‘পথেই গাড়ি থামিয়ে কিছু খেয়ে নিলে পারতে।’
‘তাই তো চেয়েছিলাম, তুমিই তো খেতে দিলে না, উলটে অ্যাকসিডেন্টের ভয় দেখালে।’
‘হয়েছে। তোমার এই খাই খাই রোগটা সারাবার চিকিৎসা দরকার। ওপরে চলো।’
‘চিকিৎসার জন্য?’
রোহিণী কর্ণপাত না করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল। তিনতলায় পৌঁছে সে বলল, ‘এই নাও চাবি, ঢুকতে হয় ঢোক, আর নয়তো এখানে দাঁড়াও। আমি উপর থেকে মাছটা নিয়ে আসি।’
এই বলে সে চারতলার সিঁড়ি ধরল। ঘোরার মুখে আড়চোখে দেখল, রাজেন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সিঁড়িতে বসে পা ছড়িয়ে দিল।
দরজা খুললেন যিনি, তাঁকে রোহিণী চিনে নিল। গঙ্গাপ্রসাদের বর্ণনামতো ইনিই নিশ্চয় হৃদয়রঞ্জন। ভিতর থেকে দেখতে পেয়ে সুজাতা ডাকলেন, ‘এসো ভেতরে এসো, মাছটা নেবে তো?’
‘হ্যাঁ।’ বলেই ভিতরে ঢুকে রোহিণী কাঠ হয়ে গেল। খাওয়ার টেবিলে, পিছন ফিরে একজন বসে। দীর্ঘকায় রোগা, ঝাঁকড়া, কাঁচাপাকা চুল। টেবিলে একটা ছিটকাপড়ের তাপ্পি দেওয়া ঝোলা।
হৃদয়রঞ্জন দরজাটা বন্ধ করেছেন। রোহিণী সেটা আঁকড়ে ধরে কী একটা বলতে গেল। মুখ দিয়ে স্বর বেরোল না।
.
‘এসো ভেতরে এসো।’ সুজাতা আবার ডাকলেন।
চেয়ারে বসা লোকটি মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। হাতের চামচে মালাইয়ের ঢুকরো।
‘উনি আমাদের গুরুভাই। তোমায় বলেছিলাম না, কাল উনি এসেছিলেন।’
লোকটি দু—হাত জড়ো করে কপালে ঠেকাল আর তাই করতে গিয়ে চামচ থেকে মালাইয়ের টুকরোটা টেবিলের উপর পড়ল। রোহিণী তখনও ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রতি—নমস্কার জানাবার বদলে সে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে আছে। কোথায় শোভনেশ!
এই লোকটিকেই তা হলে চঞ্চলা আর নন্দা কাল দেখেছিল। কী নিশ্চিন্তি! আবার একটা ভয় থেকে সে বেরিয়ে এল। রোহিণী দু—হাত অনেক চেষ্টায় তুলল নমস্কার জানাতে। তার মনে হচ্ছে, সারা শরীরটাই একটা ঝরনাধারার মতো তিরতির করে নেমে যাচ্ছে। হাত পা মুখ গলে গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে তাকে অদৃশ্য মানুষ বানিয়ে দিচ্ছে। সে দুটো অদৃশ্য হাত তুলে নমস্কার করল। এখন তো সে লোকটির পায়ের উপরও হুমড়ি খেয়ে পড়ে বলতে রাজি, আপনি বাঁচলেন শোভনেশ না হয়ে।
‘কাল আপনি বোধ হয় নীচের তলায় একটা বাচ্চচা মেয়ের কাছে ফ্ল্যাটের নম্বর জানতে চেয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’ গুরুভাই বিব্রতভাবে বললেন। ‘চশমাটা পরশু ট্রেনে ভিড়ের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে দুটো কাচই ভেঙে গেছে। বনগাঁ লাইনের গাড়ি তো, লোকে বলে রাবণের গুষ্টির লাইন। তা ওটা দোকানে দিয়েছিলাম। কাল নিতে গেলাম, বলল হয়নি। চশমা বিনা ভালো দেখতে পাই না। ভুল করে তিনতলায় বেল বাজিয়ে ফেলি। লম্বা সেমিজ পরা একটি মেয়ে দরজা খুলল। তার পিছনে ছিল একটি ছেলে।’
‘অ্যাঁ!’ সঙ্গে সঙ্গে রোহিণী নিজেকে সংযত করে নিল। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মোটাসোটা, মুখটা গোল, গায়ের রং আমার মতোই কালো। পরনে ছিল গলা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত হলুদে খয়েরিতে ছোপ দেওয়া ম্যাক্সি।’ সে নন্দার বর্ণনাই দিল এবং তার ম্যাক্সির।
‘হ্যাঁ, ওইরকমই। মেয়েটি প্রথমে বোধ হয় আমাকে চোর—ডাকাত কিছু ভেবেছিল, খুব ভয় পেয়ে গেছিল। দরজাটা খুলেই বন্ধ করে দেয়, তারপর ছেলেটি দরজা খুলে আমার নাম ধাম জিজ্ঞেস করে বলে দেয়, ভুলে করেছেন, ওপরের ফ্ল্যাটে যান।’
নন্দাকে তো বোঝা গেল, কিন্তু ছেলেটা কে? রোহিণী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ডুপ্লিকেট চাবিটা আজই সে চেয়ে নেবে। দুপুরে ফাঁকা ফ্ল্যাট খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে তার মালিককে।
‘আমার দিদির ছেলেমেয়ে এসেছিল।’ সুজাতা ও হৃদয়রঞ্জন তাকিয়ে আছে দেখে রোহিণীকে কথাগুলো বলতে হল। একটা কনফিউশন, আবার একটা মিথ্যার জাল বোনার ঘটনা। তবে ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে। নন্দাকে হুঁশিয়ার করে দিতে হবে।
‘মাসিমা ওটা দিন।’
সুজাতা ডীপ ফ্রিজের পাল্লা খুলতেই সাজানো কুলপিগুলো রোহিণী দেখতে পেল।
‘এখনও দেখছি অনেকগুলো রয়েছে।’
‘বোসো, একটা খেয়ে যাও।’
তার বলাটা বৃথা গেল না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রাজি হওয়াটা ভালো দেখাল না। রোহিণী একটু বেশিরকম আটপৌরে গলায় বলল, ‘না মাসিমা, যাকে নেমন্তন্ন করেছিলাম, সে নীচে অপেক্ষা করছে।’ তারপরই যোগ করল, ‘আচ্ছা আমি যদি নিয়ে যাই?’
‘নিতে পার।’ মাছের প্যাকেটের সঙ্গে জমানো মালাই ভরা প্লাস্টিকের দুটো কুলপি রোহিণীর হাতে দিয়ে বললেন, ‘একটা তোমার আর একটা তোমার অতিথির। খেয়ে বোলো কেমন লাগল।’
‘নিশ্চয় বলব।’ হালকা ফুরফুরে খুশি এখন রোহিণীর সর্বাঙ্গ জুড়ে। লোকটা শোভনেশ নয়। বহরমপুর হাসপাতাল থেকে যে দুটো লোক পালিয়েছে, তাদের একজন যে শোভনেশই, এমন প্রমাণ সত্যিই তো মেলেনি। মিছেই সে ভয়ে মরছিল।
বহু বছর পর, অন্তত কুড়ি বছর তো হবেই, রোহিণী চার ধাপ বাকি থাকতেই জোড় পায়ে লাফ দিয়ে সিঁড়ির বাঁকের ল্যান্ডিংয়ে নামল। টালটা সামান্য একটু ঝুঁকেই সে কৈশোর দিনের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, তিনতলার ল্যান্ডিংয়ের দিকে তাকাল। ভয়ের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে এখন সে আনন্দে আর এক ধরনের দিশাহারা।
রাজেন এখনও দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পা ছড়িয়ে। তার ঝুলিটা কোলে, হাতে ফ্ল্যাটের দরজার চাবি। চোখ বন্ধ। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। রোহিণী এবার আগের মতোই জোড় পায়ে ছ—টা সিঁড়ির উপর থেকে লাফ দিল এবং ধপ করে মেঝেয় পড়ে উবু হয়ে বসেই রইল, রাজেনের মুখোমুখি হয়ে।
