‘শোভনেশ সেনগুপ্ত বিয়ে করেছিলেন জেলে যাবার ছ—মাস আগে, সেটা নিশ্চয় জানেন।’
‘হ্যাঁ।’
‘বউকে দেখেছেন?’
মীনা স্থির দৃষ্টিতে রোহিণীর মুখের উপর চোখ রাখল। চোখের মণির আকার, রং, যেন বদলাচ্ছে। রগের কাছে দপদপ করল। ঠোঁট দুটি খুলে যাচ্ছে। মুখের পাতলা চামড়ার নীচে পাণ্ডুর রং ফুটে উঠছে।
‘আমার দিদিকে আপনি দেখেছেন?’
‘না।’
‘মুখটুকু বাদ দিলে হুবহু আপনিই। এখন মনে হচ্ছে,শোভন কাকা কেন বিয়ে করেছিলেন।’
‘কিন্তু খুন করলেন কেন?’
‘সেটা আপনিই বলতে পারবেন। আপনি তখন ওই বাড়ির বাসিন্দা, ওঁর কাছের লোক। আমি কোনো কারণ বার করতে পারিনি।’
‘আমিও না।’
‘উনি কি বিয়ে করে সুখী হননি?’
‘আমার পক্ষে যা সম্ভব, তা করার চেষ্টা করেছি। যা অসম্ভব ছিল তা পারিনি।’
‘কী অসম্ভব ছিল?’
‘ওর ছবি আঁকার মডেল হওয়া, যেটা আপনার দিদি পেরেছিলেন।’
মীনার মুখটা ধীরে ধীরে ফিরল ছবিটার দিকে। নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল। রোহিণীর কাছে এই মুহূর্তগুলো করুণ লাগছে। ওর মনের মধ্যে এখন কী ভাবনা চলছে, তা বোঝার উপায় নেই। বোধ হয় কিছুই ভাবছে না। শূন্যতায় ভরা।
‘একটা কথা আপনি জানেন না, জানা সম্ভবও নয়…।’
রোহিণী থেকে গিয়ে পরিস্থিতিটা নাটকীয় করে তুলল। মীনার চোখ থেকে শূন্যতা সরে গিয়ে ফিরে এল অনুভব ক্ষমতা।
‘কী জানি না?’
‘শোভনেশ কয়েক দিন আগে পালিয়েছে বহরমপুর থেকে। হাসপাতালে ছিল আর একজন কয়েদির সঙ্গে। দু—জনে একসঙ্গে সেখান থেকে পালিয়েছে।’
‘কোথায় এখন!’ মীনা দাঁড়িয়ে উঠল। উত্তেজনা যেন তার সর্বাঙ্গে হুল ফুটিয়েছে। ছটফট করে সে আবার বলল, ‘আপনার সঙ্গে কি দেখা হয়েছে?’
‘না।’
‘দেখা হবে?’
‘বলতে পারব না।’
‘আমার কথা বলবেন?’
‘নিশ্চয়, যদি দেখা হয়। কিন্তু আমি মোটেই দেখা হওয়ার জন্য ব্যস্ত নই। আমার জীবন থেকে তাকে মুছে ফেলেছি।’ রোহিণীর স্বর আপনা থেকে কর্কশ হয়ে উঠল।
‘আমার আর তাকে প্রয়োজন নেই।’
‘কিন্তু আমার আছে।’ মীনা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘ভোলা সম্ভব নয়।’
রোহিণী নীরবে তাকিয়ে। মীনা বসার জন্য পিছনে হাত নিয়ে গিয়ে বিছানাটা খুঁজছে। চোখ দুটি সুদূর অতীতে। ধীরে ধীরে নিজেকে সে বিছানায় নামিয়ে দিল।
‘আমি এবার যাই।’ নরম গলায় রোহিণী বলল।
মীনার কানে কথাটা ঢুকল না। সে একদৃষ্টে ছবির দিকে তাকিয়ে।
‘বছর চারেক আগে আমি দেখা করতে গেছিলাম। লুকিয়েই। বললেন, মুক্তি চাই, স্বাধীনতা চাই, প্রকৃতির ছবি আঁকতে চাই। এখান থেকে বেরোতে চাই। আর নারীদেহ নয়।’
‘আর কী বললেন?’ রোহিণীর আগ্রহ আবার ফিরে এল। শোভনেশের চরিত্রের আর একটা দিক খুলে যাচ্ছে।
‘ছবি আঁকার কিছু এখনও শেখা হয়নি। আবার অ—আ—ক—খ থেকে শুরু করতে চাই। যা এঁকেছি সব বাজে নষ্ট মনের কাজ। ওগুলো পুড়িয়ে ফেলা উচিত। লোকের চোখে যাতে না পড়ে, সেজন্য ধ্বংস করে ফেলা দরকার। আপনি কি জানেন, ওঁর আঁকা ছবিগুলো এখন কোথায়?’
‘আমি চল্লিশ—পঞ্চাশটার মতো ছবি দেখেছিলাম ওর স্টুডিয়োতে, গাদা করে একধারে রাখা ছিল। ওর বন্ধু গঙ্গাপ্রসাদ, যাকে আপনি ছোটোবেলায় দেখেছেন, এখন তিনি এই মহারানির মালিক, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সেই ছবিগুলোর কী হল? বললেন,পোকায় কেটে, বৃষ্টির জলে সব নষ্ট হয়ে গেছে।’
‘সে কি! আমি তো এই ছবিটাই তিন বছর আগে উপহার পেয়েছি একজন প্রোডিউসারের কাছ থেকে। তিনি তার মাত্র দু—হপ্তা আগে কিনেছিলেন সাত হাজার টাকায়। এই সেদিনও এক আর্ট ডিলার বললেন, শোভনেশ সেনগুপ্তর ছবি নাকি এখন বাজারে একটা দুটো করে আসছে। দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা দাম।’
‘আপনি উপহার পেয়েছেন, না আপনার দিদি তার এক বন্ধুর কাছে এটা রেখেছিল?’
‘তার মানে?’
‘এরকম ছবি বাড়ি নিয়ে যেতে লজ্জা হচ্ছিল বলে উনি বন্ধুকে দিয়ে দেন। এইরকমই তো শুনেছি।’
‘মিথ্যে কথা। কে বলেছে আপনাকে?’
‘আপনার সেক্রেটারি সুভাষ গায়েন। আগের দিন উনি আমাকে বলেছেন। আচ্ছা, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কি আপনার দিদির কোনো…।’ রোহিণী অসম্পূর্ণ রাখল বাক্যটি।
‘এর সঙ্গেই দিদির বিয়ে হয়েছিল। দিদিকে দিয়ে কয়েকটা ছবি সুভাষদা জোগাড় করে। পারভারটেড বহু পয়সাওয়ালা লোক আছে, যাদের কাছে পর্নোগ্রাফিক মূল্য ছাড়া ওই ছবির আর কোনো দাম নেই। তাদের কাছে বিক্রি করে বেশ কয়েক হাজার টাকা পায়। তাইতে ওর লোভ বেড়ে যায়। দিদিকে প্রেশার দিতে থাকে, আরও ছবি নিয়ে আসার জন্য। এমনকী, ভালগার অ্যাপিল তৈরি হয় এমন পোজে ছবি আঁকিয়ে নেবার জন্যও এমন সব কাণ্ড করেছিল, যেটা প্রায় অত্যাচারেরই মতো। এসব কথা দিদি আমাকে বলেছে। দিদিকে, বলতে গেলে এই সুভাষদাই নষ্ট করেছে।’
‘এমন লোককে আপনি রেখেছেন কেন?’
মীনার মুখে পাতলা হাসির মোচড় দেখা দিল। ধীর কণ্ঠে বলল, ‘এই লাইনে এক মেয়েছেলের জন্য পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করে আছে। সুভাষদা অত্যন্ত বিশ্বাসী বুলগড। হুঁশিয়ার, চতুর, আমার ভালোর জন্য সব করতে পারে। টাকাকড়ির ব্যাপারেও বিশ্বস্ত। দিদির মৃত্যুর পর আমি ওকে ডেকে আনি। যদিও ওকে আমি ঘৃণা করি।’
‘যে প্রোডিউসার ছবিটা আপনাকে দিয়েছেন, তাঁর নাম কী? তিনি কার কাছ থেকে কিনেছিলেন, সেটা কি জানেন?’
‘জগন্নাথ ঘোষ, মাস ছয়েক আগে মারা গেছেন। ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তো অবশ্যই, কিন্তু তিনি জানিয়ে দেন, কিছুতেই বলা যাবে না কার কাছ থেকে কিনেছেন। তখন আমি বলি, এই আর্টিস্টের আরও ছবি থাকলে কিনব। দিন তিনেক পর তিনি বললেন, আর ছবি নেই।’
