‘শোভনেশ আর কিছু কি আপনাকে বলেছিল?’ রোহিণী আবার শুরুতে ফিরে যাবার জন্য বলল। শোভনেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহটা ক্রমশই তার বাড়ছে। মীনা যে মিথ্যা বলছে না, এই বিশ্বাস তার এখন হচ্ছে। শুধু একটা ধাঁধা তৈরি হল, শোভনেশের ছবি কোনো এক জায়গা থেকে বিক্রির জন্য বাজারে আসছে আর ছবির দাম বেড়েছে। কেউ একজন টাকা করছে।
‘আমাকে বলেছিলেন আর যেন ওঁর সঙ্গে দেখা না করি। কোনোরকমভাবে যোগাযোগ না করি। অতীতকে একদমই ভুলে যেতে চান। নতুন মানুষ হতে চান। তা সত্ত্বেও আমি আবার গেছিলাম। দেখা করেননি।’
‘আপনার আমার মতোই পারফেক্ট। বুঝেছি আপনি কী বলতে চাইছেন, পাগল হয়েছেন কি না?’
রোহিণী কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ বোধ করল। সোজাসুজি কারোর উপর মস্তিষ্ক বিকৃতির দায় চাপিয়ে দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত নয়। নিখুঁত মস্তিষ্ক কার আছে? সে নিজেও কি দাবি করতে পারে,তার কথা আর কাজ সবসময় স্বাভাবিক ও সংগত হয়? ছ—ধাপ সিঁড়ি থেকে লাফ মারা যে কেউই শুনলে পাগল বলবে। রাতে ঘুমোবার আগে রোজ একটা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা, এটাও তো আর এক ধরনের পাগলামি!
সবই শোনা কথা। আমিও শুনেছি। শোভন কাকার আগের জেনারেশন পর্যন্ত সত্যিই এটা ঘটেছে। ওঁর এক পিসিকে একটুখানির জন্য জানলা দিয়ে দেখেছি, একটা বন্ধ ঘরে আটকে রাখা। থুরথুরে বুড়ি। আমায় দেখে মুরগির মতো চিঁ চিঁ করল। ভয়ে পালিয়ে আসি।’
‘শোভনেশ নাকি অপেক্ষা করছিল পাগল হয়ে যাবার জন্য?’
‘ওঁর জেনারেশনে দু—জন, উনি আর ওঁর ভাই যাকে কবিরাজমশাই দত্তক নিয়েছিলেন। তাকে কি আপনি দেখেছেন?’
রোহিণী দেখেছে পরমেশকে। দুই ভাইয়ের মধ্যে চেহারায় অদ্ভুত সাদৃশ্য। ছাদ দিয়ে বাড়ির দুই অংশে যাতায়াত করা যেত। পরমেশ চুপিসারে আসত একটি উদ্দেশ্যেই। যখন শোভনেশ আঁকত, তখন স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ করে দিত। স্টুডিয়োর বাইরের জানলা ছাড়াও ভিতরের বারান্দার দিকেও খড়খড়ির জানলা আছে। তারই পাখি তুলে সে দেখত নগ্ন মডেল বীণাকে। রোহিণী এ খবর পেয়েছিল বাড়ির ঠিকে ঝিয়ের কাছ থেকে। সে একদিন পরমেশকে কুঁজো হয়ে পাখি তুলে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিল। কি জানত, দাদাবাবু এখন বীণা দিদির ছবি আঁকছে। ধরা পড়েই পরমেশ ছুটে সিঁড়ি দিয়ে পালায়। কি ব্যাপারটা শোভনেশকে বলে। সে গিয়ে পরমেশকে ধমকায়, মারধোরও নাকি করে। ছাদের দরজায় চাবি দিয়ে শোভনেশ তারপর ছবি আঁকত।
.
পরমেশকে রোহিণী পাশের ছাদ থেকে স্টুডিয়োর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে। তিনতলায় একটা ঘরের জানলার ভাঙা পাল্লার ফাঁক থেকেও ওকে তাকাতে দেখেছে। রোহিণীর সঙ্গে চোখাচোখি হলেই চট করে সরে যেত। ব্যাপারটা বুঝতে তার বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামাতে হয়নি। তারপর থেকে জানলার কাছে যাবার বা বাড়ি থেকে বেরোবার আগে সে আঁচল টেনে ঢেকে নিত নিজেকে। মীনার কথার উত্তরে সে বলল, ‘হ্যাঁ, পরমেশকে মাঝে মাঝে দেখেছি।’
‘একবার ওর খবর নিলে ভালো হয়। যদি রটনাটা সত্যিই হয়। তাহলে পরমেশের কিছু হয়েছে কিনা সেটা তো দেখা দরকার।’
‘আমার আর কোনো দরকার নেই। তবে পরমেশের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার বোধ হয় আছে। যাকগে, এখন আমি চলি। জানি না, শোভনেশ এখন কোথায় কী করছে। পুলিশ নিশ্চয়ই খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
‘আপনার কাছে আসতে পারেন।’
‘পারে, নাও পারে। ঠিকানা তো জানে না। তবে মহারানির অফিস ও চেনে। সেখান থেকে জোগাড় করা তো সহজই। ‘রোহিণী নিরাসক্ত স্বরে বলল।
‘যদি যান আপনার কাছে, কী করবেন?’ মীনা ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল। ‘আপনি কি পুলিশ ডাকবেন?’
ফাঁপরে পড়ল রোহিণী। এমন অবস্থা হলে সত্যিই তো, সে ভেবে দেখেনি কী করবে! ফাঁকা ফ্ল্যাটে সে আর শোভনেশ! চিন্তা করা যায় না। থাকতে চায় যদি? যদি গলা—টলা টিপে ধরে? যদি বলে কিছু টাকা দাও চলে যাব, তাহলে যা আছে সব দিয়ে দেবে।
‘জানি না কী করব।’ অসহায়ভাবে রোহিণী বলল।
‘আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন?’ মীনা হাত চেপে ধরল রোহিণীর। ‘আমি ওঁকে লুকিয়ে রাখব। ওঁকে দিয়ে ছবি আঁকাব।’
রোহিণী যখন লিফটের জন্য অপেক্ষা করছে, তখন মীনা সম্পর্কে তার ধারণা বদলে গেছে। ‘আর্টিস্টিক সেন্স’ নিয়ে যে ব্যঙ্গটা তার মনে বুদবুদ কেটেছিল, সেটা আর নেই। মনে হল, মেয়েটির গভীরতা আছে।
বাড়িটা থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে পা দিতেই প্লেনের আওয়াজে আকাশের দিকে মুখ তুলল। রাজেন এতক্ষণে দিল্লিতে পৌঁছে গেছে। বিকেলে জয়পুরের ফ্লাইট ধরবে। আর তাকে এখন আশুতোষ কলেজে গিয়ে সিধারথ সিনহার খোঁজ করতে হবে।
‘মীনার ইন্টারভিউ নেওয়া হল?’
রোহিণীর পিঠের কাছ থেকে বলে উঠল সুভাষ গায়েন।
.
সুভাষ গায়েনের লম্বা গলার পাটকাঠির মতো সরু দেহটি সামনে ঝোঁকানো, মনে হয় যেন বিনয়ের চাপে ধুঁকছে। ধুতি আর পাঞ্জাবি সেদিনের মতোই সদ্য পাটভাঙা। আবার সে বলল, ‘মীনার ইন্টারভিউ নেওয়া হল?’
‘হ্যাঁ।’ রোহিণী খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সুভাষ গায়েনের মুখটি। মিথ্যাবাদীদের মুখে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকে, সেটা এবার থেকে তাকে জানতে হবে। কিন্তু তাকে হতাশ হতে হল। এখন ওর মুখ আর প্রার্থনাসভায় রামধনু শ্রবণরত গান্ধীজির মুখ প্রায় একই রকম।
‘মীনা খুব ভালো ইন্টারভিউ দেয়। আমি থাকলে ও ভালো করে কথা বলতে পারে না, তাই ওই সময়টা থাকি না।’
