‘জলন্ধরে, আমায় তাই বলেছেন। আচ্ছা, শোভনেশের তো তখন বিয়ে হয়ে গেছে। ওর বউয়ের কোনো রিয়্যাকশন হয়নি?’
‘হয়তো হয়েছিল। কমলা ভীরু, নিরীহ, কুনো ধরনের ছিল। চির রুগণ। সাত চড়ে রা কাড়ত না। ও বাড়িতে অতবার গেছি, একবারও চোখে দেখতে পাইনি। বাইরের ঘরেও আসত না।’
‘কীভাবে মারা গেল?’
‘প্রেগনান্ট ছিল। বাথরুমে পিছলে পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড হেমারেজ হয়। ক্যাম্বেল হাসপাতালেই মারা যায়।’
রোহিণী আবার ধাক্কা খেল। কমলার মৃত্যুর তিন নম্বর কারণ। শোভনেশ বলেছিল ম্যালিগন্যান্ট টাইফয়েড, সুজাতা গুপ্ত বলেছেন দোতলা থেকে লাফিয়ে নীচে পড়ে এবং তাঁর সন্দেহ এটা নিছকই আত্মহত্যা নয়। আর গঙ্গাদা বলছেন অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু সে তো ঠিক করেই ফেলেছে, কথা না বলে নিজেকে আড়ালে রাখবে। তাই বিস্ময় গোপন করে রইল। একটু আগেও সে বিস্ময় গোপন করেছে, যখন গঙ্গাদা বললেন, শোভনেশদের পাগলের বংশ নয়। অথচ সিধারথ সিনহা তালিকা দিয়ে উলটোটাই লিখেছে, সুজাতা গুপ্তও বলেছেন, পাগল হবার ভয়ে শোভনেশরা সিঁটিয়ে থাকত।
‘ভস্মীভূত শিল্পীদের’ বাকি অংশটুকু পড়া বাকি রয়েছে। রোহিণী এখনই পড়ে ফেলার ইচ্ছায় চনমন করে উঠল। আরও কত অজানা খবর লেখাটায় লুকিয়ে রয়েছে কে জানে! ঝুলির মধ্যে ম্যাগাজিনটা, হাত ঢুকিয়ে তবু সে জেনে নিল রয়েছে কিনা। গঙ্গাদা কি এটা পড়েছেন? কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কত রকমের কাঁড়ি কাঁড়ি ম্যাগাজিন যে এখন বেরোচ্ছে, সব কী কেউ পড়ে উঠতে পারে? ইস্টার্ন ম্যাগাজিন বহুরকম পিরিওডিক্যালই কেনে। এইটে,…আহ নামটা এখনও জানা হয়নি, মলাটটাই ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে, এইটে কেনা হয় না। হলে তার চোখে পড়তই।
রোহিণী যখন এই সব ভেবে চলেছে, গঙ্গাপ্রসাদ তখন কলম দিয়ে প্যাডে নিজের নাম সই করছেন আর ঘসে ঘসে সেটা কাটছেন অন্যমনস্ক হয়ে।
আবার ফোন বেজে উঠল। গঙ্গাপ্রসাদ রিসিভারটা কানে দিয়েই বাড়িয়ে ধরলেন, ‘তোমার।’
রোহিণী হাতে নেবার সময়ই বুঝে গেছে ওধারে কে।
‘বলছি। …একটু বসো, এখনি আসছি।’
‘তাহলে তুমি তো…আমায় তো ভাবনায় রাখলে। পাঁচদিন আগে হসপিটাল থেকে দু—জন পালিয়েছে। তাদের একজন যদি শোভু হয়, তাহলে ইতিমধ্যে কলকাতায় এসে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু চিনে তোমার ওখানে গেল কী করে? ঠিকানাটা পেল কোথা থেকে?’
গঙ্গাপ্রসাদের মতো রোহিণীও জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল। কারোর কাছেই উত্তর জানা নেই। রোহিণী ঝোলাটা কাঁধে চড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আমি এখন আসি।’
‘তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পার, কিংবা বাসুদেবপুরে। সাক্ষী দেবার সময় তুমি যেসব কথা বলেছিলে, আর তাইতে ও যেভাবে রিঅ্যাক্ট করে, সেটা আমিও লক্ষ করেছি। এখন তোমাকে সেফটির কথা ভাবতে হবে।
‘আমার উপরে একজন পালোয়ান থাকে। চিৎকার শুনলেই তিন লাফে হাজির হয়ে যাবে।’
‘ভোলা সাউকে কি তোমার সঙ্গে দেব আজ রাতের জন্য?’
‘না না ওসবের দরকার নেই। ওখানে দারোয়ানের একটা লোহার রড আছে দেখেছি, সেটা চেয়ে নেব। দরজা খোলার আগে দেখে নেব লোকটা কে! যদি ও হয়, তাহলে খুলবই না।’
রোহিণী বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে, গঙ্গাপ্রসাদ ডাকলেন, ‘একটা কথা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো, শোভুর কোনো সম্পত্তি আর নেই। না বাড়ি, না ব্যাঙ্ক ব্যালান্স, না ছবিটবি।’
‘আমি তো বলেই দিয়েছি, ওর একটা কানাকড়িও আমি ছোঁব না। শুধু একটাই বলার ছিল, যদি বিয়ের আগে জানতাম’—রোহিণী বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বন্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গঙ্গাপ্রসাদের মুখ বিকৃত হয়ে উঠল।
আলমারি ঘেরা অফিসের জায়গাটায় একটা চেয়ারে রাজেন বসে। রোহিণীকে দেখে উঠে পড়ল।
‘হয়ে গেছে, চলো। গাড়ি এনেছ?’
‘হ্যাঁ।’
ওরা বেরোচ্ছে, তখন কমলের সঙ্গে দেখা।
‘এখন কেমন আছে?’
‘ভালোই। কাল কী পরশু ছেড়ে দেবে।’
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রোহিণী বলল, ‘বাসের ধাক্কা খেয়ে কাল ওঁর ছেলের পাঁজরের তিনটে হাড় ভেঙেছে। ছেলেটি ইংরেজিতে এম এ পড়ছে। উনি এখানকার বেয়ারা। ইলিশ মাছ উনিই বাজার থেকে সকালে এনে দিয়েছেন।’
রোহিণীর মন্থর স্বরে শ্রান্তির রেশ। রাজেন আড়চোখে মুখের দিকে তাকাল। কিছু একটা সিরিয়াস ধরনের ব্যাপার যে ঘটেছে, সেটা বুঝতে পারছে। সে কথা বলল না।
একটু দূরে গলির মধ্যে গাড়িটা রাখা। কালো শরীরের, একত্রিশ বছরের পুরোনো হিলম্যান। বহু জায়গায় রংচটা, সামনের একটা মাডগার্ড তোবড়ানো। পিছনের দরজার একটায় দড়ি বাঁধা। এঞ্জিন, চারটে চাকা, ব্রেক ও হর্ন ছাড়া হিলম্যানের বাকি অঙ্গ—প্রত্যঙ্গের উপর মালিকের নিয়ন্ত্রণের কোনো গ্যারান্টি নেই। রাজেন ছাড়া আর কেউ এই গাড়ি চালাতে ভরসা করে না।
গাড়ির পিছনের সিটে পলিথিন মোড়া কয়েকটা পুঁটলি। সামনের দরজা খুলে সিটে বসার সময় রোহিণী ওগুলো দেখে বলল, ‘কী কিনলে?’
‘ক—টা ছোটোখাটো জিনিস, একটা টি—শার্ট, তোয়ালে, ব্লেড।’
রাজেন স্টার্ট দেবার জন্য চাবি ঘোরাল। কয়েকবার কঁকিয়ে উঠে হিলম্যান জানিয়ে দিল। সে অসুস্থ। রোহিণী সারাদিনে এই প্রথম হাসতে শুরু করল। প্রথমে নিঃশব্দে তারপর চাপা খুকখুক করে।
‘নামবো?’
কেন?
‘ঠেলতে হবে তো?’
‘সারাদিনই ওবিডিয়েন্ট ছিল। যেই তুমি উঠলে—’ বলতে বলতে বিব্রত রাজেন নামল। ‘কার্বুরেটরটায়…’। এঞ্জিনের বনেট তুলে সে ঝুঁকে পড়ল। একটু পরেই বনেট নামিয়ে হাতে পেট্রলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ফিরে এসে চাবি ঘোরাল। বারকয়েক কেশে নিয়ে হিলম্যান চলতে রাজি হল।
