দরজা খুলল সেই কিশোরী, যে সেদিন পাখা খুলে দিয়ে চা বা কোল্ড ড্রিঙ্কস দেবে কিনা জিজ্ঞাসা করেছিল।
‘মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।’
‘আসুন।’
ভিতরে পা দিয়েই রোহিণী দেখল, তিনটি পুরুষ একদিকের সোফায় বসে আর তাদের মুখোমুখি ঝালর দেওয়া বেড কভারে ঢাকা মোটা গদির ছোটো চৌকিতে মীনা। কোলে তাকিয়া নিয়ে ঈষৎ ঝুঁকে।
‘আসুন, আসুন।’ তাকিয়াটা পাশে রেখে মীনা সোজা হয়ে বসল। ম্যাগাজিনের লোকের জন্য তাঁর এইটুকু খাতিরই বরাদ্দ করা আছে। তবে রোহিণী যতটুকু মাথা নামাল নমস্কারের জন্য তার দ্বিগুণ মাথা নামিয়ে মীনা নমস্কারটা গ্রহণ করল। বিনয়ের প্রতিযোগিতায় সে টলিউড মেয়েদের মধ্যে গোল্ড মেডালিস্ট।
মীনার এক পলক চাহনি থেকেই রোহিণী বুঝে গেল, এইবার তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জরিপ করবে তার থেকে অফিসিয়ালি প্রায় আট বছরের ছোটো এই মেয়েটি। মীনার চোখে সে কৌতূহল এবং একটু অস্বস্তি দেখতে পেল।
‘আপনি তো দারুণ পাংচ্যুয়াল, দশটা মানে ঠিক দশটাই!’
‘কলকাতার ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে হলে সময়ের হিসেবটা খুব ভালো করে কষতে হয়। এখানে আসতে যে সময় লাগবে, সেটা হিসেব করে তার সঙ্গে আধ ঘণ্টা জুড়ে সেইমতো বাড়ি থেকে বেরিয়েছি।’
‘কারে এলেন?’
‘ট্যাক্সিতে।’ রোহিণীকে মিথ্যা কথাটা বলতেই হল। মিনিবাসে চড়ে এসেছি বললে তার গুরুত্বের পয়েন্ট কাটা যাবে।
.
মহারানির দপ্তর থেকে রোহিণী জেনে নিয়েছে, মীনাদের সংসারে এমন একটা সময় গেছে, যখন দু—বেলা হাঁড়ি চড়াই দায় হয়ে পড়েছিল। এখন সে সচ্ছল হয়েছে, টাকাওয়ালা লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করছে। অতীত কোনোভাবেই তার এই জীবনে উঁকি দিক, এটা সে এখন চাইবে না। প্লেন, কার, বড়োজোর ট্যাক্সি পর্যন্ত সে নামতে পারে, কিন্তু ট্রাম বা বাস তার এই সাজিয়ে তোলা মানসিকতাতে যাতে না ঢুকে পড়ে এই ভয়ে সে তটস্থ থাকে। রোহিণী এই ধরনের রোগগ্রস্ত কিছু কিছু মন দেখেছে, যারা দারিদ্র্য থেকে মই বেয়ে উঠে এসেই মইটা ফেলে দেবার জন্য লাথি ছোড়ে। মীনা সম্ভবত কিছু লাথি ছুড়বে।
‘চা, কফি?’
‘না, এই সময় কিছুই খাই না বিশুদ্ধ জল ছাড়া।’
‘ওহহ মাইগড, কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় বিশুদ্ধ জল!’
রোহিণীর কানে খট করে লাগল মীনার উচ্চচারণের ভঙ্গিটা। ইম্প্রেস করাবার জন্য তার মতো মীনারও একটা দ্বিতীয় গলার স্বর আছে, কিন্তু তার মনে হল, কীসের যেন একটা ঘাটতি ওর বলার ভঙ্গিতে রয়েছে। সেটা বোধ হয় জন্মগত আভিজাত্যের, ব্যক্তিত্বের, মুক্ত চেতনার অভাবের জন্যই। রোহিণী তার এই ধারণাগুলো মনে মনে নোট করে নিল। লেখার জন্য দরকার হবে।
‘আপনি কি ফিল্টারড জল খান? আপনার হেলথ দেখে মনে হচ্ছে কখনো পেটের ট্রাবলে পড়েননি।’ রোহিণী সুতো ছাড়ল মীনাকে খেলাবার জন্য। প্রশংসার টোপ গিলে এইসব লোকেরা নিজেদের মন খুলে দেখিয়ে দেয়।
‘নেভার, নেভার, একদিনও নয়।’ মীনা খুকিদের মতো মাথা নাড়তে লাগল, ‘জানেন, আমি রোজ রাতে শোবার আগে এক গ্লাস চিরতার জল খাই। ইন্ডিয়ান হার্বাল মেডিসিন সম্পর্কে আমার অসীম শ্রদ্ধা, অগাধ আস্থা। লেখার মধ্যে এটা কিন্তু অবশ্যই রাখবেন… অসীম শ্রদ্ধা। আমাদের বাড়িতে কখনো অ্যালোপ্যাথি ওষুধ ঢোকেনি।’
‘কবিরাজি করাতেন না হোমিয়োপ্যাথি?’
‘কবিরাজি। আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান মানে কবিরাজ ছিলেন উমেশচন্দ্র সেনগুপ্ত।’
‘কী নাম বললেন?’ রোহিণীর ব্যগ্রতা প্রকাশ পেল হঠাৎ তার সিধে হয়ে বসায়।
‘উমেশচন্দ্র সেনগুপ্ত।’
‘কোথায় বাড়ি এনার?…এভাবে কৌতূহল দেখাচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না।’
‘না না, মনে করব কেন। আপনি ডিটেইলে সব জেনে তো নেবেনই। ওনার বাড়িতেই কবিরাজখানা ছিল বউবাজারে। মহামহোপাধ্যায় জ্যোতিষচন্দ্র সেনের সাক্ষাৎ ছাত্র, ওনার নাড়িজ্ঞান ছিল অদ্ভুত!’
রোহিণী আশ্চর্য হচ্ছে এই কারণে, সিধারথ সিনহার লেখাটায় সে কাল রাতেই জেনেছে, শোভনেশের জ্যাঠা নিঃসন্তান উমেশচন্দ্র কবিরাজ ছিলেন। পার্টিশান হওয়া বাড়ির অংশেই ছিল তাঁর কবিরাজখানা। পার্টিশনের পর উমেশচন্দ্রের সদর হয় বাড়ির পাশের দিকে তারক দত্ত লেনের উপর। সেদিক থেকেই ওরা রাস্তায় বেরোত। রোহিণী জানতই না যে উনি কবিরাজ ছিলেন। শোভনেশও তাকে বলেনি।
‘আপনি দেখেছেন ওনাকে?’
.
‘নিশ্চয়, উনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমি, দিদি, বাবা বহুবার গেছি ওঁর কবিরাজখানায়। গেলেই চামচে করে ভাস্কর লবণ হাতে দিতেন। ওই ভাস্কর লবণের লোভে আমি আর দিদি প্রায়ই যেতাম। উনি সাত—আট বছর আগে মারা গেছেন।’
‘এখন কে কবিরাজি করেন, ওঁর ছেলে?’
‘উনি মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে কবিরাজখানাটা উঠে গেছে।’
রোহিণী তার নোটবই বার করল। মীনা তাই দেখে চুপচাপ বসে থাকা ঘরের অন্য তিনজন লোকেদের উদ্দেশে বলল, ‘তা হলে আপনাদের ডিসিশন পরশুর মধ্যেই জানিয়ে দেবেন।’
তিনজন উঠে দাঁড়াল।
‘কালই জানিয়ে দিতে পারব বোধ হয়।’ কথাটা বলে মাঝবয়সি হাওয়াই শার্ট পরা লোকটি চোখের ইশারায় মীনাকে দরজার কাছে যেতে বলল। মীনা উঠে গেল কাঠের পার্টিশনের ওধারে।
রোহিণী দু—একটা সংলাপ শুনতে পেল।
‘না না ওর কমে…’
‘লাইনে নতুন এসেছে, একটু বিবেচনা করো।’
‘করেছি। স্ক্রিপ্ট অতি বাজে, এ ছবিতে, আমার বদনামই হবে বাচ্চচুদা…’
