‘চেষ্টা করে দেখি। অফিস কো—অপারেটিভ থেকে নয় লোন নেব।’
‘ভালো। পরশু সন্ধের ফ্লাইটে আমি চলে যাব।’
পরশু সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে সে দেখল দরজায় তালা ঝুলছে। তার পায়ের শব্দে দোতলা থেকে কাকিমা চেঁচাল, ‘কে?’
‘আমি অনন্ত।’
‘চাবিটা নিয়ে যাও।’
অনন্ত দোতলায় উঠে এল। জেঠিমা পুজোর ঘরে। কাকিমা, ঠিকে—ঝি আরতি, পাশের বাড়ির দু—জন গৃহিণী দালানে টিভি দেখছে।
‘ওই পেরেকে টাঙানো রয়েছে। বিকেলেই ওরা গেল। দিদি খুব কাঁদছিলেন, তোমার সঙ্গে আর দেখা হল না।’
শোবার ঘরে টেবলে চিরুনি চাপা দেওয়া একটুকরো কাগজ। তাতে বড়ো অক্ষরে লেখা : ‘দাদা, মা—কে নিয়ে যাচ্ছি, আমার কাছে শেষ ক—টা দিন থাকবে। রাগ কোরো না। ইতি—অমর।’
বারকয়েক পড়ে সে থম হয়ে বসে থাকে। মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙে যেতেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে বাচ্চচাছেলের মতো কেঁদেছিল। দেড় বছর আগে লিখে রেখে যাওয়া অমরের চিঠিটা ট্রাঙ্কের মধ্যে এখনও রয়েছে। মা এখন জীবিত।
অনন্ত বিছানায় পাশ ফেরার সময় মুখে একটা শ্রান্তির শব্দ করল। সারাটা জীবন শুধু খাটুনি আর খাটুনি। এইবার সে একদমই একা। রেবতী পরশু চলে গেছে। কোনো ঝগড়া হয়নি, সামান্য তর্কাতর্কিও নয়। এমনিই চলে গেছে। পাঁচ মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছে।
কীভাবে সে পরিচিতদের কাছে মুখ দেখাবে! জেঠিমা আজ সকালে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বউমা কোথায়, বাপের বাড়ি গেছে?’
‘হ্যাঁ।’
অমরের মতো ছোট্ট কাগজে অল্প কয়েকটা অক্ষর : ‘আমার আর ভালো লাগছে না। চলে যাচ্ছি। আর ফিরব না। রেবতী।’
মা বলেছিল, ‘তুই সুখী হবি, দেখিস…আমি বলছি। জীবনে তুই কখনো কষ্ট পাবি না।’
কবে বলেছিল, মা কবে বলেছিল কথাটা? ভাবতে ভাবতে অনন্ত ঘুমিয়ে পড়ল।
তিন
মাইনের দিন শক্তিপদ তারা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে কচুরি কিনে বাড়ি ফিরত। গোনাগুনতি মাথাপিছু চারটি অর্থাৎ চব্বিশটি। একবার সবাইকে ভাগ করে দিয়ে দেখা গেল একটি বেশি। পকেট থেকে খুচরো নোট ও পয়সা বার করে শক্তিপদ গুনে দেখল চব্বিশটির দামই সে দিয়েছে। দোকানি তা হলে ভুল করে একটি বেশি দিয়ে ফেলেছে। ‘ফেরত দিয়ে আসি।’ কচুরিটা কাগজে মুড়ে সে তখনই রওনা হয়ে গেছল। শীলা তখন বলেছিল, ‘পরে যেয়ো, আগে খেয়ে নাও।’ শক্তিপদ জবাব দেয়নি। অমর অস্ফুটে বলেছিল, ‘ফেরত দেবার দরকার কী? মিষ্টিওলাও তো কত লোককে ঠকায়।’
প্রথম মাইনে পেয়ে বাড়ি ফেরার সময় অনন্ত তারার দোকানের সামনে দাঁড়াল। দোকানের ভিতরে কয়েকজন খাচ্ছে। ক্ষীণ গন্ধ আসছে কচুরি ভাজার। ফুলকো গরম কচুরিতে আঙুলের টোকা দিয়ে গর্ত করছে একজন। কচুরি নিয়ে বাবা যখন বাড়ি পৌঁছত তখন ঠান্ডা হয়ে যেত। বেশিরভাগই চোপসানো। অনন্ত কানে কানে মা—কে বলত, ‘ফুলোগুলো কিন্তু আমার।’ আঙুল বসিয়ে গর্ত করে সে তারমধ্যে তরকারি ভরে দিত।
অনন্ত পায়ে পায়ে কাচের শো—কেসের সামনে এল। পকেটে চারটে দশ টাকার নোট মুঠোয় চেপে ধরে সে গলা থেকে স্বর বার করতে পারল না। দোকানি তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী দোব?’
‘কচুরি।’
‘ক—টা?’
‘চব্বিশটা।’ আপনা থেকেই সংখ্যাটা তার মুখে এসে গেল।
‘দু—মিনিট দাঁড়াতে হবে, ভেজে আনছে।’
অনন্ত অপেক্ষা করতে করতে রোমাঞ্চ বোধ করল। ব্যাপারটা ঠিক বাবার মতোই হচ্ছে। বাড়িতে নিশ্চয় সবাই অবাক হয়ে যাবে। বাবাকে তখন সবার মনে পড়বে। ভাববে, সংসারের শূন্যস্থানটা এবার পূর্ণ হল। সবাই অন্যরকমভাবে তাকে দেখবে।
তার বুকের মধ্যে একটা উচ্ছ্বাস ঠেলে উঠছে। রাস্তার যানবাহন, লোকের চলাচল, কোলাহল, নানান শব্দ, ভঙ্গি, সব তখন অনন্তের ইন্দ্রিয়ের পরিধি থেকে সরে গেছে। সে শুধু দেখতে পাচ্ছে বাবাকে, একহাতে তরকারির ভাঁড় অন্যহাতে কচুরির ঠোঙা, ঈষৎ ঝুঁকে, শুধুমাত্র রাস্তার দিকে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সামনে মানুষ থাকলে একবার মুখটা তুলেই পাশ কাটিয়ে নিচ্ছে।
‘চব্বিশটা কচুরি।’
‘চব্বিশটা, ঠিক গুনেছেন তো?’
‘কম নেই।’
দশ টাকার নোট কাচের উপর রাখল। তার প্রথম উপার্জন, প্রথম খরচ। খুচরো নোটগুলো পকেটে রাখার সময় তার মনে হল সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো উচিত।
‘পাঁচটা কড়াপাক সন্দেশ দিন।’
‘আট আনার না এক টাকার?’
‘আট আনার।’
বাবা কোনোদিন সন্দেশ আনেনি। তা হলে কি নেওয়া ঠিক হবে? অনন্ত দ্বিধায় পড়ল। বাবাকে কি ছোটো করা হবে? তা তো সে চায় না। প্রথম চাকরির প্রথম মাইনে পেয়ে বাবা কি বাড়ির লোকেদের মিষ্টিমুখ করায়নি? জীবনে তো শুধু একবারই। এতে নিশ্চয় দোষ হবে না।
পকেটে সন্দেশের ঠোঙা, দু—হাতে কচুরি ও তরকারি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একবার তার হাসি পেল। ইচ্ছে করেই অল্প কুঁজো হয়ে রাস্তার দিকে মুখ নামিয়ে সে কিছুটা হাঁটল। এখন তার পকেটে যে ক—টা টাকা, তার অন্তত কুড়িগুণ থাকত বাবার পকেটে। বাবার সমান হতে কি তার কুড়ি—বাইশ বছর লাগবে?
রাস্তার উপর চুন দিয়ে গোলাকার বৃত্ত আঁকা। রবারের বল খেলা হয়েছে বিকেলে। গোলকিপারের এলাকা চিহ্ন করে দাগ টানা। সে মাঝে মাঝে গোলকিপার হয়েছে। কোনো খেলাতেই তার দক্ষতা নেই। অমরকে সবাই দলে চায়। অন্য পাড়াও তাকে ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে নিয়ে যায়।
সদর দরজা ভেজানো। পা দিয়ে ঠেলে খুলতেই আবছা অন্ধকার উঠোনে দেখতে পেল পিছন ফিরে মা সাবান কাচছে। ডাকতে গিয়েও ডাকল না। পা টিপে সে মা—র পিছনে এল। ঝুঁকে ঘাড়ের কাছে মুখ নামাল।
