‘কে এখন কলকাতায়?’ গঙ্গাপ্রসাদের কৌতূহলী এবং চমকিত অভিব্যক্তি একই সঙ্গে প্রকাশ হল। ‘কে খুঁজতে গেছিল, শোভু?’
রোহিণী শুধু মাথাটা ঝোঁকাল।
‘সেকি!’ ভারী শরীরটা টেনে তুলে টেবলে ঝুঁকে পড়লেন। ‘তোমার ফ্ল্যাটে? তুমি ঠিক বলছ?’
রোহিণী চুপ করে রইল। ভাবহীন দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ গঙ্গাপ্রসাদের মুখে। নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে কী যেন আলোচনা সেরে নেওয়ায় মগ্ন।
‘তুমি তো তখন ছিলে না ফ্ল্যাটে!’
‘নতুন একটা কাজের মেয়ে রেখেছিলাম। সে ছিল।’
‘রেখেছিলাম মানে? এখন কি আর সে নেই?’
রোহিণী মাথা নাড়ল।
‘বরখাস্ত করেছ? কেন?’
রোহিণী চুপ। সে ঠিকই করে ফেলেছে, বেশি কথা আর বলবে না। নিজের সম্পর্কে কোনো খবর আর কাউকে জানাবে না। অন্যদের খবর এবার থেকে সে নেবে। সেজন্য মিথ্যা কথা বলতে হলেও বলবে।
‘সে কী বলল তোমায়? শোভু তাকে কী বলেছে?’
গঙ্গাপ্রসাদ টেবলে একটা চড় বসালেন, তাঁর কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত, প্রায়—চিৎকারের মতো একটা আওয়াজ গলা থেকে বার করে। তাঁর চোখে রাগের ছায়া, নাক ফুলে উঠেছে।
‘শোভনেশ বলেছে আবার আসবে।’
‘কেন? তোমার সঙ্গে কী সম্পর্ক আর? তোমার কাছে এসে কী লাভ?’
‘তা আমি জানি না, তবে আসবে। হয়তো কোনো দরকার আছে।’
‘কী দরকার, তোমার সঙ্গে তার কী দরকার? টাকাপয়সা চাইবে? কিন্তু ওর তো কোনো টাকা নেই, সম্পত্তিও নেই। বাড়িটা একজনের কাছে মর্টগেজ ছিল, তোমাদের বিয়েরও আগে থেকে। খেতে পেত না, ছবিটবি কী আর এমন বিক্রি হত? তোমরা ভাব, আর্টিস্টরা লক্ষ লক্ষ টাকা ছবির বিক্রি থেকে পায়। আরে, সে তো এই ছ—সাত বছর হল পাচ্ছে। তাও ভারতে মাত্র কয়েকজনই টাকা করেছে। শোভুর ছবি সবেমাত্র বাজার পাচ্ছে আর তখনই ও কাণ্ডটা করল। তার আগে ইলেকট্রিক বিল, বাড়ির ট্যাক্স বহুবার আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গিয়ে দিয়েছে। পুরোনো আমলের সব ভাড়াটে, ভাড়াও ছিল সামান্য, আট—দশ মাস করে ভাড়া ফেলে রাখত, ঠিকমতো দিত না, তাই দিয়ে শুধু ভাতে ভাত খেয়ে চলত। ঝি—চাকর পর্যন্ত ছিল না। তিন পুরুষ ধরে গড়িয়ে গড়িয়ে কুঁজোর জল খেলে কিছু কী আর থাকে? একটা ফোঁটাও আর ছিল না। …আমাকে বলেছিল, ‘তোর ম্যাগাজিনের জন্য কিছু কাজ আমাকে দিয়ে করা। টাকার খুব দরকার।’ করিয়েছিলাম…অচল অচল, ম্যাগাজিনের পক্ষে অচল।’
‘ব্যাঙ্কে ওর টাকা ছিল।’
‘ছিল, হাজার সতেরো। কোর্টে দরখাস্ত করে আমি ম্যান্ডেট হোল্ডার হই ওরই অনুরোধে। ও তখন জুডিসিয়াল কাস্টডিতে। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে করাতে, তাইতে ও প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিল। কী বলেছিল জান?’
‘না।’
‘রোহিণীকে ভালো চিনি না, বুঝি না। ও বাইরের লোক, অল্পদিনের আলাপ। তুই আমার বহুকালের বন্ধু, বহুকালের চেনা। আমি তোর ওপরই নির্ভর করি। এই হচ্ছে শোভনেশ, তোমার স্বামী! ব্যাঙ্কের টাকা মামলার জন্য উকিলকে দিয়েছি, আমি নিজেও অনেক টাকা খরচ করেছি। পাইপয়সা হিসেব রেখে দিয়েছি। যখন ওর ট্রায়াল চলছে, তুমি তখন দিগম্বর বর্ধন লেনের বাড়িতেই। কী করে তোমার থাকা—খাওয়া চলত, তার খোঁজ কি কখনো নিয়েছে?’
.
‘আমার ধারণা ছিল, শোভনেশের ব্যাঙ্কের টাকা আর ছবি বিক্রির টাকা—।’ রোহিণী ইচ্ছে করেই বাক্য অসম্পূর্ণ রাখল। তার বদলে সে নজরটা তীক্ষ্ন করে গঙ্গাপ্রসাদের হাবভাব লক্ষ করার কাজ শুরু করল।
‘ছবি! ছবিগুলো?’ ঝুঁকে গঙ্গাপ্রসাদ টেবলে বুক ঠেকালেন। যেন হামাগুড়ি দিয়ে ওধারে যাবেন। ‘ছবি কোথায় দেখলে?’
‘অনেক ছবি তো স্তূপ হয়ে ওর স্টুডিয়োতে পড়েছিল দেখেছি। প্রায় চল্লিশ—পঞ্চাশটার মতো, নানান সাইজের। একদিন তো আপনি খানচারেক নিয়েও গেলেন, বললেন মামলার খরচ তোলার জন্য বিক্রির চেষ্টা করবেন।’ অত্যন্ত নিরীহ, অনুগত কণ্ঠে, যাতে গঙ্গাপ্রসাদ আহত না হন, এমন ভঙ্গিতে রোহিণী বলল।
কিন্তু গঙ্গাপ্রসাদের মুখের ভাব নিমেষে বদলে থমথমে হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড রোহিণীর মুখের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তুমি কি শোভনেশের বিষয়—আশয় নিয়ে দাবি জানাচ্ছ?’
‘না না গঙ্গাদা, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমার কোনো লোভ নেই, আমি ওর একটা জিনিসও পেতে চাই না, ছুঁতেও চাই না।’
‘তাহলে আজ এসব কথা উঠছে কেন? ব্যাঙ্কের টাকা, ছবি বিক্রির টাকা, এসব কি তুমি এখন বলোনি?’
‘কথার পিঠে কথায় বলে ফেলেছি।’
‘যে ছবিগুলো স্তূপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিলে, সেগুলির কী হাল হয়েছিল জান? পোকায় কেটে, ভাঙা জানলা দিয়ে বৃষ্টির জল এসে, তার একটারও আর টাঙাবার মতো অবস্থা ছিল না। পাঁচটা পয়সা দিয়েও কেউ তা কিনত না।’
ঘরে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা বিরাজ করল। রোহিণী মাথা নামিয়ে, গঙ্গাপ্রসাদ সিলিংয়ের দিকে মুখে তুলে।
‘শোভু আবার আসবে, হয়তো আশ্রয় কিংবা টাকা চাইবে। কী করবে তখন?’
‘গঙ্গাদা, এসব কিছুই হত না যদি বিয়ে না হত। আপনি যদি তখন আমাকে একবারও বলতেন—।’
‘কী বলতাম?’
‘ওদের পাগলের বংশ।’
‘তোমায় কে বলল?’
‘গত চার পুরুষ ধরে কেউ—না—কেউ পাগল হয়েছে ওদের বংশে।’
‘কে বলল তোমায়?’ গঙ্গাপ্রসাদ টেবলে চড় মেরে ধমকে উঠলেন। ‘এসব তো আমার কাছে নতুন কথা।’
রোহিণী বলতে যাচ্ছিল, সেদিন আপনার মুখ থেকেই কথাটা বেরিয়ে এসেছিল; ‘পাগলের বংশ তো, দেখো, হয়তো গোয়াবাগান থেকে মোমিনপুর পর্যন্ত বোশেখ মাসে হেঁটে আসতে কেমন লাগে বোঝার জন্য হয়তো—নাও অপেক্ষা করে লাভ নেই, আমরা খেতে বসে যাই।’ কিন্তু সে ঠিক করে ফেলেছে, বেশি কথা আর বলবে না। অন্যদের খবরই এবার থেকে নেবে নিজেকে আড়াল করে।
