‘না না বলুন।’ রোহিণী আগ্রহভরে বলল। তার উপরের ফ্ল্যাটের মহিলা সম্পর্কে জানার জন্য যে কৌতূহলটা চারাগাছের মতো গজিয়ে ছিল, সেটা এখন ডালপালা ছড়ানো একটা তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে। গঙ্গাদা যা বলছেন, তাতে তো দু—জনের কথার মধ্যে অনেক অসংগতি দেখা যাচ্ছে! দু—জনেই ষাটের উপর, এই বয়সে ইচ্ছে করে তথ্য বিকৃতি কেউ করে না। কিন্তু একজন অবশ্যই করছে। কিন্তু কেন?
‘না থাক, ওটা খুব জরুরি কিছু বলার কথা নয়।’
‘সেক্সুয়াল কিছু কি?’
‘ওইরকমই। মুখটা আবছা অন্ধকার মাখানো, শরীরের ভঙ্গিতে মনে হয়েছিল রিল্যাক্সড অবস্থায় কিছু একটা যেন এনজয় করছে। যাকগে…আমাদের যা কথা হচ্ছিল, কী যেন বলছিলাম?’
‘শোভনেশ ছবির অ্যালবাম চেয়ে এনে স্ট্যাডি করত, কপি করত।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ…একদিন বেদারস নামের অ্যালবামটা খুঁজে পেল না। চেয়ে আনা পরের জিনিস, দুষ্প্রাপ্যও। খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে নীচে এল। সুজাতা স্টুডিয়োতে আসে, হয়তো সেই নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, এই ভেবেই শোভু গিয়েছিল। ওদের ঘরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়ায়। বালথাসের ছবিটার মতোই ঘরটা আধো অন্ধকার, শুধু জানলাটা দিয়ে আলো এসে পড়েছে খাটে, আর সুজাতা ঠিক সেই ন্যুড মেয়েটার মতো বালিশে পিঠ দিয়ে আধবসা অবস্থায়, মাথা পিছনে হেলিয়ে ঘরের সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে। বাঁ হাতটা ঝুলছে খাট থেকে। ডান হাঁটুটা মুড়ে উঁচু করা। তবে সুজাতার শরীর একটা চাদরে ঢাকা ছিল।
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে অন্তত মিনিট পাঁচেক ধরে সে তাকিয়েছিল। তখন মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটে যায়।’
‘কী ঘটে?’
‘সেটা আর ব্যাখ্যা করে আমায় বলেনি। শুধু বলেছিল, ‘এই ঘরটাকেই যেন বালথাসের রুম মনে হল।’ অ্যালবামটার কথা জিজ্ঞাসা করতে সুজাতা বলল, ‘হ্যাঁ সে নিয়ে এসেছে। বালিশের নীচে রয়েছে, শোভু বার করে নিক। তার নিজের উঠে বার করে দেবার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা না থাকার কারণ, স্বামী এমন বেধড়ক পিটিয়েছে যে, নড়ে বসার জোরটুকুও আর নেই।’
রোহিণীর মুখ থেকে একটা শব্দ বেরোল আঁতকে ওঠার মতো। ‘বলেন কী। লোকটাকে যতটা দেখেছি, তাতে তো খুব শান্ত, ভীরু ভীরু মনে হয়েছে।’
‘এই ধরনের লোকেরা শান্তশিষ্ট মার্কাই হয়। জেলাসি থেকেই এই হিংস্রতা। পছন্দ করত না সুন্দরী বউ একটা সুদর্শন ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করুক বা কথা বলুক। অন্তত হৃদয়রঞ্জনের থেকে শোভু অনেক আকর্ষণীয় ছিল। অনেকবারই এই নিয়ে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে, লোকটা চড়চাপড়ও মেরেছে, কিন্তু বউ জেদ ধরেই স্বামীকে অগ্রাহ্য করে ওপরে গেছে। এরপর ঘরে অ্যালবামটা দেখেই লোকটা ক্ষেপে যায়। ওইরকম সব ছবি যে—মেয়েছেলে দেখে, তার তো চরিত্র বলে কিছুই নেই, সে তো সন্ধেবেলায় মুখে রং মেখে বউবাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটও খেতে পারে। শুরু হয় তর্কাতর্কি, তারপর লাঠি দিয়ে পেটানো।
‘সুজাতা গলা থেকে চাদর নামিয়ে শোভুকে দেখায়, তখন ওর ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো বস্ত্র ছিল না, মারের দাগড়া দাগড়া দাগ থেকে বোঝা যাচ্ছিল, কী ভয়ংকর বীভৎস রাগে লোকটা জ্বলছিল। দেখতে দেখতে শোভুর ব্রেইনে শর্ট সার্কিট হয়ে সে হঠাৎ সব অন্ধকার দেখতে থাকে।
‘আমাকে ও বলেছিল, ‘ইলেকট্রিক বালব ফিউজ হবার সময় যেরকম একটা শব্দ হয়, ঠিক সেইরকম যেন একটা শব্দ মাথার মধ্যে হল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, অবশেষে আমিই তাহলে পাগল হলাম।’ সেই অবস্থাতেই ও সুজাতাকে বলে, ‘ঠিক এইভাবে হেলান দিয়ে শোয়া তোমার ছবি আঁকব, পাগল হয়ে যাবার আগে।’
‘দিন সাতেক পর থেকে সুজাতা দোতলার স্টুডিয়োতে সিটিং দিতে শুরু করে।’ গঙ্গাপ্রসাদ কথা থামিয়ে রোহিণীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে যোগ করলেন, ‘ন্যুড হয়ে।’
দপ করে রোহিণীর চোখের উপর ভেসে উঠল ষাট বছরের এক মিষ্টি শান্ত মহিলার মুখ। আশ্চর্য। কে বলবে উনি চল্লিশ বছর আগে এমন দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন।
‘স্বামীকে উপেক্ষা জানাবার জন্যই বোধহয়।’
‘তার থেকেও বেশি, ঘৃণা প্রকাশের জন্য। শোভুর মনে একটা বিশ্বাস তারপর বদ্ধমূল হয়ে যায়। সে যে পাগল হল না তার কারণ, ন্যুড মেয়ের ছবি আঁকার জন্য। ওর মনে হল এটা একটা তুক। নিজেকে রক্ষা করার জন্য এটা তাকে করে যেতেই হবে।
‘ওরা পাগলের বংশ এ কথাটা ঠিক নয়। সুজাতাই বোধ হয় তোমাকে বলেছে। কিন্তু ওকে এই ধারণাটা সম্ভবত শোভুই দিয়েছিল এই বলে যে, সে পাগল হয়ে যাচ্ছিল শরীরে ওইরকম অত্যাচারের নমুনা দেখে। আমাকেও তাই বলেছে। একটা ইন্সট্যান্ট রিয়্যাকশন থেকেই ও বলে ফেলে আর সেটাকেই কল্পনায় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সুজাতা গুপ্তর মনে হয়েছে পাগলের বংশ! ক্র্যাপ, ব্লাডি ট্র্যাশ, মিথ্যাবাদী।’
‘ওঁর ক—টা ছবি শোভনেশ এঁকেছিল?’
‘ওই একটাই, কেননা স্বামী জানতে পেরে যায়। একদিন সকালে লোকটি উপরে স্টুডিয়োয় এসে বউয়ের ওইরকম ছবি দেখে ক্যানভ্যাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফ্রেম ভেঙে ফেলে ছবিটাকে দু—পায়ে মাড়িয়ে শেষকালে শোভুকে অ্যাটাক করে। আমার বাড়িতে নিত্য নামে একজনকে তুমি বোধ হয় দেখেছ, মনে আছে কি?’
‘হ্যাঁ, খুব রোগা, টাক মাথা, কথা একটু বেশি বলে।’
‘এখন বাসুদেবপুরে থাকে। বাড়ি জমিজমা সব ওর জিম্মেতেই রয়েছে, চোর নয়। বাচ্চচা বয়স থেকে শোভুদের বাড়িতে চাকর ছিল। অবস্থা পড়ে যেতে ওরা ছাড়িয়ে দেয়, আমি নিয়ে আসি। বনেদি বাড়ির পুরোনো লোকজন এক রেয়ার অ্যান্টিক, সাজিয়ে রাখার জিনিস। তা সুজাতার স্বামী যখন পেপার ওয়েট দিয়ে শোভুকে মারতে যায় তখন নিত্য ওখানে ছিল, সে—ই হাতটা চেপে ধরে, ঠেলে ঘর থেকে বার করে দেয়। এর দু—মাসের মধ্যেই লোকটা অফিসের ট্রান্সফার নিয়ে কোথায় যেন বউ নিয়ে চলে যায়।’
