‘কথা বলছ না যে?’
‘আমার উপরের ফ্ল্যাটে একজন মহিলা থাকেন, যিনি একসময় দিগম্বর বর্ধন লেনের ওই বাড়ির একতলায় ভাড়া ছিলেন। তিনিই আজ আমায় বলেছেন।’
গঙ্গাপ্রসাদ চোখের চাহনি ত্যারচা করে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিলেন।
‘বুঝেছি। ওদের একতলায় হাজব্যান্ড—ওয়াইফের একটা ফ্যামিলি ছিল। বউটি সুন্দরী, শোভুরই বয়সি। আশ্চর্য, তিনিই এখন কিনা তোমার উপরের ফ্ল্যাটে! কী অদ্ভুত ব্যাপার। কিন্তু ওরা বাড়ি ছেড়ে উঠে গেল কেন?’
‘ওঁর স্বামী বদলি হলেন, তাই বাসা ছেড়ে দেন।’
বিন্দু বিন্দু হাসি গঙ্গাপ্রসাদের ঠোঁটের কসে জমে উঠল। তারপর ঠোঁটটা চওড়া করে সারা মুখে ছড়িয়ে দিয়ে দু—হাতের আঙুলের মধ্যে আঙুল জড়িয়ে নিলেন।
‘তাই বলেছে বুঝি?’
রোহিণী একটু অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তাই তো বললেন।’
‘মিথ্যেবাদী।’ গঙ্গাপ্রসাদ একটা খুদে আগ্নেয়গিরির মতো হয়ে, জ্বালামুখ থেকে লাভাস্রোত বার করলেন। ‘সী ইজ এ লায়ার। চল্লিশ—বিয়াল্লিশ বছর পরও কিনা মিথ্যা কথা বলছে! শোভনেশের আজকের এই অবস্থার জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তাহলে ও—ই সেই লোক, যার থেকে এই মার্ডারের প্রথম সূত্রপাত।’
.
রোহিণীকে এখন যদি কেউ বলে, কাল থেকে কলকাতার ফুটপাথে একটিও হকার বসবে না, রাস্তাগুলোয় একটিও খানাখন্দ, ঢিপি থাকবে না, হাওড়া ও শেয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেন কাঁটায় কাঁটায় সঠিক সময়ে ছাড়বে এবং পৌঁছবে, সে বিশ্বাস করতে রাজি। এমনকী যদি তাকে বলা হয়, গাওস্করের সব ব্যাটিং রেকর্ড রাজেন ভেঙে দেবে, তাও সে বিশ্বাস করবে। কিন্তু গঙ্গাপ্রসাদ যা বললেন, তার তো কোনো মাথামুণ্ডু সে হদিশ করতে পারছে না।
‘কী বলছেন গঙ্গাদা! কী শান্ত নিরীহ ভদ্রমহিলা, এই বয়সেও কী সুন্দরী, মার্জিত, পরিপাটি ব্যবহার, আর আপনি বলছেন মার্ডারের পিছনে এঁর হাত রয়েছে? কীভাবে সম্ভব?’
‘মেয়েদের শরীরের প্রতি শোভনেশের যে ঝোঁক, যে আগ্রহ, যে দুর্বলতা, যেটা ওকে ন্যুড স্টাডির দিকে টেনে নেয়, যেটা ওকে মেয়েদের দেহ সম্পর্কে বাতিকগ্রস্ত করে তোলে, আর তারই ফলে মডেলের সঙ্গে নানারকম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, ইনভলভমেন্ট, সবশেষে যা কালমিনেট করে মার্ডারে, এর গোড়াপত্তন ওই তোমার উপরের মহিলাটি থেকেই। কী নাম ওঁর?’
‘জানি না। তবে ওরাও বদ্যি।’
‘ওঁর নাম সুজাতা গুপ্ত, ওঁর স্বামীর নাম হৃদয়রঞ্জন গুপ্ত। লোকটি স্ত্রীর মতোই ছোটোখাটো, বেঁটে, কিন্তু গায়ের রং স্ত্রীর বিপরীত, ঘোর কালো আর ডান পা—টা ছোটো একটু, খুঁড়িয়ে হাঁটেন।’
রোহিণীর শিরদাঁড়া বেয়ে সিরসিরানিটা চেয়ারে পৌঁছল। অবিশ্বাস্য বলে কোনো শব্দ যে এই গ্রহের কোনো অভিধানে আছে, আর সে তা মানতে পারছে না। এখন সে বিশ্বাস করতে রাজি, তুলে দেওয়া হকাররা আবার ফুটপাতে ফিরে আসবে না বা বিনা টিকিটে কেউ লোকাল ট্রেনে উঠবে না। গঙ্গাদা যা বললেন, ঠিক ওইরকমই মিশকালো, সামান্য খোঁড়া, নিরীহদর্শন এক বেঁটে লোককে সে কয়েকবার তাদের বাড়ির সিঁড়িতে দেখেছে।
‘এই পরিবারের সঙ্গে শোভুর খুবই হৃদ্যতা হয়, বিশেষ করে সুজাতার সঙ্গে। ভিজে কাপড় মেলা বা তোলার ছল করে উনি দিনে দু—তিনবার উপরে যেতেন। শোভুর আঁকার ঘরে, পরে যেটাকে ও স্টুডিয়ো বলত, সেখানে উনি গিয়ে গল্পটল্প করতেন। শোভুও ওদের ঘরে যেত। উনি প্রায়ই আবদার ধরতেন, ওঁর একটা ছবি এঁকে দেবার জন্য। ওঁর কয়েকটা পোর্ট্রেট স্কেচও করেছিল। সেগুলো অবশ্য ওঁকে দিয়ে দেয়। কিন্তু উনি চান ফুল ফিগারের ছবি, ক্যানভাসে। শোভু করছি করব বলে এড়িয়ে যাচ্ছিল। একদিন নীচে ওদের ঘরে গিয়ে সে সুজাতাকে—’
টেলিফোন বেজে উঠেছে।
‘হ্যাঁ বলছি, আচ্ছা ঠিক আছে, এখন আমি ব্যস্ত, পরে কথা বলব।’
রিসিভার রেখে গঙ্গাপ্রসাদ বললেন, ‘অত বছর আগের কথা, শোভু আমায় যা বলেছিল, তাই বলছি। ও তো ভালো করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, খাপছাড়াভাবে বলেছিল। আমারও এখন সব মনে নেই।’
গঙ্গাপ্রসাদ কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে থেকে বললেন, ‘শোভুর তখন সবে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু ছবিই তখন ধ্যানজ্ঞান। নামকরা মাস্টারদের ছবির অ্যালবাম এখান—ওখান থেকে চেয়ে এনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্টাডি করত, কপি করত। একটা কালেকশন এনেছিল, যাতে শুধুই মেয়েদের চান করার ছবি। নাম ছিল ‘বেদারস’। পৃথিবীর বিখ্যাত দশজনের আঁকা আঠারোটা ছবি। সবই ন্যুড, সেমি ন্যুড।
‘আর একটা অ্যালবাম ওর কাছে ছিল, নাম ‘রিক্লাইনিং উওম্যান’। বিছানায়, সোফায়, ডিভানে নানা ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে শোয়া ন্যুড মেয়েদের ছবি। অয়েলে পেনসিলে প্যাস্টেলে আঁকা। এতে ফ্রেঞ্চ আর্টিস্ট বালথাসের আঁকা একটা ছবি, নাম ‘দ্য রুম’ শোভুকে খুব আকর্ষণ করে। আমি ছবিটা দেখেছি। একটা ন্যুড মেয়ে ডিভানে চিত হয়ে হেলান দিয়ে, ডান পা মেঝেয় লম্বা করে ছড়ানো, হাঁটু মুড়ে বাঁ পা—টা ডিভানে উঁচু করে তোলা, ডান হাতটা আলগাভাবে ঝুলে রয়েছে, তার মাথাটা বোধ হয়…যতদূর মনে পড়ছে, পিছনদিকে করা, মুখটা সিলিংয়ের দিকে তোলা, কিংবা মুখটা সম্ভবত ডানদিকে ফেরানো…ঠিক মনে করতে পারছি না। ঘরের বিরাট উঁচু জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বেঁটে বামনাকৃতির মেয়ে, মুখটা তেকোনা। প্রখর আলো জানলা দিয়ে এসে পড়েছে ন্যুড ফিগারটার উপর। ঘরের অন্ধকার কোণে টুলের উপর বসে আছে একটা কালো বেড়াল। ছবিটা অয়েলে আঁকা। ভীষণভাবে শোভুকে তখন ছেঁকে ধরেছিল চিন্তাটা, এইরকম একটা ছবি তাকে আঁকতেই হবে। আমায় বলেছিল, দিনরাত ছবিটা হন্ট করছে, রাতে ঘুমোতে পারি না। জিজ্ঞাসা করত, মেয়েটা ডেড না অ্যালাইভ, তোর কী মনে হয়? আমার কিন্তু মনে হয়েছিল…থাক তোমাকে তা আর বলা যায় না।’
