‘ভাত ফুটতে দু—মিনিট লাগবে।’ রোহিণী হাত বাড়িয়ে সোয়েটারটা নিল।
‘টস করব, কয়েন দাও।’
‘কয়েন? বেশ।’ ঝুলির মধ্যে রেজগির ছোট্ট ব্যাগটা। রোহিণী প্রথমে কার্ডিগানটা বার করল, তারপর ম্যাগাজিনটা, তারপর ব্যাগটা। একটা আধুলি সে রাজেনকে দিল।
‘বলো।’ আধুলিটা রাজেনের ডান তালুতে পড়তে বাঁ তালু দিয়ে চেপে ধরে সে বলল।
‘টেইল।’ রোহিণী চোখ বুজে আছে। হঠাৎই তার মনে হয়েছে,এই টস দিয়েই তার ভাগ্যেরও পরীক্ষা হবে। জিতলে তার জীবন সুখের হবে।
‘ইওর চয়েস, ব্যাটিং না ফিল্ডিং?’
‘মানে?’
‘জিতেছ। রান্নাঘরে, না কলঘরে, কোথায় যেতে চাও?’
আর একবার একটা আনন্দের প্লাবন রোহিণীকে ভাসাল। আবার সে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে। সুখী হবে সে! অতীতটা অতীতেই থাক। এখন থেকে সে ভবিষ্যতের দিকে তাকাবে। রাজেন ছাড়া ভবিষ্যৎকে আর ভাবা যায় না।
‘বাঙালি মেয়ে আগে কোনটা চয়েস করবে, সেটাও কি বলে দিতে হবে?’
‘তাহলে ফিল্ড করো। ভাতটা চাপাও, সর্ষে বাটা মাখাও। বেরিয়ে এসে আমি ফিল্ড করব। কিন্তু ফ্যানট্যান গালতে পারব না, আগেই বলে দিচ্ছি। শুধু ফার্স্ট স্লিপে দাঁড়াব।’
‘তার আগেই আমার হয়ে যাবে।’
কলঘরে জলের ঝারির নীচে রাজেন চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে। বন্ধ দরজা ভেদ করে গানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। হঠাৎ সে চেঁচিয়ে বলল, ‘রুনি, ধারেকাছে ধোপাবাড়ি আছে কি?’
‘বোধ হয় নেই।’ চেঁচিয়েই জবাব দিয়ে রোহিণী কলঘরের দরজার কাছে এসে বলল, ‘আমার গলা কি এতই খারাপ?’
‘তোমার নয়, তোমার নয়।’ বলেই রাজেন বেসুরে গানটা ধরল, ‘ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে।’
‘আস্তে রাজেন,আস্তে,ওপরে তুষারবাবুর মাসল খুব বদমেজাজি, উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে।’
শুনে রাজেন গলাটা আরও চড়াল। খুব তাড়াতাড়িই তার স্নান হয়ে গেল। বেরিয়ে এসে বলল, ‘দারুণ ফ্রেশ লাগছে।’
‘এবার একটু একা অপেক্ষা করো, আমি সেরে নিই, চিরুনি ঘরে রয়েছে, চুল আঁচড়ে নাও। আর রান্নাঘরে ঢুকে কোনো কিছুতে হাত দেবে না’। রোহিণী স্নানে যাবার আগে সদর দরজাটা বন্ধ আছে কিনা দেখে নিল।
কলঘর থেকে বেরিয়ে রোহিণী দেখল, একমনে রাজেন টেবিলে রাখা ম্যাগাজিনটা পড়ছে।
‘ওতেই লেখাটা রয়েছে। পড়ে ফ্যালো। আমার এখনও শেষ দিকটা পড়া হয়নি।’
‘ওটাই পড়ছি।’
রান্না শেষ হবার আগেই রাজেনের পড়া শেষ হয়ে গেল।
‘কী বুঝলে?’ টেবিলে মাছভাজার প্লেট আর তেলের বাটি রেখে রোহিণী জানতে উৎসুক হল।
‘এই সিধারথ সিনহাকে যেন চিনি চিনি মনে হচ্ছে। যাদবপুরে আমাদের সময় কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়ত এক সিদ্ধার্থ সিংগী।
‘কীসের জন্য মনে হচ্ছে যে, এই লেখকই?’
‘অনেকটা এই ধরনের লেখা বছর দুয়েক আগে স্পোর্টস উইকলিতে লিখেছিল পৃথিবীর নামি কয়েকজন প্লেয়ারদের নিয়ে। লেখার আগে আমার কাছে এসে বিদেশি ক—জন ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বই নিয়ে গেছিল। লেখাটা পড়েছিলাম, ইংরেজিটা ভালোই লেখে। অনেকটা এই ধাঁচেরই লেখা, বিষয়টা ছিল কতরকমভাবে বড়োবড়ো খেলোয়াড়দের পতন ঘটেছে। মনে হয় সিরিজ করছে,পরে বই করে বার করবে। তবে আগের লেখাটায় সিদ্ধার্থই ছিল, সিধারথ নয়।’
‘এর সঙ্গে আমি দেখা করব। ঠিকানা জান?’
‘নর্থে গ্রে স্ট্রিটে মানে অরবিন্দ সরণিতে কোথায় যেন বাড়ি, পড়াত আশুতোষে। খোঁজ নিয়ে তোমায় বলতে পারি।’
‘দেরি হয়ে যাবে। কাল সকালে যাব মীনা চ্যাটার্জির কাছে, ওখান থেকেই চলে যাব আশুতোষে।’
‘লেখাটার শেষ দিকটা খুব ইন্টারেস্টিং। তুমি বোধ হয় এখনও পড়োনি? … সিধারথ সিনহা বহরমপুরের জেলে দেখা করেছিল শোভনেশ সেনগুপ্তের সঙ্গে।’
‘সে কি!’ রোহিণী হাতায় করে ডেকচি থেকে প্লেটে গরম ভাত রাখছিল। থামিয়ে রেখে রাজেনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘জিগ্যেস করেছিল, মেয়েদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? শোভনেশ সেনগুপ্ত জবাব দেয়, ‘আমার কাছে মেয়েরা শুধু দু—রকমের, হয় মা ভগবতী, নয়তো পাপোশ। ভগবতীদের পা মোছার পাপোশে পরিণত করাতেই তো আনন্দ।’ অদ্ভুত কথা!’
‘আমাকেও এ কথাটা বার দুই বলেছিল। পরে জানতে পারি, কথাটা পিকাসোর। ওর খুব শখ পিকাসো হবার বা বলতে পারো, ওর বিশ্বাস পিকাসোর মতোই প্রতিভাবান। তাই নকলও করে। দেখছি, এত কিছুর পরও শোভনেশ আগের মতোই রয়েছে। পাগলামি সারেনি।’
‘আর একটা প্রশ্ন ছিল, মানুষের জীবনের মূল্য আপনার কাছে কতটুকু? শোভনেশ সেনগুপ্ত এর জবাবে যা বলে, তাতে কিন্তু লোকটি সম্পর্কে অন্যরকম ধারণা হয়। ভগবতীকে পাপোশ কোনো ভদ্রলোকে করে না, কিন্তু মানুষের জীবন সম্পর্কেও দরদ, ভালোবাসা রয়েছে। কী বলেছে জানো?… আরে ভাত দাও, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে।’
রোহিণীর হাতা আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। আর একটা প্লেটে নিজের জন্য ভাত নিয়ে সে রাজেনের মুখোমুখি বসল। একটা টিফিন বক্সে সর্ষে মাখানো মাছ গরম ভাতের ডেকচির মধ্যে বসানো। সেটা লক্ষ করে রাজেন বলল, ‘আমাদের বাড়িতে মাছের উপর—নীচে কলাপাতা রেখে তার ওপরে গরম ভাত ঢেলে দেওয়া হয়।’
‘বেশি ভাত হলে ওভাবে করা চলে, এখানে দু’জনের জন্য ওইটুকু ভাতের … তারপর কী বলল শোভনেশ?’
‘বিদেশের একটা ঘটনার কথা বলেছে। বছর আঠারো আগে এক বিখ্যাত আমেরিকান সিগারেট কোম্পানির রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ডক্টর মোল্ড এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে তৈরি করা সিগারেট স্মোকিংয়ে কোনো ক্ষতি হবে না অর্থাৎ ক্যানসার হবে না। এমন একটা আবিষ্কার পৃথিবীতে কেউ করতে পারেনি। কিন্তু সেই কোম্পানি এই সিগারেট তৈরি করে বাজারে ছাড়েনি। কারণ, তাদের উকিল জানায়, ক্যানসার হবে না বললে কোম্পানির তরফে এটাই মেনে নেওয়া হবে যে, তাদের আগের প্রোডাক্ট অনিরাপদ ছিল। সুতরাং ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করা যাবে। আর তাহলে ক্ষতিপূরণের দাবিতে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলাও করা যাবে। ক্ষতিপূরণের টাকা দেবার ভয়ে কোম্পানি সেই আবিষ্কারটা চেপে গিয়ে আগের মতোই সিগারেট তৈরি করে বিক্রি করে যেতে লাগল। এই পিশাচের মতো কাজের ফলে গত আঠারো বছর কত লোক ফুসফুসের ক্যানসারে মারা গেছে জানি না, কিন্তু টাকার জন্য সমাজকে দুর্দশায় ফেলে, মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে একটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার চেপে যাওয়া স্রেফ কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার। ভাবলে মাথা ঠিক রাখা যায় না। এর তুলনায় একজনকে খুন করাটা গ্রাহ্যের মধ্যেই আনা চলে না। অথচ খবরের কাগজে সেটা নিয়েই ফলাও করা হয়। বেশি লোকের জীবন, তাদের বাঁচার অধিকারই শোভনেশ সেনগুপ্তর কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। লোকটার মধ্যে কনট্রাডিকসন রয়েছে—জটিল মন।’
