‘বুড়ো হয়ে গেছে, রিটায়ার করিয়ে দাও।’
‘এঞ্জিনটা ওভারহল করিয়ে, বডিটাকে রং করিয়ে নিলে দেখবে মারুতি ছোকরারাও আমার বুড়োর সঙ্গে পারবে না।’ রাজেনের গলায় চাপা অভিমান এবং ক্ষোভও।
‘করাচ্ছ না কেন?’
‘টাকা নেই।’
টিরেট্টা বাজার আর চিৎপুরের মোড়ে ট্রাফিকের জন্য গাড়ি দাঁড় করাতে হয়েছে। ওরা পুবদিকে এগিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যুতে পড়ে বাঁদিকে ঘুরল। গিরিশ পার্ক পর্যন্ত গিয়ে ডানদিকে বেঁকে তারপর বিবেকানন্দ রোড ধরে সোজা যাবে।
‘নেই কেন? হাজার তিনেক তো অফিস মাসে মাসে দিচ্ছে। কিপ্টেমিটা একটু শেখো, এটা শেখার জিনিস, একটা আর্টও বটে। বাড়িতে দাওটাও কিছু?’
‘মাকে হাজার দিই। বাকি দু—হাজার নিয়ে কিপ্টেমির আর্ট চর্চা করা যায় না। বড়দা তার অ্যাম্বাসাডার বেচে মারুতি কিনেছে। আমাকে বলল, তোমার মতোই বিদ্রূপ করে, এবার এটাকে রেহাই দে। টাকা দিচ্ছি, একটা নতুন কিছু কিনে নে। আমার ক্লার্কেরও যে এর থেকে ভালো গাড়ি রয়েছে। ব্যারিস্টার দাদা, কী আর বলব! একবার জজের সামনে দাঁড়ালেই আমার মাইনের টাকা মক্কেলের পকেট থেকে তুলে নেন।’
‘আমি বিদ্রূপ করিনি মোটেই। মায়া হচ্ছে বলেই বললাম।’
‘এখনকার চাকরিটা ছাড়ব ঠিক করেছি। খেলার জন্যই এতদিন ভালো ভালো অফার পেয়েও যাইনি। ওসব জায়গায় নাকে দড়ি দিয়ে খাটায়, খেলার জন্য ছুটিছাটা পাওয়া যাবে না। একটু আগে বুড়োকে রিটায়ার করাতে বললে, তাই মনে পড়ল। এবার নিজের কেরিয়ার দেখতে হবে। এবার খেলা ছাড়ব, এটাই শেষ সিজন। সম্ভব হলে ক্লাব ক্রিকেট ছাড়া আর কিছু নয়। বিসিআই একটা খুব বড়ো কেবল তৈরির কোম্পানি।’
ট্রাফিক ছেড়ে দিয়েছে। মন্থর গতিতে সামনের গাড়িকে অনুসরণ করে রাজেন হুঁশিয়ারভাবে হিলম্যানকে নিয়ে এগোচ্ছে। এঞ্জিন চালু না থাকলে আবার কী মুশকিলে এই ভিড়ের মধ্যে ফেলে দেবে কে জানে!
‘কম্প্যুটারে, টেলি—কমিউনিকেশনে, পাওয়ার স্টেশনে, ডিফেন্সে, স্যাটেলাইট লাঞ্চিংয়ে, রেলওয়েজ, এইরকম বহু কাজে এদের তৈরি ওয়্যারস অ্যান্ড কেবলসের ব্যবহার হয়। এখন এক্সপ্যানশন প্রোগ্রাম নিয়েছে। পেট্রোলিয়াম জেলি ফিল্ড কেবলস আর কয়েল কর্ড তৈরির জন্য, এসব টেলিফোন ইন্সট্রুমেন্ট—এ লাগবে। ওদের প্রোডাকশন ডিভিশনে জয়েন করব সামনের এপ্রিলে। পাঁচ হাজার মাসে, প্লাস গাড়ি, প্লাস ফ্ল্যাট। যাদবপুর থেকে বি টেক করে বেরোবার পরই জোকায় যদি তখন এমবিএ করার জন্য অ্যাডমিশান নিতাম আর এই ক্রিকেটের নেশায় না পড়তাম, তাহলে এখন বছরে লাখ টাকা স্যালারি তো হতই।’
‘এইসব হা—হুতাশ কবে থেকে শুরু করেছ? আমাকে তো কখনো বলোনি?’
‘এসব কাউকে বলা যায় না। একদিন তো বিয়ে হবে, ফ্যামিলি হবে। ক্রিকেটে এত রান জমা হয়নি যে, তাই ভাঙিয়ে জীবন চলে যাবে।’
‘বিয়ে করছ? কাকে?’
‘নিশ্চয়ই একটা মেয়েকে। …ভালো কথা, তখন ফোনে বললে নানারকম চাপ, শরীর—মন ক্লান্ত, ব্যাপার কী?’
‘বলছি, রাস্তাটা পেরিয়ে নাও।’
মহাত্মা গান্ধী রোড পেরিয়ে আসার পর রোহিণী বলল, ‘কাল খবরের কাগজে একটা পাঁচ—ছ লাইনের খবর পড়ার পর থেকেই অদ্ভুতভাবে সময় কাটছে। অবাস্তব অথচ ভয়ের একটা জগতে আমি যেন ঢুকে পড়েছি। শোভনেশ বহরমপুর জেলে আছে, তোমায় তো বলেছি, ওই খবরে রয়েছে বহরমপুর জেল থেকে এক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি পালিয়েছে।’
‘তাই নাকি?’ রাজেন আদৌ চমকাল না। চোরবাগানের কাছাকাছি এসে গেছে। জায়গাটাকে কলকাতার রাজস্থান বলা যায়। এখানে ট্র্যাফিকের নিয়মকানুন রাজস্থানি মতে চলে। সে রিকশা, ঠেলা, টেম্পো ইত্যাদির ঔদাসীন্যের প্রতি সম্ভ্রম দেখতে এখন যত্নবান। রোহিণীর জন্য কান ছাড়া আর কিছু এখন পাতা সম্ভব নয়।
‘বেশ তো, পালাবার সুযোগ পেলে ছাড়বে কেন?’
‘কিন্তু সে শোভনেশ।’ রোহিণী অধৈর্য হয়ে গলা তীক্ষ্ন করল।
‘তুমি ঠিক জান?’
রোহিণী অপ্রতিভ হয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেও আর বলল না।
‘নাম দিয়েছে?’
‘না।’
‘ডেসক্রিপশন? কীসের আসামি ছিল?’
‘না, সেসব কিছুই নেই। গঙ্গাদা বহরমপুরে একজনকে ট্রাঙ্ক কলে খোঁজ নিয়েছেন। সে বলল একজন নয়, দু—জন যাবজ্জীবনের আসামি পালিয়েছে, তাও হাসপাতাল থেকে।’
রাজেন শিস দিয়ে উঠল। ‘সাবাস, দু—জন তাহলে! তোমার ধারণা, এদের মধ্যে একজন অবশ্যই শোভনেশ?’
‘যাবজ্জীবন পাওয়া লোক কি গন্ডা গন্ডা পাওয়া যায়?’
‘কাগজ পড়? খুঁটিয়ে পড় কি? আইন আদালতের কলামে চোখ ফেললেই বুঝতে পারবে, জজ হাকিম বিচারপতিরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় লিখতে লিখতে হাতে টেনিস—এলবো করে ফেলেছে। গাদা গাদা খুন, ধর্ষণ, বউ মারা!’
‘কিন্তু আমার মন বলছে শোভনেশই পালিয়েছে, আর সে এখন আমার কাছে আসার চেষ্টা করছে। কাল একটা লোক দুপুরে ফ্ল্যাটে গিয়ে আমার খোঁজ করেছে। তার যা বর্ণনা শুনলাম, হুবহু শোভনেশ।’
এইবার রাজেন উদবিগ্ন হল। কাল ইডেনে সে রোহিণীকে ভীত—সন্ত্রস্ত হতে দেখেছিল। এখন তার কারণটা বুঝতে পারছে। হঠাৎই অকারণে রেগে উঠেছিল, আবেগভরে দু—চারটে কথা বলেছিল। মানসিক ভারসাম্য হারালে মানুষ যেমন আচরণ করে, তাই করেছিল। অথচ ও যথেষ্ট টাফ মেয়ে, সাহসীও।
গাড়ি গিরিশ পার্ক থেকে ঘুরে সিমলের কাছাকাছি। রাজেন স্টিয়ারিং ছেড়ে দু—হাত মাথায় ঠেকিয়ে কারও উদ্দেশে যেন প্রণাম জানাল রোহিণী অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল।
