কারোর সঙ্গেই অনন্তের দেখাসাক্ষাৎ নেই। দায়সারা বিজয়ার প্রণাম সে পায় বটে, সকলের ঠিকানায় জবাবও দেয় কিন্তু ওই পর্যন্তই। অলু কলকাতায় থাকে অথচ তার সঙ্গে তিন বছর দেখা হয়নি। অবিনাশকাকা রিটায়ার করে তাঁর দেশের বাড়িতে চলে যান, সেখানেই আছেন। ব্লাডপ্রেশারের রোগী, মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে শেষবারের মতো দেখে যেতে বলেন।
রেবতীর চলে যাওয়ার খবরটা জানাবার মতো লোক আছে শুধু মা। তার বিয়ের ব্যাপারে মা ছাড়া কেউ আর আগ্রহ দেখায়নি। অবশ্য ছেলেকে গৃহী দেখতে কোন মা না চায়!
আলো নিবিয়ে অনন্ত খাটে পা ঝুলিয়ে বসল।
অন্যরা শুনলে কী বলবে? বোনেদের না জানিয়েই সে বিয়ে করেছে। তবু কীভাবে যেন ওরা জেনে গেছল। অলু একদিন ঘণ্টাখানেকের জন্য এসেছিল রেবতীকে দেখতে। বাসে তুলে দিতে যাবার সময় অলু বলেছিল, ‘বউয়ের বয়স হয়েছে। পছন্দ করেই যখন বিয়ে করলে, কমবয়সি করলে পারতে।’
‘কত আর বয়স, তিরিশের নীচেই।’
আড়চোখে সে দেখেছিল, অলুর ঠোঁট মুচড়ে গেল।
‘তিরিশের নীচে! আমার থেকে অন্তত দু—তিন বছরের বড়ো বই কম নয়।’
অলুর জন্মসাল ধরে অনন্ত হিসেব করল।
‘তোর এখন একত্রিশ?’
‘হ্যাঁ। তিন মাস পর বত্রিশে পড়ব।’
‘আমারও তো ঊনচল্লিশে পড়ার কথা। বয়সের ফারাক খুব একটা কি?’
‘আর দু—দিন বাদেই তো বুড়ি হয়ে যাবে।’
‘হোক, শরীরই কি স্বামী—স্ত্রীর জীবনে সব? তা ছাড়া আমিও তো বুড়ো হয়ে যাব।’
তার কথার ভঙ্গিতে ও স্বরে গভীর শান্ততা এবং জীবনের উপর সহজ ভরসা প্রকাশ পেয়েছিল।
‘ভাগ্যে যা আছে তা হবেই।’
অলু চুপ করে থাকে।
‘তোর বোধহয় পছন্দ হয়নি বউদিকে।’
‘না না, পছন্দ হয়নি কে বলল? বেশ সুন্দরী, ফিগারটিও চমৎকার। আমি তো প্রথমে দেখে অবাকই হয়ে গেছলুম। তুমি এমন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে ভাব করলে কী করে? চিরকালই তো মেয়েদের দেখলে কুঁকড়ে সরে যেতে।’
অনন্ত অত্যন্ত খুশি হয়েছিল। অলুর দিকে তাকিয়ে গালভরা হাসি নিয়ে বলেছিল, ‘তোরা তো আমাকে বোকা ছাড়া আর কিছু ভাবিস না।’
‘মোটেই না। ছোড়দা আর অনু ভাবতে পারে আমি কোনোদিন ভাবিনি। …তুমি ওদের কোনো খবর পাও?’
‘না।’
‘ভাবছি একবার দিল্লি যাব। ছোড়দা যদি ওর একটা কাজকম্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।’
‘শান্তনু এখন খায়টায়?’
‘ও জিনিস কি আর ছাড়া যায়!’
‘ওর স্বাস্থ্য এখন কেমন?’
‘ভালো না, রক্ত আমাশায় ভুগছে।’
‘খুব খারাপ রোগ।’
‘দাদা অনেকের জন্য তো অনেক করেছ, আর একটু করো না।’
‘আমি আবার কার জন্য কী করলুম! ভাগ্যে যা আছে তা—ই হয়েছে।’
‘শ পাঁচেক টাকা আমায় দেবে?’
‘পাঁ—চ—শো, কোথায় পাব!’
‘ওরা তোমায় কিছু দেয়নি।’
‘শ্বশুরবাড়ি? আরে দূর, দেবার মতো কেউ থাকলে তো দেবে। তিন বোন একটা ছোটো ভাই, আমাদের মতোই বাবা নেই।’
‘তোমার কাছে নেই?’
‘এখনই…খুবই দরকার? কবে চাই?’
‘আজ পেলে আজই।’
‘জোগাড় করতে হবে।’
অলুকে বাসে তুলে দিয়ে ফেরার সময়, ‘চিরকালই তো মেয়েদের দেখলে কুঁকড়ে সরে যেতে, কথাটি নিয়ে সে মনে মনে খুব হেসেছিল। কেউ জানে না, সতেরো—আঠারো বছর আগে সে একজনকে দারুণ ভালোবেসেছিল। গৌরী নাম। এখন সে কোথায় থাকে কে জানে!
বাড়ি ফিরতেই রেবতী বলেছিল, ‘কিছু বলল কি তোমার বোন?’
‘কী বলবে?’
‘আমার সম্পর্কে। নতুন মানুষ দেখলে মেয়েরা মন্তব্য না করে কি থাকতে পারে?’
‘তোমার ওকে পছন্দ হয়নি?’
‘যেভাবে হাঁড়ির খবর নিচ্ছিল…তোমার আর—এক বোনের নাকি অবস্থা খুব ভালো, কটকে থাকে?’
‘শুনেছি, আমি ঠিক জানি না।’
রেবতী ‘তোমার বোন’, ‘তোমার মা’, ‘তোমার ভাই’ এইভাবেই বলে। কখনো ‘মা’, ‘ঠাকুরঝি’, ‘বা ‘ঠাকুরপো’ ওর মুখ থেকে বেরোয়নি। অনন্ত একবার বলেছিল, ‘আমার মা এখন তোমারও মা।’
‘আগে তো দেখি তারপর মা ডাকব।’
রেবতীর শুকনো নিস্পৃহ স্বর বুঝিয়ে দিয়েছিল সে সহজে সম্পর্ক পাতাতে অনিচ্ছুক। অনন্ত কখনো জোর দেয়নি। সে নিঃসঙ্গতা থেকে রেহাই পেয়েছে, এতেই সে খুশি এবং সুখী।
এখন তার সুখ ধ্বংস হয়ে গেছে। জানাজানি হলে সে মুখ দেখাবে কী করে? যে শুনবে প্রথমেই সে বলবে, ‘কার সঙ্গে বেরিয়ে গেল?’ কিংবা ‘কোথায় গিয়ে উঠেছে?’
অনন্ত জানে কোথায় গেছে। চিঠিতে কিছু বলেনি বটে কিন্তু সে অনুমান করছে রেবতীর পিছনে আছে দিলীপ ভড় নামে সেই লোকটি যাকে বিয়ের আগে রেবতী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, ‘এই হচ্ছে দিলীপদা, অনেক উপকার করেছে আমাদের। দিলীপদা না থাকলে আমাদের পরিবারটা ভেসে যেত। …আর ইনি হচ্ছে সেই ভদ্রলোক কাগজে ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।
‘ওহ আপনি!’
অনন্ত নমস্কার করেছিল, লোকটি না—দেখার ভান করে সিগারেটের বাক্সটা এগিয়ে দেয় তার দিকে। অনন্ত হাত জোড় করে বলে, ‘মাফ করবেন, খাই না।’
সিগারেট কেন সুপুরিও সে খায় না। অবিনাশকাকা বলেছিলেন, ‘এখন থেকে টাকা জমানো অভ্যেস কর। আজেবাজে সিনেমা দেখে, রেস্টুরেন্টে খেয়ে, প্যান্ট—জামা—জুতোয় কী পান—সিগারেটে টাকা ওড়াসনি। মনে রাখিস তিনটে ভাইবোন, মা তোর জিম্মায়।’
অনন্তের বয়স তখন আঠারো। অবিনাশকাকা প্রথম দিন তাকে বই বাঁধাইয়ের দোকানটায় পৌঁছে দিয়ে মালিক প্রসাদ ঘোষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর, কথাগুলো বলেন।
‘কিছুই তো কাজ জানে না, তবে শক্তিবাবুর ছেলে বলেই নিচ্ছি, এখন পঁয়ত্রিশ টাকা দোব, শিখুক, কাজ শিখলে তখন বাড়াব।’
