ফিসফিস আরও কিছু কথা হবার পর মীনা ফিরে এল। ঘরের একধারে দেওয়াল ঘেঁসে একটা টেবল। তার ড্রয়ার থেকে জেরক্স করা তিন পাতা কাগজ বার করে এনে সে রোহিণীকে দিল।
‘এত লোক জিজ্ঞাসা করে যে, জবাব দিতে দিতে মুখে ব্যথা হয়ে গেছে। তাই টাইপ করে জেরক্স করিয়ে রেখেছি। বোম্বাইয়ের জেট সেট আর স্টারডাস্টকে এরই কপি দিয়েছি। আমার সম্পর্কে যা যা জানার কৌতূহল হতে পারে, বোধ হয় তার সবেরই উত্তর এতে আছে। তবু পড়ে নিন, এর বাইরে যদি কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে তো প্রশ্ন করুন। … একসকিউজ মী, আমি একটু ভিতর থেকে আসছি।’
রোহিণীর মনে হল, ভিতর থেকে কেউ ইশারা করে ওকে ডেকে নিল। সুভাষ গায়েন কোথায়? ভিতরে রয়েছে কি? ওকেই তো তার দরকার। আসলে ওর সঙ্গে কথা বলার জন্যই তো তার আসা।
জোড়াবাগান থেকে উঠে এসে মীনারা যে শোভনেশদের পাশের পাড়াতেই একসময় ছিল, এটা সে সিধারথ সিনহার লেখাতেই পেয়েছে। বীণার সঙ্গে শোভনেশের পরিচয় কবিরাজের কাছে যাতায়াতের সময়ই যে হয়েছিল, এই খবরও লেখায় আছে। তখন বীণার বয়স কতই বা ছিল, সতেরো, আঠারো! এই বয়সের মেয়েরা চট করে মুগ্ধ হয় গাইয়ে, গল্প লিখিয়ে, ছবি আঁকিয়েদের মতো লোকেদের সংস্পর্শে এলে। কিন্তু মৃত্যুর সময় বীণা অবিবাহিতা ছিল না, অন্তত সিধারথ সিনহার লেখাটায় তাই লেখা আছে। নিছকই অনুমানের ভিত্তিতে বলা। কিন্তু কার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, সেটা বলতে পারেনি। কোর্টে বিচারের সময়ও প্রসঙ্গটা উঠেছিল। কিন্তু বীণার স্বামী যে কে ছিল, তার কোনো সাক্ষ্য—প্রমাণ দাখিল করা যায়নি। রোহিণীর অনুমান, সুভাষ গায়েনই সেই স্বামী।
লোকটা যদিও পরশু তাকে বলল, শোভনেশ যে বীণাকে নষ্ট করে পচিয়ে দিয়েছে, তা সে জানত না, জানলে শোভনেশকে খুন করে সে—ই নাকি জেলে যেত। কিন্তু এখন ‘ভস্মীভূত শিল্পীরা’ পড়ার পর অনেকের অনেক কথাই তার মিথ্যা মনে হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে বীণা ও শোভনেশের মধ্যে যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, সুভাষ গায়েন তা জানত। খুব ভালো করেই জানত।
এইসব ভাবতে ভাবতে রোহিণী জেরক্স করা কাগজগুলোয় চোখ বোলাচ্ছিল। একজায়গায় দেখল, মীনার প্রিয় খাদ্য : মোয়া, পরিজ, পাবদা মাছ, লস্যি। প্রিয় লেখক : রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, গোর্কি, শার্লক হোমস। (অবশ্য নামটা কেটে কে যেন লাল কালিতে কোনান ডয়েল লিখেছে)। সংস্কার: প্রথমে বাঁ পায়ে জুতো পরা। ভয় : ভূত এবং ইন্টারভিউ দেওয়া। বাতিক : ভোরের সূর্য দেখা। ব্যায়াম : বুল ওয়ার্কার নিয়ে। প্রিয় খেলোয়াড় ম্যাকেনরো ও ভিভ রিচার্ডস। প্রিয় খেলা : স্কোয়াশ। পড়তে পড়তে রোহিণীর ঠোঁট মুচড়ে উঠল। নিশ্চয় কেউ লিখে দিয়েছে। বুল ওয়ার্কার! স্কোয়াশ! গোর্কি! ম্যাকেনরো! আবার মোয়াও! হঠাৎ তার চোখে পড়ল—প্রিয় ইচ্ছা : কৈশোর জীবনে ফিরে যাওয়া। কী আশ্চর্য, এতক্ষণ এটাই চোখে পড়েনি। মীনাকে তো এটা নিয়েই প্রশ্ন করা যায়।
মীনা ফিরে এল মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই।
‘পড়লেন?’
‘সব নয়, খানিকটা। খুব উইটি উত্তরগুলো। এর মধ্য থেকেই আপনার চরিত্র অনেকটা ধরা যায়।’
‘কী ধরা যায়?’ মীনা উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইল।
‘আপনার মধ্যে এমন একটা সূক্ষ্ম আর্টিস্টিক বোধ রয়েছে, যেটা ফাইন আর্টের শিল্পীদের মধ্যে পাওয়া যায়। মনে হচ্ছে আপনি আর্টের ভক্ত। আর্ট মানে স্কালপচারস, পেইন্টিংস, এইসব আর কী।’
‘আপনি ঠিকই ধরেছেন।’ তাকিয়াটা কোলে নিয়ে মীনা কুঁজো হয়ে বলল, ‘কবিরাজ মশাইয়ের বাড়ির পিছনের অংশে ওনার ভাইপো থাকতেন, তিনি ছবি আঁকতেন। আমি আর দিদি গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। দেখতে দেখতে আমার খুব ইচ্ছে হত আমিও শিল্পী হব, ছবি আঁকব, স্রষ্টা হব।’
রোহিণীর মনে হল, এইবার মীনার আবেগ আসবে। সৃষ্টির কাজকর্মে নেমে পড়লে আর ওকে থামানো যাবে না। এখনি একটা বাঁধ তুলে আবেগের স্রোত থামাতে হবে।
‘আমার মনের মধ্যে কী যে তখন হত, শিল্পীর তুলির ছাপ ক্যানভাসে তো নয়, যেন আমার মনের ক্যানভাসেই রং ধরাত।’
‘মিস চ্যাটার্জি, সেই শিল্পীর নাম কী?’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত।’
‘কোথায় তিনি আঁকতেন?’
‘ওঁদের দোতলায়। লম্বা একটা বড়ো ঘরে।’
‘বাড়িতে আর কেউ ছিল?’
‘বাবা ছিল। যতদূর মনে হয়, আর কাউকে দেখিনি। প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা তো।’
‘আর্টিস্টের স্ত্রী বা অন্য কেউ? বন্ধুবান্ধব?’
‘স্ত্রী ছিল। শুনেছি, অসুখে না কীসে যেন মারা গেছে। আর বেঁটে মোটা একটা লোকেকে দু—একবার দেখেছি, বন্ধুই হবে।’
‘উনি আপনাদের সঙ্গে কথাটথা বলতেন?’
‘হ্যাঁ। ছবি বোঝাতেন। আঁকা কেমন করে হয়, মনের মধ্যে কীরকম অবস্থা থাকে আঁকার সময়—এইসব শুনতে শুনতেই বোধ হয় আমি আর্টিস্টিক সেন্সটা পেয়েছি।’
‘উনি কখনো আপনাদের ছবি আঁকেননি?’
‘নিশ্চয়।’ মীনার গলায় উঁকি দিল ঈষৎ গর্ব। ‘আমার মুখ এঁকেছিলেন।’
‘আর দিদির?’
মীনা উত্তর দিতে একটু সময় নিল। রোহিণীর মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অন্যমনস্কের মতো বলল, ‘হ্যাঁ, দিদিরও।’
‘আছে আপনার কাছে কোনো ছবি?’
‘না নেই।’ মীনার উত্তরটা এত দ্রুত এল যে, রোহিণীর পরের প্রশ্ন পিছু হটে গেল।
‘আচ্ছা ওনার সঙ্গে কোথায় দেখা করা যাবে, মানে কোথায় এখন আছেন? তা হলে জেনে নিতাম আপনার সম্পর্কে ওনার ইম্প্রেশনটা।’
