‘কথা না বলে এবার খেয়ে নাও। মাছটার টেস্ট কেমন?’
‘মা—র কাছে একটা ছড়া শুনেছি—থোড় ডুমুর ইচলা মাছে খাইলে মুখের অরুচি ঘোচে। এই ইচলায় অরুচি ঘুচল, এতে তোমার ঠোঁটের স্বাদ রয়েছে।’
একঝলক রক্ত রোহিণীর মুখে সুখের আলতা ছড়িয়েই অন্তর্হিত হল। চোখ নামিয়ে নিল। তার জীবনে আজ একটা এমনই দিন, যার সঙ্গে আর কোনো দিনেরই তুলনা চলে না। পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে সে ডুবে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ সে চুপ করে রইল।
‘তোমার মা—র কাছে কবে আমায় নিয়ে যাবে?’
রাজেনের প্লেটের ভাত শেষ হয়ে গেছে দেখে, রোহিণী ডেকচি থেকে টিফিন বক্সটা তুলে রাজেনের মুখের দিকে তাকাল। মুখটা গম্ভীর।
‘গিয়ে কোনো লাভ নেই। আমাদের ফ্যামিলি খুব কনজারভেটিভ, একথা তোমায় আগেও বলেছি। আমার দাদার বিয়ে হয়েছে ঘটকালি করে। খুঁজে খুঁজে, মধ্যবিত্ত ঘরের স্কুল ফাইনাল পাশ মেয়ে কিন্তু অপূর্ব সুন্দরী। ঘটকের আনা সম্বন্ধে বোনেদের বিয়ে হয়েছে। বড়োজামাই শ্বশুরের টাকায় এমআরসিপি করে আসে। মেজো এখন দাদার জুনিয়ার।’
‘তা হলে?’ রোহিণী অবুঝ দৃষ্টি মেলে রইল।
‘তা হলে আর কি! শরীর—মনে আমি সাবালক, অন্যের ইচ্ছা—অনিচ্ছায় আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রিত হবে, এটা মানতে রাজি নই।’
‘তুমি কি আমার সব কথা বলেছ?’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে।’
‘বয়স?’
‘হ্যাঁ, এটাতেই—যাকগে এসব কথা। জয়পুর থেকে ফিরেই ডিভোর্সের কাজটা সেরে ফেলতে হবে। তারপর দেখা যাবে কতদূর কী হয়। মোটকথা শোভনেশ সেনগুপ্ত কোনো দিন এসে ‘আমার বউ’ বলে যাতে হাত না বাড়ায়, আগে সেই ব্যবস্থাটা তো করে ফেলি। তারপর তোমাকে একদিন নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আনব।’
দু—জনে নীরবে খাওয়া শেষ করল। রোহিণীর মনে কাঁটার মতো খচখচ করছে একটা কথা, কিছু গোপন করা উচিত নয়, একদিন তো ওরা জানতে পারবেই।
রাজেন অনুমান করেছে, রোহিণীর চিন্তাধারা এখন কোন খাতে চলেছে। হালকা সুরে সে বলল, ‘রণে আর প্রেমে অন্যায় বলে কিছু নেই। বিষয়ের কথাটা চেপে গেলেই হবে। পরে যদি জানতে পারে তো পারবে।’
লোকটা জীবন থেকে সরে গিয়েও সরছে না। রোহিণী কেমন যেন অসহায় বোধ করল। শোভনেশের ছায়া কি তার জীবনপথে সবসময়ই এইভাবে পড়বে?
‘কাল ভোরে দিল্লির ফ্লাইট।’
‘আর দেরি কোরো না, তাড়াতাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ো।’
‘আজ রাতে ঘুম আসবে না, জেগেই থাকব।’
‘জয়পুর থেকে একটা ম্যাক্সি বা কাচ—বসানো ঘাঘরা, যদি মনে থাকে, তাহলে এনো, উপরের মেয়েটিকে দেব।’
‘কোন মেয়েটি, যে তখন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখছিল?’
‘সারাবাড়ি এখন চাউর হবে।’
‘ম্যাক্সিটা কি ঘুষ?’
‘তুমি যেখানে সেখানে যা—তা কাণ্ড বাধিয়ে এমন লজ্জায় ফেলে দাও!’
‘কাণ্ড! আমার তো তখন লঙ্কাকাণ্ড বাধাতে ইচ্ছে করছিল।’
‘ওটা জয়পুরের মাঠের জন্য এখন তোলা থাক। আর সেঞ্চুরি করব—টরব কখনো এসব বোলো না। যদি না পারো?’
‘পারব। বাজি?’
‘বাজি—টাজি নয়, তবে এটা হবে আমার জন্য লটারি। যদি সেঞ্চুরি করো তাহলে নিশ্চিত হয়ে যাব হাসপাতাল থেকে শোভনেশ পালায়নি, ওটা অন্য কেউ।’
দশ মিনিট পর, রাজেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। পায়ের শব্দ ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল। রোহিণী দরজার খোলা পাল্লায় হেলান দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে। সাত পাঁচ ভাবনা তাঁর মাথায় বুদবুদের মতো ফাটছে আর তৈরি হচ্ছে। তবে সব কিছুর গভীরে সুখবোধের একটা বেদি তৈরি হয়েছে। যার উপরে এইবার সে ভবিষ্যৎ—জীবনকে স্থাপন করবে।
‘আন্টি আপনার ফোন।’
চমকে উঠল সে। সিঁড়িতে নন্দা। এই সময় কে! কেন? রোহিণী সিঁড়ি দিয়ে উঠল। টিভি—তে হিন্দি সিরিয়াল চলছে। সপরিবার তুষার দত্ত দেখায় মগ্ন। রোহিণীকে দেখে সবাই মুখ ফেরাল।
‘হ্যালো।’
‘আমি গঙ্গাদা। বহরমপুর থেকে নির্মল এক্ষুনি ফোন করেছিল।’
‘কেন?’ রোহিণী যেন লটারির ফলের ঘোষণা শোনার জন্য তৈরি।
‘বলল, যে দু—জন পালিয়েছে তাদের একজন শোভুই। জেল—সুপারের কাছ থেকে জেনে এসেছে।’
রোহিণীর চোয়ালটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল, রিসিভার ধরা মুঠিটাও। চোখের সামনে ভেসে উঠল তার নিজেরই জীবনের একটা মুহূর্ত—সিঁড়ির ছ—টা ধাপ উপর থেকে জোড় পায়ে সে লাফ দিয়ে পড়ছে ছেলেবেলার মতো। এই মুহূর্তটা সত্যি, তার কাছে ভীষণ গভীরভাবে সত্যি। এটাকে সে নষ্ট হতে দেবে না।
‘গঙ্গাদা, কাল শোভনেশ এসেছিল বলেছিলাম। কিন্তু একটু আগে জানলাম, সে শোভনেশ নয়, অন্য লোক। ও যদি আমার কাছে আসে তো আসুক, আমার ভয় পাবার কিছু নেই। এটা ঠিকই যে, আমি ভয়ের মধ্যে পড়েছিলাম কিন্তু এখন বেরিয়ে এসেছি। আপনি আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’
ওধার থেকে আবার গঙ্গাপ্রসাদ কী যেন বলে গেলেন কিন্তু কিছুই তার কানে ঢুকল না। সে আর কিছু শুনতে চায় না। রিসিভার নামিয়ে রোহিণী ঘরের সবার দিকে একবার হাসিমুখে তাকিয়ে বেরিয়ে এল। সুজাতা গুপ্তর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে একটু ইতস্তত করল। আজ থাক, পরেই কথা বলব, আগে সিদ্ধার্থ সিংহর লেখাটা পড়ে নিই, এই স্থির করে রোহিণী নিজের ঘরে ফিরে এল।
রাতে বিছানায় কাত হয়ে সে ‘ভস্মীভূত শিল্পীরা’ পড়ছিল। পড়তে পড়তে একসময় সে সোজা হয়ে বসে অস্ফুটে বলে উঠল, ‘আশ্চর্য, আমি এসব লক্ষই করিনি!’
ছয়
রোহিণী ঠিক দশটায় মীনা চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটের কলিং বেলের বোতামে আঙুল রাখল।
