‘দিদি…’ যেন চটকা ভাঙল। ‘দিদি বিয়ে—থা করে সংসার করছে।’ মীনা শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল।
.
‘আপনি এখনও বিয়ে করেননি। কেন?’ কথার পিঠে কথায় প্রশ্নটা করার সুযোগ পেয়ে রোহিণী করেই ফেলল।
‘এমনি। করার মতো মানুষ পাইনি, পেলে নিশ্চয়ই করব।’ মীনা হালকা সুরে বলল। রোহিণী নোট বইয়ে কলমের আঁচড় দিল।
‘কী ধরনের মানুষ পেলে আপনি বিয়ের কথা ভাববেন?’ বাঁধা গৎ—এর প্রশ্ন। পৃথিবীর হাজার দশেক অভিনেত্রীকে এই প্রশ্নটা করা হয়ে গেছে, তিন হাজার খ্রিস্টাব্দেও করা হবে। পাঠকরা বা ভক্তরা নাকি এইসব খবর জানতে চায়। রোহিণীর মনে হল, মীনা যেন জানেই এইরকম প্রশ্ন তাকে করা হবে।
‘আমি লম্বা পুরুষমানুষ পছন্দ করি। ছিপছিপে গড়ন হবে। মাথায় প্রচুর কালো চুলের মধ্যে কিছু কিছু রুপোলি ঝিলিক দেবে। গায়ের রং তামাটে হবে। মুখে চোখা বুদ্ধির ছাপ থাকবে। আর হতে হবে সহৃদয়। আমার নিশ্চয় অনেক দোষ আছে, বোকামি আছে, অজ্ঞতা আছে, সেগুলো নিয়ে বিরক্ত হবে না, কারণগুলো দেখিয়ে শুধরে দেবে। মোট কথা আমাকে প্রভাবিত করবে তার ব্যক্তিত্ব, বিদ্যা, বুদ্ধি দিয়ে। মুগ্ধ করতে পারলে তো আরও ভালো।’
‘কীরকম পেশার লোক পছন্দ করেন? মালটি ন্যাশনাল কোম্পানির কোনো বড়োকর্তা? আইএএস? ব্যবসায়ী? পলিটিশিয়ান? বা এঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যারিস্টার? বা…’।
‘না না এসব নয়, এসব নয়। এমনকী অমিতাভ বচ্চচনও নয়, সুনীল গাওস্করও নয়। আমি বিরাট খ্যাতি, বিরাট বিত্ত নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না।’
রোহিণীর মনে এল, একটু আগেই মীনা যে কথা লোকগুলিকে বলল : ‘না না এর কমে…।’ টাকার ব্যাপারে মনে হয় মীনা একটু মীন টাইপেরই। বদনাম হতে পারে এমন ছবিতেও অভিনয়ে রাজি, যদি টাকা সেটা পুষিয়ে দেয়।
‘আমি সত্যিকারের একজন পুরুষ চাই, যার কাছে ক্রীতদাসী হয়েও সুখ পাব। আর এরকম লোক তো ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টদের মধ্যেই পাওয়া সম্ভব, তাই না।’
ঘোড়ার ডিম সম্ভব। রোহিণী মনে মনে হেসে উঠলেও, গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, পাওয়া নিশ্চয় সম্ভব।’ কী ধরনের আর্টিস্টদের কথা আপনি ভেবেছেন, আমির খাঁ, রবিশঙ্কর, সত্যজিৎ রায়? নাকি জীবনানন্দ,বিভূতিভূষণ… কিংবা রামকিঙ্কর কিংবা শম্ভু মিত্র কিংবা—।’
‘আপনি দেখছি ক্যাটলগ খুলে আউড়ে যাচ্ছেন। ওইসব তিমি মাছের পাশে আমি তো তেলাপিয়া!’
‘তা কেন, আপনিও বা কম কীসে?’
‘অনেক কম, কনেক কম। আমার লিমিটেশনস কিছু কিছু বুঝতে পারি। যেটা বেশিরভাগ লোকই পারে না। আমি একজনকে জানি, যে নিজের সীমাবদ্ধতা না বুঝে মনে মনে এক ছবি আঁকিয়েকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসা যখন প্রকাশ করল, তখন সেই লোকটি তাকে নিজের মেয়েকে বোঝাবার মতো বোঝাল, আদর করল, শাসন করল। বলল, ‘আমি তোমাকে অন্যভাবে পেতে চাই। সন্তানের মতো।’ মেয়েটির জীবন তিনি ঘুরিয়ে দিলেন।’
রোহিণী যেন মীনার চোখের কোণে জল দেখতে পেল। নিশ্চয় তার কথাই বলছে। এই প্রথম সে একজনকে পেল, যার চোখে জল শোভনেশের কথা বলতে গিয়ে।
‘এইজন্যই আমি সহৃদয় মানুষের কথা ভাবি। আচ্ছা, আমি এবার আপনাকে একটা প্রশ্ন করব, উত্তর দেবেন?’
‘দেব, যদি সাধ্যে কুলোয়।’
‘আপনি বিয়ে করেছেন?’
জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে এমন প্রশ্ন করল। রোহিণী জবাবটা সহজেই দিতে পারত, যদি প্রশ্নটা মীনার কাছ থেকে না আসত। সিঁদুর বা শাঁখা থাকলে প্রশ্নটা উঠতই না। এখন ইতস্তত করলে একটা সন্দেহ মীনার মনে জাল বুনবে।
‘হ্যাঁ আমি বিবাহিতা। সিঁদুর পরি না বলে অনেকে বুঝতে পারে না।’
‘পরেন না কেন?’
‘শাস্ত্রে কোথাও লেখা নেই যে, শাঁখা—সিঁদুর পরতেই হবে। ভারতে বহু হিন্দু সমাজে এসব পরার রীতিই নেই।’
‘আপনার স্বামী চান না এসব পরুন?’
‘হ্যাঁ পছন্দ করতেন। তবে সেটা সৌন্দর্যের কারণে, ধর্মটর্ম বা রীতি মানার জন্য নয়। বলতেন কিছু কিছু মুখ আশ্চর্যভাবে রূপসি হয়ে যায় একটা টিপ বা একটা লাল রেখার জন্য।’
‘আপনি ‘করতেন’, ‘বলতেন’, এভাবে বলছেন কেন? আপনি কি বিধবা?’
‘ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।’
‘ওহ। কী করেন উনি।’
এখন ঘানিটানি ঘোরান কী পাথর ভাঙেন। বা কলকাতায় ঘোরাঘুরি করছেন, হয়তো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন—যদি এইরকম উত্তর দেয় তাহলে অনেকগুলো প্রশ্ন আবার আসবে। আর যদি বলেই দেয়, যে লোকটিকে আপনি ভালোবেসেছিলেন, এখনও যাকে মনে মনে পুজো করেন, রোজ যার আঁকা ছবি না দেখে ঘুমোতে পারেন না,তার সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়েছিল, তিনিই আমার স্বামী! তাহলে মীনা চ্যাটার্জির মুখের অবস্থাটা এখন কেমন হবে?
রোহিণী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রসঙ্গটা বোধহয় অস্বস্তিতে ফেলেছে, এই ভেবে মীনা বলল, ‘যাক। আর কী প্রশ্ন করার আছে, করুন।’
যাক কেন? হঠাৎ রোহিণীর মাথার মধ্যে একটা রাগ জমে উঠতে শুরু করল। তোমার কাছে গোপন করতে হবে, এমন কী গুপ্তকথা এটা? আর তুমিই বা কী এমন গুরুত্বপূর্ণ লোক যে, স্বামীর নাম বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে? তোমার অনুগ্রহ নিয়ে তো আমার জীবন চলে না!
‘প্রশ্ন নয়, আপনার কথাটার উত্তর দেব কিনা তাই ভাবছি। কেননা, যা বলব সেটা আপনার কাছে পৃথিবীর নবম বা দশম আশ্চর্য বলে মনে হবে।’
‘কীরকম?’ মীনা আড়ষ্ট কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল।
