রাজেন একটা চোখ খুলেই বন্ধ করল।
‘লাফটা ভালোই দিয়েছ।’ ঘুমের ঘোরে বলার মতো জড়িয়ে জড়িয়ে সে বলল, ‘কিন্তু এই বেরেদ্ধ বয়সে হাঁটুর জোর দেখানোটা কি উচিত হচ্ছে? ভেঙে—টেঙে তো যেতে পারে। তখন কে ঘরে বয়ে নিয়ে যাবে?’
‘তুমি।’
‘ওই বিশাল ওজন?’
‘মাত্র আটান্ন কেজি। কোনো যুবকের কাছে যদি এই সামান্য ওজনই বেশি হয়…দু—হাতে বউকে তোলার ক্ষমতা যদি না থাকে, তাহলে…।’
‘বউয়ের উচিত ওজনটাই কমিয়ে ফেলা।’ চোখ বন্ধ রেখেই রাজেন বলল।
‘তাহলে বিয়ে করার আগে তার বারবেল ভাঁজা উচিত।’
‘আমার তাহলে বিয়ে করা আর হল না। আমি বারবেল ভাঁজতে পারব না।’
‘তাহলে আমারও আর বিয়ে হল না।’
‘হবে। কথা দিচ্ছি আমি ভাঁজব।’
‘তাহলে প্রোপোজ করো।’
‘অনেকবার তো করেছি।’ রাজেন এখনও চোখ খোলেনি।
‘ভদ্রলোকের মতো করো, ইংলিশ নাইটরা যেভাবে—’ উঠে দাঁড়াল রোহিণী।
তার কথা শেষ হবার আগেই রাজেন তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপর দুটি হাঁটু মুড়ে বসে, দু—হাত পাশে ছড়িয়ে, মাথাটা হেঁট করে নামিয়ে বলল, ‘মাই লেডি, উড য়্যু ম্যারি মী? প্রিয়ে তুমি কি আমায় স্বামিত্বে বরণ করবে?… রুনি এবার শকুন্তলার মতো ব্লাশ করো, ব্লাশ করো, মুখটা একটু আনত করো, আর চোখটা সামান্য পিটপিট, শ্বাস বন্ধ, নাকটা একটু স্ফীত—করছ?’
‘করছি। একটু কষ্ট হচ্ছে। তুমি এবার মাথা তোল।’
‘অ্যাকসেপ্ট করলে?’
জবাব না দিয়ে, ঝুঁকে রাজেনের চুলে রোহিণী মুখটা চেপে ধরল। আর রাজেনের মুখ চেপে বসল রোহিণীর বুকের মাঝে।
‘ইয়া হুউউ’। রাজেনের চিৎকারটা সিঁড়ি দিয়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে একতলায় নেমে গেল। চারতলাতেও পৌঁছল। তড়বড় করে সে সিঁড়ি দিয়ে দশটা ধাপ উঠে ঠিক রোহিণীর মতোই লাফ দিয়ে পড়ল পায়ের কাছে। দু—হাতে ঊরু দুটো জড়িয়ে ধরে সে রোহিণীকে তুলে ধরল।
‘এই হচ্ছে কি? হাত ব্যথা কোর না, দু—দিন পরই তো খেলা! ব্যাট তুলতে না পেরে বোল্ড হয়ে শেষে আবার ঘাড়ে দোষ চাপাবে।’
রোহিণীকে পাক দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে রাজেন বলল, ‘আই উইল গেট আ সেঞ্চুরি ফর য়্যু, আই উইল স্কোর এ সেঞ্চুরি ফর য়্যু… আই অ্যাম আ ডন ব্র্যাডম্যান…।’
আর রোহিণী তখন উপরের ল্যান্ডিংয়ে নন্দার ছানাবড়া হওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, হায় আন্টি, আর তুমি কোন নৈতিক অধিকারে ওই কিশোরীকে জ্ঞান দেবে? হতচ্ছাড়া প্রেমই তোমাকে ডোবাল।
‘রাজেন, একজন দেখছে, নামাও।’ রোহিণী ফিসফিস করে বলল রাজেনের কানের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে।
‘কই?’ রাজেন ঘুরল। নন্দা ছুটে উপরে উঠে গেল।
‘তাই তো! এটা যদি এখন শোভনেশ দেখে ফেলত?’ রাজেন মজা করেই বলল রোহিণীকে নামিয়ে দিয়ে।
‘আমার হাত জোড়া, দরজা খোল।’
রাজেন দরজা খুলল। দু—জনে ভিতরে ঢুকল। খাবার টেবিলে বসল।
‘প্লিজ, ওই নামটা আর আমার কাছে কখনো উচ্চচারণ কোরো না।’ স্বাভাবিক অনুত্তেজিত রোহিণীর কণ্ঠ। ‘ওপারের মাসিমা দুটো মালাই দিয়েছেন, দুটোই তোমার।’
অপ্রতিভ রাজেন কুলপির ঢাকনা খুলে দেখল। গন্ধ শুঁকল। দুই তালুর মধ্যে কুলপি ঘসতে ঘসতে বলল, ‘দুটো প্লেট দাও, বার করে দিচ্ছি।’
এই ফ্ল্যাটে রাজেনের প্রথম আসা। কৌতূহলী চোখে সব কিছু সে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর চামচ দিয়ে মালাই খেতে খেতে সে বলল, ‘নামটা আমি না হয় উচ্চচারণ করলাম না, কিন্তু অন্যেরা তো করবে। এখনও তো সে তোমার স্বামীই। এখনও সে বেঁচে, এখনও তাকে নিয়ে অনেক কিছু ঘটতে পারে। হয়তো ওই দুই ফেরারিদের একজন…।’
সে নাম উচ্চচারণ না করে থেমে গেল। রোহিণী অনুনয় ভরা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আর আমাকে ভয়ের দিকে ঠেলে দিয়ো না। অন্তত আজকের দিনটায় নয়।’
‘তাহলে ওই মালাইটা ফেলে না রেখে খেয়ে নাও। দারুণ হয়েছে, বলে দিয়ো।’
‘আর আমি ওপরে যাব না। কেন জানি অস্বস্তি লাগছে ওপর সম্পর্কে।’
‘গঙ্গাদার কথা শুনে? কিন্তু কে সত্যি কে মিথ্যে সেটা তো এখনও সাব্যস্ত হয়নি।’
রোহিণী উত্তর দিল না। রাজেন পলিথিন প্যাকেট থেকে খাবারের বাক্স বার করল।
‘আবার কী?’
‘ধোকলা।’ বাক্স খুলে রাজেন এগিয়ে ধরল।’ খেয়ে দ্যাখো। ডালের জিনিস, নোনতা নোনতা, টক টক, সঙ্গে লঙ্কাও রয়েছে তবে ঝাল নেই।’
পুডিংয়ের মতো জমানো। ধনেপাতা ছড়ানো। রোহিণী একটা টুকরো মুখে দিয়ে, চাহনি মারফত তার পছন্দটা জানিয়ে দিল। উঠে গিয়ে সে সন্দেশের বাক্স আনল।
‘এটা বাঙালি খাবার।’
‘হুমম।’ রাজেনের মুখে তখন আস্ত একটা কড়াপাক। সে দ্বিতীয় পলিথিন প্যাকেটটার দিকে হাত বাড়াল।
‘কী আছে ওতে?’
‘চকোলেট কেক।’
‘থাক ওটা। মালাই, ধোকলা তারপর সন্দেশ! এই সবই যদি খাবে, তাহলে ভাত খাবে কে? খাওয়ানোর কথা তো আমারই। আর তুমি—দাও সরিয়ে রাখি, চোখের সামনে থাকলে—।’
রোহিণী প্যাকেটটা নিয়ে উঠে যেতেই রাজেন পাখা খুলে রেগুলেটর এক পয়েন্টে রাখল।
‘বেশ গরম আজ, ঘেমে গেছি।’
‘আমি তো রোজ মাথা না ভিজিয়ে রাতে চান করি।’ রোহিণী প্লেট তুলে রান্নাঘরে যাবার সময় বলল।
‘আমিও আজ চান করব।’
‘অভ্যেস নেই, ঠান্ডা লেগে যাবে। খেলা রয়েছে না?’
‘মাথায় জল দেব না।’ রাজেন কলঘরের দরজায় গিয়ে ভিতরে উঁকি দিল।
‘ভাতটা চড়িয়ে, মাছগুলোয় সর্ষে লঙ্কা বাটা মাখিয়ে, আমি আগে সেরে নিই।’
‘ততক্ষণে আমার গায়ে জল ঢালা হয়ে যাবে।’ রাজেন সোয়েটার খুলতে খুলতে বলল।
