‘হাল—লুম।’
‘বাবা গো!’
শীলা কেঁপে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখল অনন্ত ঠোঙা আর ভাঁড় তুলে হাসছে।
‘এরকম করে ভয় দেখায়!’
‘আমি তো হালুম করেছি। বাঘ এখানে আসবে, তাই ভেবেছ? এই দ্যাখো।’
শীলা ভ্রূ কুঁচকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
‘কী রে?’
‘বাবা যা আনত।’
‘আজ মাইনে দিল বুঝি! ঘরে রাখ আসছি। ঠাকুরপো তোর জন্য অনেকক্ষণ বসে রয়েছে।’
অনন্ত ঘরে ঢুকতেই সবাই তার হাতের জিনিস দুটোর দিকে চোখ রাখল। পাতলা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। ঠোঙা আর ভাঁড়টা কোথায় সে রাখবে ভেবে পাচ্ছে না। মেঝেয় বই নিয়ে অলু আর অমর। তক্তাপোশে অনু। অবিনাশ চেয়ারে বসে মন দিয়ে অমরের ভূগোল বইটা পড়ছে।
‘কাল অফিসে এসেছিল তোদের মালিক। আস্ত ঘুঘু…হাতে কী?’
‘কুচুরি।’
‘মাইনে দিয়েছে? মহা ধড়িবাজ, বলে কিনা আমার তো লোকের দরকার নেই, আপনি বললেন তাই ছেলেটাকে রাখলুম, খরচ বেড়ে গেল। আসলে মতলব এইসব বলে যদি আরও কিছু কাজ পাওয়া যায়। সুনির্মলবাবুকে বললুম সব। তিনি তো রেগে উঠে বললেন এখান থেকে যথেষ্ট কাজ পেয়েছে, শুধু শক্তিবাবুর ছেলের জন্যই ওকে কাজ দিয়েছি নইলে দিতুমই না। তোর সঙ্গে ব্যবহার করে কেমন?’
‘ভালো।’
‘কাজ শিখেছিস কিছু? এক মাস তো হল।’
‘অল্পস্বল্প, শক্ত কাজ তো নয়।’
ঘরে ঢুকল শীলা। তার চোখ ঝকঝক করছে। ঠোঙাটা তুলে নিয়ে বলল, ‘কী দরকার ছিল এসব আনার, আজেবাজে পয়সা নষ্ট।’
মায়ের আনন্দ কারোর কাছেই চাপা রইল না। শীলা একটা কাঁসার থালায় তরকারির বেশিরভাগ ঢেলে চার ভাগ করল, আর একটা প্লেটে বাকিটা তুলে অবিনাশের হাতে দিল। কচুরির ঠোঙাটা অনন্ত বাড়িয়ে দিল অমরের সামনে, ‘চারটে। সবার জন্য চারটে করে।’
ঠিক এইভাবেই তার বাবা বলত। ঠোঙা থেকে চারটে কচুরি তুলে সে অবিনাশের প্লেটে রাখল।
‘তোর কই?’
‘আমার আর মা—র আছে। আগে বরং একটু মিষ্টিমুখ হোক।’
ম্যাজিসিয়ানের মতো হাত নেড়ে অনন্ত পকেট থেকে এক ঝটকায় সন্দেশের ঠোঙা বার করল।
‘জীবনের প্রথম রোজগার। তবে এরপর আর এভাবে খরচ করা নয়।’
অবিনাশ স্মিত হেসে বললেও স্বরে কিছুটা ভর্ৎসনা ছিল।
‘হ্যাঁ, আর নয়।’ শীলা প্রতিধ্বনি করল। ‘তোরটা এখুনি খেয়ে নে, রেখে দিলে আর থাকবে না। যা সব…আমার ক—দিন ধরেই অম্বল হচ্ছে ভাজাটাজা আর খাব না।’
‘তা হলে আমায় দাও।’ অমর হাত বাড়াল। অনন্ত তার হাতে একটা কচুরি দিল, দুই বোনকেও। অবিনাশ হাতটা তুলে তাকে দিতে নিষেধ করল।
অনন্ত ভাই—বোনেদের মুখের দিকে তাকাল। এই মুহূর্তে সারা ঘর স্থির একটা নিশ্চিন্তিতে ডুবে গেছে। সবার মুখেই সুখের বুড়বুড়ি। অমর কচুরির সামান্য একটু ছিঁড়ে তরকারির ঝোলে বুলিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চিবোচ্ছে, মাঝে মাঝে দু—চোখ বুজে আসছে। অনু আঙুলের ডগায় ঝোল মাখিয়ে জিবে ঠেকাচ্ছে। অলুর চোখ দ্রুত চিবোনোর জন্য বড়ো হয়ে উঠেছে আর ঢোক গিলছে। বহুদিন পর তাদের ঘরে কিছুক্ষণের জন্য বাবা ফিরে এল। ‘বড়োছেলেরাই তো একসময় বাবার জায়গা নেয়’, আজ থেকে সে বড়ো হয়ে গেল। এখন তার আঠারো চলছে।
অনন্ত রাত্রে স্নান করে জলকাচা পাজামাটা উঠোনের তারে মেলে দিচ্ছিল। শীলা কাছে এসে নীচুস্বরে বলল, ‘ওরা আজ ভাড়া চেয়েছে, একসঙ্গে চার মাসেরই।’
অনন্ত চুপ করে রইল।
‘একগাছা চুড়ি বিক্রি করলে ভাড়াটা মেটানো যায়।’
‘অনু অলুর বিয়ের জন্য রাখবে বলেছিলে।’
‘ওদের বিয়ের বয়স হতে এখনও সাত—আট বছর বাকি। ততদিনে টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। তেরো হাজার টাকা তো রয়েইছে।’
‘ততদিনে সোনার দামও তেরোগুণ হয়ে যাবে।’
‘তা হলে? উনি প্রতি মাসে ঠিক সময়ে ভাড়া পাঠিয়ে দিতেন, কোনোবার দেরি করেননি। এই প্রথম বাকি পড়ল, তাও চারমাসের।’
‘এরকম দু—চার মাস বাকি সব ভাড়াটেদেরই পড়ে।’
‘আমাদের কখনো পড়েনি।’
দু—জনে চুপ করে রইল। দোতালায় রেডিয়ো থেকে পল্লিগীতি ভেসে আসছে। নর্দমা থেকে একটা ছুঁচো উঠোনে লাফিয়ে উঠে শীলার পা ঘেঁষে ছুটে গেল। দূরে কোনো বাড়িতে ঝগড়া হচ্ছে।
‘একটা কথা বলব, রাগ করবি না?’
‘কী কথা?’
‘খোকার মা আজ বিকেলে বলল, বলাই মিত্তির লেনের দাসেদের বাড়িতে রান্নার লোক খুঁজছে।’
‘রাঁধুনি হবে!’
অনন্ত চাপা চিৎকার করে উঠল। তার হাতের আঙুলগুলো থরথর কাঁপছে।
‘তুমি চিন্তা করতে পারলে?…শেষকালে এমন একটা কাজের কথা…বাবা বেঁচে থাকলে তুমি এ—কথা বলতে পারতে?’
‘উনি তো আর নেই।’
‘আমাদের বংশ, মান—সম্মান?’
‘খেতে পরতে হবে, বাড়ি ভাড়া, এটা—ওটা, স্কুলের মাইনে…তুইও কি কখনো ভাবতে পেরেছিলিস পড়া ছেড়ে চল্লিশ টাকার কাজ নিবি?’
‘আমি ব্যাটাছেলে, আমার সব মানিয়ে যায়…না, তোমাকে রাঁধুনি হতে হবে না।’
অনন্ত প্রায় ছুটেই ঘরে এল। দেওয়াল ঘেঁষে অমর ঘুমোচ্ছে মেঝেতেই। তার পাশে বালিশটা ছুড়ে, আলো নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ল। কিছু পরে সে পাশের ঘর থেকে মা—র কণ্ঠস্বর পেল, ‘কী বিচ্ছিরি শোয়া বাপু…ওদিকে পা সরা।’
অনন্তের ঘুম আসছে না। অজস্র রকমের চিন্তা তার মাথায় যাওয়া—আসা করছে। প্রত্যেকটাই ভয়ের আর হতাশার। মা রাঁধুনি এ—কথা শুনলে পাড়ার লোকে কী বলবে, ওপরের লোকেরাও? অলু, অনু, অমরের স্কুলে যেভাবেই হোক অনেকেই জেনে যাবে। ঝি—চাকর—রাঁধুনি মোটামুটি তো একই পর্যায়ের। কেউ যদি ওদের আঙুল দেখিয়ে বলে রাঁধুনির ছেলে…রাঁধুনির মেয়ে’! ভাগ্য যাকে যেমন দেবে তা মেনে নিতেই হবে, কিন্তু তাই বলে মান—সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিতে হবে নাকি?
