‘পঁয়ত্রিশ, বড্ড কম। একটু বাড়ান, পঞ্চাশ করুন।’
অবিনাশকাকা আধ ঘণ্টা কষাকষি করে চল্লিশ টাকায় প্রসাদ ঘোষকে রাজি করান।
‘আপনার অফিস তো আর সেরকম কাজকম্ম দিচ্ছে না। সেই কবে ছ—মাস আগে একটা চার হাজার টাকার কাজ শেষ পেয়েছিলুম তারপর হাঁটাহাঁটিই সার হল। স্টোরকিপারকে তো ফাইভ পার্সেন্ট দিয়েছি, আরও একটা পার্সেন্ট বাড়াতে রাজি।’
‘আমি কালই কথা বলব সুনির্মলবাবুর সঙ্গে। শক্তিদার ছেলের উপকার হবে শুনলে নিশ্চয় কিছু কাজ করবে।’
চারদিনের মধ্যে দু—হাজার টাকার কাজ পেয়েছিল কমলা বাইন্ডার্স। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কাজ। প্রথম দিন অনন্ত মুশকিলে পড়েছিল দুপুরবেলায়। খিদেয় পেটে মোচড় দিচ্ছিল কিন্তু পকেটে পয়সা নেই। পাঁচজন দফতরিই বাড়ি থেকে রুটি ভাত এনে খায়। যেদিন আনে না কাছেই রাস্তার চায়ের দোকানে পাঁউরুটি আলুর দম খেয়ে নেয়।
অনন্তকে কাজ দেওয়া হয়েছিল পরেশ দাস নামে প্রৌঢ় কারিগরটির সঙ্গে। শীর্ণ, কুঁজো লোকটির বিরাট এক কোরণ্ড। মালকোঁচা দিয়ে ধুতিতে সেটি আঁট করে বাঁধা, পরনে ছেঁড়া গেঞ্জি। সে লক্ষ করেছিল অনন্ত বাড়ি থেকে খাবার আনেনি। দুটি রুটির উপর আলুছেঁচকি রেখে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘খাও। পেট ভরবে না জানি তবু সারাদিন খালি পেটে থাকা ভালো নয়।’
সে লজ্জায় পড়ে গেছল। নিতে রাজি হয়নি। পরেশ দাস দু—বার অনুরোধ করে নীরবে রুটি চিবিয়ে খায়।
‘মালিক কত দেবে বলেছে।’
‘চল্লিশ টাকা।’
‘বাড়িতে খেতে গেছে। এলে আট আনা পয়সা চেয়ে নিয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে খেয়ে নিয়ো। লজ্জা কোরো না, আগাম বলে চাইবে।’
প্রসাদ ঘোষ ফিরে এল আধ ঘণ্টা পর। কিন্তু সে আট আনা চাইতে পারেনি। সে ভেবে দেখেছে সকাল থেকে ঝাঁট দেওয়া, টিউবওয়েল থেকে কলসিতে জল ভরা ছাড়া শুধু কয়েকটা পুরোনো পাঠ্য বইয়ের মলাট খুলেছে আর কয়েকটা বোর্ডে লেই মাখিয়েছে। এই কাজের জন্য হয়তো আট আনা প্রাপ্য হয় কিন্তু এখুনি হাত পাতলে মালিক কী ভাববে তার সম্পর্কে তাদের পরিবার সম্পর্কে? হাঘরে ভিখিরি! আট আনাও পকেটে রাখার সামর্থ্য নেই!
সে আর চাইতে পারেনি। সারাদিন কয়েকবার জল খেয়েছিল। রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ফ্রকপরা একটি মেয়েকে সে চা তৈরি করতে দেখে। সর্বাগ্রে তার নজরে পড়ে আঁটো ফ্রকের ভিতর থেকে স্তনের দৃঢ়তা ফুটে রয়েছে। আবলুস রঙের চামড়া। ঘাড় পর্যন্ত চুল। মুখটি মিষ্টি। চাহনিতে চঞ্চলতা। দু—দিন পর দুপুরে বেঞ্চে বসে আলুর দম কিনে রুটি দিয়ে খেতে খেতে সে চাওয়ালাকে বলতে শুনল, ”গৌরী, উনুন কামাই যাচ্ছে, মটরগুলো সেদ্ধ কর।”
সেদিন মধ্যরাত পর্যন্ত সে ঘুমোতে পারেনি। শরীরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি চলাফেরা করেছিল।
অনন্ত আজ রাতেও আর এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করছে তবে শুধুই মাথার মধ্যে ইঞ্জিনের পিছনে মালগাড়ির মতো সার সার চিন্তা মাঝে মাঝেই লাইন বদলে অন্য লাইনে চলে যাচ্ছে। সে রেবতীর কথাই ভাবতে চায় কিন্তু তার কৈশোর আর প্রথম যৌবন বারবার তার চিন্তাকে থামিয়ে দিচ্ছে লাল সিগন্যালের মতো।
দিলীপ ভড় রেবতীদের ঘরের তক্তাপোশে পা ছড়িয়ে একটা বালিশ বগলে রেখে কাত হয়ে শুয়েছিল। সিগারেটের ছাই পড়ছিল মেঝেয়। রেবতীর ছোটোবোন শ্বাশ্বতী ওর পায়ের কাছে বসেছিল, একটা হাত দিলীপ ভড়ের পায়ের উপর আলতো করে রেখে অনন্তকে দেখছিল কৌতূহলে। অনন্ত তখন ভাবছিল এই লোকটা কে? নিকট আত্মীয়?
‘কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন কেন?’
‘তা ছাড়া উপায় ছিল না।’
‘সম্বন্ধ করে বিয়ে দেবার মতো কেউ নেই?’
‘না।’
অনন্ত হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। কেউ নেই বলাটা ঠিক হল কি? দুটো বোন, একটা ভাই আর মা থাকা সত্ত্বেও তার কেউ নেই। সবাই দূরে দূরে। তাকে ফেলে মা যেতে চায়নি। কিন্তু থেকেও কোনো লাভ হত না। পেটের যন্ত্রণায় কাতরাত আর বিড়বিড় করত: ‘ভগবান, ভগবান, আর পারছি না গো। এবার নিয়ে যাও আমায়।’ দেখাশুনো করার লোক রাখারও সামর্থ্য নেই। রান্না, বাসনমাজা, কাচাকাচি সংসারের যাবতীয় কাজ অনন্ত নিজেই করত। মাঝেমধ্যে অলু এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যেত। পাড়ায় ছিল মেয়ে ডাক্তার মাধবী দত্ত। তিনি দেখে বলেছিলেন, ‘হাসপাতালে ভরতি করান, মনে হচ্ছে ক্যানসার।’
অনন্ত সেইদিনই অমরকে চিঠি দিয়েছিল। চারদিনের মাথায় অমর দিল্লি থেকে উড়ে এসে উঠল অফিসের গেস্ট হাউসে। মা—কে সে পরদিনই বড়ো ডাক্তার দেখিয়ে এক্স—রে করায়। ‘মা—কে নিয়ে যাব, ট্রিটমেন্ট দিল্লিতেই করাব।’
‘থাক না এখানে।’
‘অপারেশন করে একটা চেষ্টা করা যাক। এখানে থেকে লাভ কী? দেখার লোক নেই, তা ছাড়া খরচও অনেক।’
‘শুনেছি এ রোগে কেউ বাঁচে না।’
অমর জবাব দেয়নি। সন্ধ্যার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নীচুস্বরে কথা বলছিল। অমরের মুখ থেকে সে হালকা মদের গন্ধ পাচ্ছে। মা ভিতরে দালানে বসে রয়েছে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে।
‘মরবেই যদি তা হলে এখানেই মরুক না। আবার টেনে হিঁচড়ে অত দূরে নিয়ে গিয়ে কী লাভ!’
‘অপারেশন করলে আরও কিছুদিন কয়েক মাস কী একটা বছর টিকে যাবে। পারবে তুমি? ওষুধপত্তর ধরে কম করেও হাজার আষ্টেক টাকা, পারবে?
অনন্ত অসহায় বোধ করল। ব্যাঙ্কে তার সাড়ে সাত হাজারের মতো টাকা জমেছে। ক্যানসার রোগীর জন্য টাকা খরচ আর ভস্মে ঘি ঢালা একই ব্যাপার। কিন্তু বিনা চিকিৎসায় মা মারা যাবে? হতে পারে না। জীবনবিমা করেছে কুড়ি হাজার টাকার। তার মাইনে এখন কেটেকুটে ছ—শো একানব্বুই টাকা। অমর কত টাকা রোজগার করে তা সে জানে না। হয়তো সাত—আট হাজার মাইনে পায়। বার চারেক তো বিদেশ ঘুরে এসেছে।
