‘চঞ্চলা আর আসেনি?’
‘না তো, কেন?’
‘আন্টি, আমি কিন্তু ওকে ভয় দেখাইনি। ও বললেও তা বিশ্বাস করবেন না।’ নন্দার কাতর আবেদনভরা মুখটির দিকে তাকিয়ে রোহিণী অবাক হল।
‘ও হয়তো তাই বলবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, লোকটাকে দেখে আমিও ভয় পেয়ে গেছিলাম।’
‘কে লোকটা? কীরকম দেখতে?’
‘খুব লম্বা, রোগা, আর ইয়া ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা চুলদাড়ি, ভুরুটাও পাকা, ইয়া লম্বা জুলপি, সরু সরু চোখ দুটো দেখলে ভয় করে, যেন জ্বলছে!’
‘কোথায় লোকটা?’ রোহিণী প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। এ তো শোভনেশ!
‘জানি না। আমি ম্যাকসিটা পরে নীচে সংঘমিত্রাকে দেখাতে গেছিলাম। তখন ওদের জানলা দিয়ে দেখি, ওই লোকটা গেট দিয়ে ঢুকছে। ঢুকে এধার—ওধার কেমন যেন তাকাচ্ছে। কাঁধে একটা নানান কাপড়ের তাপ্পিমারা ঝোলা। তারপর উপরে গিয়ে আপনার কলিংবেল বাজালাম, কিন্তু দরজা আর খুলছে না। শেষে ধাক্কা দিয়ে ‘চঞ্চলা চঞ্চলা’ বলে নাম ধরে ডাকতে ও দরজা খুলল। দেখি, ভয়ে মুখ একদম ফ্যাকাসে।’
নন্দা যদি একটু ভালো করে নজর করত, তাহলে হয়তো বলত, আন্টি, ঠিক আপনার এখনকার মুখের মতো। কিন্তু বর্ণনাটা গুছিয়ে, শ্রোতার মনে দাগ কাটানোর চেষ্টায় তখন সে ব্যস্ত।
.
নন্দা ঢোঁক গিলে আবার শুরু করল, ‘প্রথমেই বলল, ছেলেধরা এসেছিল। আমি তো শুনে অবাক! জিজ্ঞাসা করলাম, কখন এসেছিল? বলল এইমাত্র। কলিংবেল টিপতেই দরজা খুললুম, দেখি, একটা ছেলেধরা কাঁধে ঝুলি নিয়ে দাঁড়িয়ে। লোকটা কটমট করে তাকিয়ে বলল, তুমি কে? এই বলে ভেতরে তাকিয়ে এধার—ওধার দেখতে লাগল। তারপর ঝুলি থেকে একটা কাগজ বার করে বিড়বিড় করে পড়ে বলল, ‘এটা কত নম্বর ফ্ল্যাট?’ চঞ্চলার তখন অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো অবস্থা। কথা বলতে পারছিল না। লোকটা তখন বলল, ‘এখানে কে আছেন, তাঁকে ডাকো।’ চঞ্চলা বলল, ‘কেউ নেই এখন, মাসিমা বেরিয়ে গেছে। আমি একা আছি।’ এই বলেই ও দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর আমি ওপর থেকে নীচ খুঁজলাম, কিন্তু লোকটা যেন হাওয়া হয়ে গেছে, কোথাও দেখতে পেলাম না। চঞ্চলা বলল ‘আমি আর এখানে থাকব না।’ আমি কত ওকে বোঝালাম, ছেলেধরাটরা সব বাজে কথা, ওরা দুপুরে এভাবে এসে ধরে না, আর ধরলেও তোকে ধরবে না। কিন্তু কে শোনে আর সে কথা, গোঁ ধরে রইল—’আন্টি, আপনার কি পায়ের যন্ত্রণাটা আবার হচ্ছে?’
‘না না আমি ঠিক আছি। তুমি আইসব্যাগটা বরং নিয়ে যাও।’
রোহিণীর মনে হচ্ছে, তার দুই হাঁটুতে বাত হয়েছে। সে বৃদ্ধা হয়ে গেছে। হাঁটাচলার ক্ষমতা রহিত। নন্দা ব্যাগটা নিয়ে চলে যেতেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কোনো সন্দেহ নেই লোকটা কে হতে পারে। কিন্তু কীভাবে জোগাড় করল তার এখানকার ঠিকানা?
যতই সে ভাবতে লাগল, তার ভয়টা ক্রমশ নিজের প্রতি রাগে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। কেন সে এই লোকটিকে বিয়ে করতে গেল? বোম্বাইয়ে দিদিকে টেলিফোনে যখন সে বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানায় তখন দিদি বারণ করে বলেছিল, ‘রুনি, আর্টিস্টরা সাংঘাতিক লোক, এদের বিশ্বাস করিসনি। এরা অন্য প্রকৃতির হয়, এরা আলাদা জগতের লোক। সত্যিমিথ্যে দিয়ে বানিয়ে বানিয়ে মনগড়া জিনিসকে আসল বলে চালায়, তাইতে বোকারা কনফিউজড হয়। তোরও সেই দশা হয়েছে। তুই ভুল করিসনি। তোর জন্য অনেক অনেক ভালো পাত্র পাওয়া যাবে, আমি জোগাড় করে দেব এখানে।’
দিদির কথা শুনলে আজ এই অবস্থা তার হত না। মা তখন বেঁচে। শুধু বলেছিলেন, ‘তোমার মন যা চায় তাই করো, তুমি এখন সাবালিকা।’ বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়ে যাবার তিন দিন পরই দিদি বোম্বাই থেকে সকালের ফ্লাইটে এসে মাকে নিয়ে রাতের ফ্লাইটেই ফিরে যায়। বিশেষ কোনো কথাবার্তা হয়নি। যাবার সময় শুধু বলে যায়, ‘চাকরিটা ছেড়ো না, ভবিষ্যতে এটাই তো সম্বল করে বাঁচতে হবে।’ শোভনেশের মামলার রায় বেরোতেই দিদি টেলিফোন করে বলেছিল, ‘যা বলেছিলাম সেটা এখন মিলিয়ে নে। রঞ্জন বলেছে, আর তোকে কলকাতায় থাকতে হবে না। প্লেনের টিকিট পাঠাচ্ছি, দু—হপ্তার মধ্যে এখানে পৌঁছচ্ছিস এটাই আমি দেখতে চাই।’ চাকরি আর ভাড়া বাড়ি ছেড়ে, গঙ্গাদার আপত্তি সত্ত্বেও, সে দিদির কাছে চলে গেছিল।
এক ঘণ্টা পর, আরামদায়ক রৌদ্রের মধ্যে তিন নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে মিনিবাসের জন্য যখন সে দাঁড়াল, তখন তার কাঁধ ঝুলে পড়েছে, মাথা সামান্য ঝোঁকানো, ঝোলটার একটা কোণ শক্ত মুঠিতে ধরা আর চোখে শূন্য চাহনি।
.
‘তাহলে কাল সকালেই, দশটায়।’ টেলিফোন রেখে প্রশান্ত হালদার তাকালেন রোহিণীর মুখের দিকে। ‘অসুবিধে হবে না তো?’
‘না।’ ইতস্তত করে তারপর সে বলল, ‘কার সঙ্গে আপনি কথা বললেন?’
‘মীনার সেক্রেটারি কাম গার্জিয়ান সুভাষ গায়েন, যার সঙ্গে কাল তুমি কথা বলে এসেছ।’
‘আমার সম্পর্কে কিছু বলল?’
‘না তো? কেন, বলার মতো কিছু হয়েছে নাকি?’
‘না, লোকটাকে খুব রাফ মনে হচ্ছিল। আমিও একটু মাথা গরম করে ফেলেছিলাম, অবশ্য অন্য একটা ব্যাপারে।’ প্রশান্ত হালদার জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন দেখে রোহিণী যোগ করল, ‘ঘরে একটা ছবি টাঙানো ছিল, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম বলে লোকটা বিশ্রীভাবে জবাব দিয়েছিল।’
‘কী ছবি?’
‘একটা পেইন্টিং, ন্যুড মেয়ের।’
