‘দু—জন বাঙালি প্রায় একই সময়ে জন্মেছিলেন, তাঁদের জন্মভিটের ঠিক মাঝামাঝি পয়েন্ট একই জায়গাটা, তাই একটা নমস্কারেই কাজ সারলাম।’ আড়চাখে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে রাজেন বলল, ‘এবার রবীন্দ্রনাথের এলাকা ছেড়ে বিবেকানন্দের এলাকায় ঢুকলাম।’
‘জানি। ছোটোবেলায় বাবা আমাদের দু—বোনকে এনে দেখিয়ে গেছলেন বাড়ি দুটো। এরপর দীনবন্ধু মিত্র, ডি এল রায়, রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, এরকম অনেকের বাড়ির অঞ্চল পড়বে রাজেন, তুমি বাপু কাজ সারতে আর স্টিয়ারিং ছেড়ো না।’
‘পুণ্য অর্জনেও বাধা!’ রাজেন স্বগতোক্তি করল রোহিণীকে শুনিয়ে। ‘ভেবেছিলাম মানিকতলায় মোড় পেরোবার সময় দূর থেকেই বসু বিজ্ঞান মন্দিরের দিকে একটা—।’
বিধান সরণির মোড়। ট্র্যাফিকে হিলম্যান দাঁড়িয়ে গেল। রোহিণী নীচু স্বরে বলল, ‘রাজেন, অদ্ভুত ব্যাপারটা কী জান? একটা ভয়, ছমছমে একটা অনুভব সত্যিই হচ্ছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি আমি বিভ্রান্ত। টোটালি কনফিউজড। উলটোপালটা কথা শুনছি একই ঘটনার।’
এই বলে সে সুভাষ গায়েন, উপরের সুজাতা গুপ্ত, গঙ্গাপ্রসাদ আর ‘লালসার আগুনে ভস্মীভূত শিল্পীরা’ থেকে যা শুনেছে এবং পড়েছে, সবই একে একে রাজেনকে বলল। এমনকী নন্দার কাছে শোনা ‘ছেলেধরার মতো’ লোকটার কথাও বলল। আর হিলম্যান ততক্ষণে মানিকতলা মোড় পেরিয়ে, খালের ব্রিজ, বাগমারি, ছাড়িয়ে কাঁকুড়গাছি মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরেছে।
‘এইবার বলো, এখন আমি কী করব?’
‘বলছি। আচ্ছা এই হাসপাতালটার পাশ দিয়ে সল্টলেকে যাবার রাস্তা আছে না?’
‘হ্যাঁ আছে।’
রাজেনের হিলম্যান আচার্য সত্যেন বোস সরণি থেকে ডানদিকে বেঁকে ট্রাম লাইন অতিক্রম করে মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালের পাশের রাস্তা ধরল। সন্ধে হয়ে এসেছে, রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। বাঁদিকে দেবদারু গাছের বাগানওয়ালা গোলাপি রঙের বাড়ি, বোস ইন্সটিটিউট।
‘একটু দাঁড়াও তো এখানে।’
হিলম্যান থামল।
‘ওই বাগানের মধ্যে একজনের একটা কালো বাস্ট রয়েছে মুখটা নীচু করা, হাতে চারাগাছের দুটো পাতা। দারুণ মূর্তি। পুণ্যি করতে আর বাধা দেব না। ফার্স্ট বলে বোল্ড হয়ে এসে তারপর যে বলবে, আমার জন্যই—নাও কাজ সারো।’
‘কিন্তু কে?’ ভ্রূ তুলে, বড়ো বড়ো চোখ করে রাজেন তাকাল।
‘তার মানে! ভারতবর্ষে একটা মানুষের হাতেই তো গাছের পাতা থাকতে পারে!’
‘আমি বিভ্রান্ত। কনফিউজড।’ তারপরই ‘মাই গড’ বলে সে ধড়মড়িয়ে দরজা খুলে নেমে, ছুটে বাগানের রেলিংয়ের কাছে গেল। মিনিটখানেক পর ফিরে এসে স্টিয়ারিং ধরে ফিসফিস করে বলল, ‘গাছেরও প্রাণ আছে, মানুষের মতোই।’
‘মানুষও যদি গাছের মতো হত। মেঘ তৈরি করিয়ে, অক্সিজেন দিয়ে, ছায়া দিয়ে শীতল করে, ফল দিয়ে শুধু উপকার করা ছাড়া ওরা আর কিছু জানে না, পারে না। আর এই গাছকে আমরা—।’
‘মানুষের মতো নিষ্ঠুর জানোয়ার আর হয় না। বাঘ, সিংহীও অকারণে কখনো প্রাণীহত্যা করে না, শুধু খিদে পেলেই ওরা মারে। আর মানুষ?’
‘মানুষের সর্বনাশ করেছে তার ইমোশন। তাই থেকেই যত জটিলতা। নয়তো কী দরকার ছিল শোভনেশের এই খুনটা করার?’
বাঁদিকে বিধান শিশু উদ্যানের পাঁচিল, ডানদিকে বাগমারি কবরস্থানের ঝিল। তার মাঝের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গাড়ি পৌঁছাল ইস্টার্ন বাইপাসে।
রোহিণী নির্দেশ দিল, ‘ডানদিকে, তারপর একটু এগিয়েই বাঁদিকে সল্টলেকে ঢোকার পথ, আর সোজা মাইলখানেক চলে গেলে স্টেডিয়াম।’
‘ইমোশান আছে বলেই আমরা মানুষ। তোমার আমার আছে, তাহলে শোভনেশেরই বা থাকবে না কেন? কিন্তু কথাটা হল, কীভাবে কোনদিকে সেটা চালিত হচ্ছে। তাই তো? এই ধরো এখন আমার—।’
‘হ্যাঁ, তোমার? বলে ফ্যালো।’
‘থাক।’
‘আমি জানি, এখন তোমার কী ইচ্ছে করছে। এই নির্জন রাস্তা, তার উপর আলোগুলোও জ্বলছে না, এই পরিবেশ বিটলেমির ইমোশন ছাড়া তোমার মধ্যে আর কোনো ব্যাপার তৈরি করছে না।’
‘এক সেকেন্ড শুধু গাড়িটা থামাব।’
‘আধ সেকেন্ডও নয়। খবরদার, প্রথম বলে আউট হবার ভয় দেখাবে না।’ …হাত সরাও, অ্যাকসিডেন্ট করে বসবে।’
‘এই ফাঁকা রাস্তায় কীভাবে অ্যাকসিডেন্ট করব?’
‘যা হবার কথা নয়, সেটা হলে তাকে অ্যাকসিডেন্ট বলে।’
‘শোভনেশও তো অ্যাকসিডেন্টে মানুষ মারতে পারে।’
রোহিণী মুখ ঘুরিয়ে রাজেনের দিকে তাকাল। ‘তাই তো! এটা তো আমার মনে কখনো হয়নি!’
‘দিনে অন্তত পাঁচশো লোক এ দেশে গাড়ি চাপা পড়ে, তার একটাও কিন্তু গাড়িওয়ালার ইচ্ছাকৃত নয়। অথচ লোকে প্রথমেই তাদের পেটায় আর গাড়িতে আগুন ধরায়। আমরা ধরেই নিয়েছি, শোভনেশ খুন করেছে।’
‘পুলিশ ইনভেস্টিগেট করেছে, জজ সাক্ষ্য—প্রমাণ দেখেছেন, সবথেকে বড়ো কথা, আসামি নিজেই স্বীকার করেছে। এরপরও কোনো সন্দেহ থাকতে পারে কি?’
‘পারে। হয়তো পুলিশ ঠিকমতো তদন্ত করেনি আর শোভনেশ মানুষজনের কাছ থেকে সমাজ থেকে, নিজেকে সরিয়ে নেবার জন্যই নিশ্চয় প্রচণ্ড মেন্টাল প্রেশারে ছিল, হয়তো বাঁচার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে গেছিল, তাই কনফেস করে।’
‘ও আমারও গলা টিপে ধরেছিল ন্যুড হয়ে সিটিং দিতে রাজি না হওয়ায়। বাড়িতে আমি পালিয়ে পালিয়ে থাকতাম। আমার ভয় করত, কখন আবার—’
গাড়ি থামাল রাজেন। তারা পৌঁছে গেছে। গেটের দু—ধারে আলো জ্বলছে। বাড়ির ভিতরে ড্রাইভওয়েতে তিনটে মোটর দাঁড়িয়ে, গাড়ি রাখার আর জায়গা নেই। গেটের কাছেই গাড়ি রেখে, পিছনের সিটে রাখা পলিথিন প্যাকেটের থেকে দুটো তুলে নিয়ে রাজেন বলল, ‘দুপুরে ভাত খাওয়ার পর এখনও পর্যন্ত পেটে কিছু পড়েনি।’
