‘মীনার?’
‘না না অন্য কারোর।’
‘আহহ।’ প্রশান্ত হালদারের সিধে হয়ে যাওয়া শিরদাঁড়াটা আবার চেয়ারে, পিঠে নেতিয়ে পড়ল। ‘মীনার হলে ছবি তুলিয়ে এনে ছাপতুম।’
‘গঙ্গাদা কখন আসবেন বলেছেন কিছু?’
‘সময় তো হয়ে গেছে। খুবই ব্যস্ত এখন। আর একটা অফসেট ছাপার মেসিন কেনা হচ্ছে, বেলেঘাটার বাড়ি কমপ্লিট হলেই আসবে। তখন আমাদের সবাইকেই ওখানে চলে যেতে হবে। তা ছাড়া ম্যাগাজিনগুলোকে ট্রেন্ডি, ক্যাচি, আপবিট করারও তোড়জোড় হচ্ছে। নতুন ডিজাইনে মহারানি, চিত্ররেখা বেরোবে। অনেক ফিচার উঠে যাবে, নতুন নতুন ফিচার আসবে। গঙ্গাবাবু এজন্য বোম্বাইয়ের এক ডিজাইনিং কনসালট্যান্টের ওপর ভার দেবেন ঠিক করেছেন, কেন তুমি এসব শোননি?’
‘না তো! কবে ঠিক হল?’
‘গত হপ্তায় আমাকে বলেছেন।’
টেবিলের ওধারে একজোড়া বিস্মিত চোখ। রোহিণী অপ্রতিভ বোধ করল। সবাই জানে, সে গঙ্গাপ্রসাদের কাছের লোক, ভিতরের খবরাখবর জানে। কিন্তু গঙ্গাদা এইসব পরিকল্পনার কিছুই তাকে বলেননি। এটা গোপন রাখার মতো একটা ব্যাপার কী? হঠাৎ তার মনে হল; শোভনেশ সম্পর্কেও অনেক কথা উনি লুকিয়েছেন, যা বিয়ের আগেই জানালে আজ এই দশা তার হত না।
ফোন বেজে উঠল। রিসিভার কানে দিয়েই প্রশান্ত হালদার সেটা রোহিণীর দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘তোমার।’
‘হ্যালো।’
‘কখন বেরোবে?’
‘পাঁচটায়।’
‘মাছটা ততক্ষণে যদি বেড়াল—টেড়ালে খেয়ে ফেলে?’
‘খাবে না। ঠিক পাঁচটায়।’
‘যদি পৌনে ছ—টায় যাই?’
‘ঠিক পাঁচটায়।’ রোহিণী রিসিভার এগিয়ে দিল চিঠি পড়ায় মগ্ন প্রশান্ত হালদারের দিকে। তিনি হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বিপ্লব আসেনি, বোম্বে থেকে যে কপি এসেছে সেগুলো দ্যাখো আর ছবির ক্যাপসন করে দাও।’
আধঘণ্টা পর গঙ্গাপ্রসাদ এলেন এবং প্রশান্ত হালদারকে ডেকে পাঠালেন। মিনিট পাঁচেক পর তিনি ফিরে এসে রোহিণীকে জানালেন, ‘তোমাকে ডেকেছেন।’
দুই তালুতে গাল চেপে একদৃষ্টে টেবলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন গঙ্গাপ্রসাদ। রোহিণী চেয়ারে বসল উৎকণ্ঠা নিয়ে। রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে যে খবর নিয়ে এসেছেন, সেটাই বলার জন্য ডেকেছেন। মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভালো খবর নয়। আশঙ্কায় তার বুক ঢিপ ঢিপ করে উঠল।
‘বহরমপুরে আমার এক চেনা ব্যবসায়ী বন্ধু আছে। আজ সকালে বাসুদেবপুর থেকে ফিরেই তাকে ট্রাঙ্ককল করেছিলাম। ওখানে ভীষণ টেনশান এখন। কম্যুনাল ব্যাপার। কুড়ি—পঁচিশজন মারা গেছে, ই এফ আর, স্টেট আর্ম পুলিশ নেমেছে। লালগোলা, ভগবানগোলা, কাশিমবাজার, নসিপুর স্টেশনেও দাঙ্গা হয়েছে। পুলিশ এখন ভীষণ ব্যস্ত, কোনোদিকে তাদের নজর রাখার ফুরসতই নেই। ব্যাপারটা যেকোনো লেভেলে গেছে, কাগজ পড়ে তা বোঝা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে যদি কেউ জেল থেকে পালায়—খুবই সম্ভব পালানো। বলেছে, খোঁজ নিয়ে আমাকে বিকেলেই জানাবে। আমি ফোনের জন্য অপেক্ষা করছি।’
গঙ্গাপ্রসাদ ঘড়ি দেখলেন, ভ্রূ কোঁচকালেন। তারপর আবার বললেন, ‘রাইটার্সেও ব্যস্ত সবাই। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে এক আন্ডারট্রায়াল আসামি পালিয়েছে। দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে তো আটজন নকশাল পালিয়েছিল, তারপর এইসব ঘটনা। আবার এদিকে আলিপুর জেলের সুপারকে ঘেরাও করেছে কর্মচারীরা, তাই নিয়ে হই হই। জেল গেটে ডিউটি দেয় এক খুনের আসামি, সে নাকি বাইরে থেকে খবরাখবর চালান করে ভেতরে, তাকে সরাবার দাবি নিয়েই ঘেরাও। লালবাজার থেকে অ্যাডিশনাল ফোর্স গেছে। জেল মন্ত্রী, আই জি প্রিজন্স, হোম সেক্রেটারি আলোচনায় বসেছে, এর মধ্যে কে আর বহরমপুর জেল থেকে পালানোর খবর দেবে?’
গঙ্গাপ্রসাদ ও রোহিণী পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল। কারোরই আর কিছু যেন বলার নেই। অবশেষে দু—জনে চোখ সরিয়ে নিল।
ফোন বেজে উঠল। গঙ্গাপ্রসাদ ব্যস্ত হাতে রিসিভার তুললেন, রোহিণীর মুখটা চট করে দেখে নিয়ে।
‘হ্যালো, কে নির্মল?’ গঙ্গাপ্রসাদ ঘাড় নাড়লেন কাঠ হয়ে যাওয়া রোহিণীর দিকে তাকিয়ে।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ শোভনেশ সেনগুপ্ত…অ, অ, হ্যাঁ…হসপিটাল থেকে? সে কি নাম বলতে পারছে না? তাই কখনো হয়…দু—জন একসঙ্গে? পুলিশ পাহারা কি ছিল না?…কখন পালায়?…সন্ধেবেলা…কত তারিখে? য়্যাঁ সে তো পাঁচদিন আগে। তুমি কি আর একটু ডিটেইল খোঁজ নেবে? চেহারা, বয়স, নাম, কী অসুখ, কতদিন জেলে রয়েছে…কেউ মুখ খুলছে না? খুলবে খুলবে, সিলভার টনিক খাওয়াও…হ্যাঁ, খুব দরকার আমার, খুবই…হ্যাঁ বাড়িতে থাকব।…আচ্ছা, আচ্ছা, ও ও ও কে এ এ।’
রিসিভার রেখে দিয়ে তিনি শুধু তাকিয়ে রইলেন রোহিণীর দিকে। ভাবখানা, সবই তো শুনলে।
‘হসপিটাল আর দু—জন, তার মানে?’
‘দু—জন কয়েদিকে হসপিটালে ভরতি করা হয়েছিল। দু—জনেই লাইফার, দু—জনেই একসঙ্গে পালিয়েছে। খবরটা চেপে যেতে চাইছে বলে নাম জানাচ্ছে না, অস্বীকার করছে।’
‘পাঁচ দিন আগে পালিয়েছে?’
গঙ্গাপ্রসাদ সচকিত হলেন। সর্দিতে গলা বসে যাওয়া বা তীব্র চিৎকারের শেষ প্রান্তে এসে দম ফুরিয়ে যাওয়ার মতো ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর। মুখের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য এই দু—তিন মিনিটের মধ্যেই বসে গেছে। তাঁকে তৃষ্ণার্ত, অভুক্ত এবং পরিশ্রান্ত লোকের মতো দেখাচ্ছে।
‘ও এখন কলকাতায়। কাল দুপুরে আমাকে খুঁজতে গেছিল।’
