও আমার কাছে লুকিয়ে যাচ্ছিল একটা ব্যাপারে, শোভনেশ সেনগুপ্তকে ও ভালোবেসে ফেলেছে। অবশ্য এটা সব বিবাহিত মেয়েই স্বামীর কাছে লুকোবে, স্বাভাবিক।’ ‘আপনি জানতে পারলেন কবে, কীভাবে?’
সুভাষ গায়েন লম্বা চুমুকে চা শেষ করে বলল, ‘আর এক কাপ খাব, আপনি?’
রোহিণী মাথা নাড়ল। এই সময় সে এক চুমুকও চা খায় না। শুধু দোকানে বসার অজুহাত পাবার জন্য সে চা নিয়েছে, ঠোঁটে কাপ ঠেকিয়েছে মাত্র দু—বার।
‘একটা লোক আমাকে উড়ো চিঠি দিয়ে জানায়। চিঠিতে যেরকম খুঁটিনাটি কথা ছিল তাতে মনে হল, লোকটি শোভনেশের ঘনিষ্ঠ, অনেকদিন ধরেই পরিচয়। তার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট, এই ধরনের ছবি এঁকে নিজের ট্যালেন্টকে অসম্মান করছে এই শিল্পী, তাতে সাহায্য করছে তার মডেল। আর এই মডেল এতে রাজি হয়েছে যেহেতু সে প্রেমে পড়েছে, শিল্পীর কাছে বেশিক্ষণ থাকার সুযোগ পাচ্ছে।’
‘চিঠি পেয়ে আপনি কী করলেন? বউয়ের মডেল হওয়া বন্ধ করে দিলেন?’ রোহিণী সরলভাবে প্রশ্ন করল। সুভাষ গায়েন সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে দ্বিতীয় কাপ চায়ে চুমুক দেওয়ায় ব্যস্ত হল। বোঝাই যাচ্ছে, উত্তরটা ভেবেচিন্তে দিতে চায়।
‘না, বীণাকে আমি বারণ করিনি। আজ স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বীণা তো মরেই গেছে, টাকার জন্যই আমি ওকে চিঠির কথাটা বলিনি, ওর যাওয়াও বন্ধ করিনি। হ্যাঁ, ওকে ভাঙিয়ে টাকা রোজগারের এই পথটা আমি খোলা রাখতে চেয়েছিলুম।’
‘কিন্তু আপনার স্ত্রীর এটা ভালো লাগত না। তিনি আপত্তি করতেন।’
‘মীনা আপনাকে বলেছে?’ সুভাষ গায়েন তীক্ষ্ন কথাটা বলেই আবার ঝিমিয়ে পড়ল। ‘হ্যাঁ, বীণাকে মারধোরও কিছু করেছি। তবে কী জানেন, বীণা তো যেতে চাইত নিজেই। কিন্তু ওর মাথাতেও কী করে যেন ঢুকে যায় চিন্তাটা—একটা আর্টিস্ট এইসব ছবি এঁকে নিজেকে নষ্ট করছে। কিন্তু আপনিই বলুন, আর্টিস্টকে তো আগে বাঁচতে হবে, তার তো খাওয়া—পরা দরকার, তারপর তো আর্টের চর্চা। আমি তো ওঁর অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থাই করছিলুম। ওঁকে তো আর্টের ছবি আঁকতে আমি বারণ করিনি? তিনি যদি না আঁকেন, আমি কী করতে পারি?’
