মীনা হাসল। হাসিটার দশ—বারো রকমের অর্থ করা যায়। ‘ওঁকে পাওয়া শক্ত। তা হলে আপনাকে বহরমপুর জেলে যেতে হবে। ওখানে আছেন খুনের আসামি হয়ে।’
‘খুন করেছেন!’ রোহিণী আঁতকে ওঠার চেষ্টা করে দেখাল। ‘কাকে?’
‘একজনকে। নাম বললে আপনি চিনবেন না। একটি মেয়ে, যে ওঁর ছবির মডেল হত। ভেরি স্যাড, ভেরি স্যাড।’ হঠাৎ সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে মীনা এবার যা বলল, তা শোনার জন্য রোহিণী একদমই তৈরি ছিল না।
‘ভুল লোককে যাবজ্জীবন দিয়েছে। ইনোসেন্ট লোককে শাস্তি দিয়েছে। উনি খুন করে কোনো দোষ করেননি। শোভনেশ সেনগুপ্তকে মেয়েটি ঠকিয়েছে। চিট করেছে। শুধু ওঁকেই নয়, আর একটি লোককেও ঠকিয়েছে, স্বামীকে।’
‘ওহ বিবাহিতা ছিলেন?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু সেটা আমি ছাড়া আর কেউই জানত না। শোভনেশ সেনগুপ্তও জানতেন না। আবার স্বামীও জানত না শোভনেশের প্রেমিকা তার স্ত্রী। এই ধরনের মেয়েদের আমি ঘৃণা করি। করা উচিত নয় কি?’ মীনা দেখল, রোহিণী নোট বইয়ে দ্রুত লিখছে। সন্তুষ্ট গলায় সে আবার বলল, ‘আমার কোনো নিকট আত্মীয়াও যদি এমন কাজ করে, তা হলেও আমি ক্ষমা করব না।’
‘আপনি দেখছি অত্যন্ত নিরপেক্ষ। চিটারদের সম্পর্কে কোনো মোহ নেই, দুর্বলতা নেই।’
‘কারেক্ট। আপনি আমাকে ঠিকই বুঝেছেন। মানুষের মন নিয়ে যারা ঠকানোর কারবার করে, তারাই আসল খুনি।’
রোহিণীর মনে হল, মীনার কথাগুলোর মধ্যে আন্তরিকতা রয়েছে, মনে—প্রাণে বিশ্বাস করে। নিজের দিদিকে যখন ঘৃণা করছে, বুঝতে হবে ঘটনাটা তার মনের গভীরে দাগা দিয়েছে।
রোহিণী এবার সাহসভরে, শালীনতার গণ্ডি পেরিয়ে বলল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে একটা প্রশ্ন করব?’
মীনা কৌতূহলভরে তাকিয়ে বলল, ‘করুন।’
‘আপনি বোধ হয় শোভনেশ সেনগুপ্তকে ভালোবেসেছিলেন? এখনও দুর্বলতা রয়েছে।’
যেন ভীষণ মজার কথা শুনল, এমনভাবে মীনা হেসে উঠল। ‘আমার তো তখন বারো বছর বয়স, যখন ওই বাড়িতে প্রথম ওঁকে দেখি।’
রোহিণী নিমেষে যোগটা করে ফেলল। কুড়ি আর বারো, তা হলে মীনার বয়স এখন বত্রিশ।
‘ভালোবাসাটাসার কিছুই তখন বুঝি না, তবে মানুষটাকে আমার ভালো লাগত। ছবি নিয়ে যেমন পরিশ্রম করতেন,তেমনি সিনসিয়ারও ছিলেন। বলতে পারেন, এই দুটো গুণ আমি ওঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। এটা অবশ্যই উল্লেখ করবেন।’
‘ওঁর আঁকা কোনো ছবি যদি দেখতে পেতাম। আপনার কাছে যা শুনছি, তাতে ভীষণ ইচ্ছে করছে ওনার কোনো কাজ দেখতে।’
মীনা ইতস্তত করল।
যে ছবিটা শোভনেশ আর গঙ্গাপ্রসাদ রোহিণীকে তার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে এসেছিল, সেটা বোম্বাইয়ে দিদির কাছে যাবার সময় সে গঙ্গাপ্রসাদকে দিয়ে দেয়। চমৎকার ছবিটা। চোখ পড়লে কিছুক্ষণ না তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফেরানো যেত না। এই মুহূর্তে রোহিণীর আফশোস হল। না দিলেই হত।
‘আসুন আমার সঙ্গে। অনেক খুঁজে একটা ছবি সংগ্রহ করেছি।’
মীনা উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে সেই দরজাটা খুলল, পরশু যেটা দিয়ে রোহিণী ঘরের দেওয়ালে বীণার ন্যুড ছবিটা দেখেছিল।
‘ভেতরে আসুন… আমার বেডরুম।’
ফিল্ম তারকার শয়নকক্ষে ঢোকার সুযোগ পেয়ে রোহিণী যতটা না রোমাঞ্চিত হল, তার থেকেও বেশি বিস্মিত হল, ছবিটা এখন আর দেওয়ালে নেই, রয়েছে একটা চেয়ারের উপর! চেয়ারটা রয়েছে ঘরের মাঝামাঝি। বিছানায় কাত হয়ে শুলে দৃষ্টির সমান্তরাল স্তরে ছবিটা দেখা যায়।
‘বরাবরই কি এইভাবে ছবিটা রাখা?’
‘হ্যাঁ। আমি রোজ ঘুমোবার আগে ছবিটাকে দেখি।’
মীনা কি মিথ্যা কথা বলল? পরশু সন্ধ্যায় সে ছবিটা দেওয়ালেই দেখেছিল। কিংবা রাত্রে নামায়, আবার কোনো এক সময় তুলে দেয় দেওয়ালে। রোহিণী একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হল, সুভাষ গায়েন তার আসল পরিচয়টা মীনাকে জানায়নি। সে শোভনেশের স্ত্রী, এই কথাটা জানলে মীনার ব্যবহার অন্যরকম হত। এত কথাও বলত না, ঘরে ডেকে নিয়ে ছবিটাও দেখাত না।
‘দেখতে দেখতে জানেন, আমি এই জগৎ থেকে অন্য জগতে চলে যাই।’
‘আমারও সেইরকম লাগছে। কী অসাধারণভাবে বডি কার্ভসগুলো এসেছে। সো সফট, টেন্ডার অ্যান্ড রিয়্যাল। বিদেশি ক্লাসিক্যাল মাস্টার্সদের যেকোনো ভালো কাজের সঙ্গে তুলনীয়! দেখে ইচ্ছে করছে এইরকম আর্টিস্টের মডেল হতে… অবশ্য ওইরকম বডি আমার নেই।’
‘কে বলল নেই। আমার দিদির পর এই আপনাকে দেখেই মনে হয়েছে, আপনার স্কিন, আপনার ফ্লেশ,ভলিউম, স্ট্রাকচার, প্রোপোরশন, শোভনকাকা ঝাঁপিয়ে পড়তেন।’
পড়তেন নয়, পড়েছিলেন। রোহিণীর চোখে পলকের জন্য ঝলসে উঠল শোভনেশের উন্মাদের মতো চাহনি, সাঁড়াশির মতো আঙুলগুলো, দুটো কাঁধ চেপে ঠান্ডা গলার কথা, ‘তা হলে বিয়ে করেছিলে কেন?’ পড়পড় করে ব্লাউজ ছেঁড়ার শব্দ! ধাক্কা দিয়ে তাকে ডিভানে ফেলে দেওয়া।
‘আপনার দিদির পর বললেন কেন?’ রোহিণী কৌতূহলের মধ্যে প্রভূত সারল্য মিশিয়ে বলল।
‘আমার দিদিরও—’ মীনা ছবি দিকে ঝুঁকে তাকাল। ‘চমৎকার বডি ছিল। হিংসে করতাম দিদিকে। লোকে তাকিয়ে থাকত রাস্তা দিয়ে হাঁটলে।’
‘তিনি এখন কোথায়?’
মীনা ঝুঁকে ছবি নিরীক্ষণের ভান করছে, রোহিণীর প্রশ্নটা যেন শুনতে পায়নি এমন একটা ভাব করে।
‘আপনার দিদি এখন কী করেন?’ রোহিণী নাছোড়বান্দা। মীনা কীভাবে মিথ্যা কথাটা বলে সেটাতেই সে কৌতূহলী।
