মহিলা হাসলেন না। রোহিণীর হাতের আঙুলগুলো একবার কেঁপে উঠল। ওই বাড়িতে সে কয়েক মাস থেকেছে। কিন্তু কিছুই কি তখন তাকে অবাক করেনি? অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় শোভনেশ বাড়ি থেকে বেরোত না। সারাদিন ছবি আঁকার ঘরে নিজেকে যেন বন্দি করে রাখত। একবার রোহিণী জুতো কিনতে যাবার জন্য তাকে সন্ধ্যায় বেরোতে বলেছিল। শোভনেশ রাজি হয়নি। ‘আজ অমাবস্যা, দিনটা ভালো নয়।’ অবাক হয়ে সে বলেছিল, ‘তুমি এসব মানো নাকি? এই ধরনের কুসংস্কার—’ তার কথা শেষ হবার আগেই অস্বাভাবিক চাহনিতে তীব্র স্বরে শোভনেশ বলে, ‘যা জানো না, তাই নিয়ে কথা বলো না। আমাদের বংশে এসব মানা হয়। দরকার থাকলে তুমি বেরোতে পার, তোমার শরীরে সেনগুপ্তদের রক্ত নেই।’
রোহিণী তখন কথাগুলোর অর্থ ধরতে পারেনি। তাই নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহসও তখন ছিল না। কিন্তু এ ছাড়াও তাকে অবাক করার মতো আরও কিছুও তো ঘটেছিল।
‘শোভনেশ মাঝে মাঝে আমাদের ঘরে আসত। এসেই বলত ‘বউদি কিছু বুঝতে পারছেন?’ বুঝতে পারা মানে, পাগল হবার লক্ষণটক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা সেটাই। আমি বরাবরের মতোই বলতাম, ‘তোমার দাদার মধ্যে যতটুকু দেখি, তোমার মধ্যেও ঠিক তাই দেখতে পাচ্ছি।’ শুনে খুশি হত। বিয়ের পর ওর ছটফটানি যেন বাড়ল। আমার স্বামীকে একদিন বলেছিল, ‘আমার সন্তান হওয়া কি উচিত? দাদা আপনি কী বলেন? বংশের এই ব্যাধিটা থামিয়ে দেওয়া দরকার। পরমেশকে বলেছি বিয়ে করিসনি, এমনকী তোর ঔরসেও যেন কারোর গর্ভে সন্তান না হয়, সেটা দেখিস। কিন্তু ও রাজি নয়। বউকে বলেছি, ‘আমাদের কোনো ছেলেপুলে হবে না। সেও রাজি নয়। ঠিক করেছি, আমি অপারেশন করিয়ে নেব। করলে কী অন্যায় হবে?’ উনি আর কী বলবেন, তুমি যা ভালো বোঝ তাই কর, বলে এড়িয়ে গেলেন।’
‘বউ মারা গেল কীভাবে?’
মহিলা এবার অবাক হয়ে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ‘তুমি জানলে কী করে?’
হিম হয়ে গেল রোহিণীর বুক। হঠাৎই তার মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে এসেছে। শোভনেশের বউয়ের মৃত্যু নিয়ে উনি তো এখনও একটা কথাও বলেননি। ব্যাপারটা সামলাবার জন্য সে হালকা স্বরে বলল, ‘এসব লোকের বউয়েরা সাধারণত বাঁচে না। আমার এরকম ঘটনা জানা আছে, স্বামীর বাতিকে উত্ত্যক্ত হয়ে একজনের বউ গলায় দড়ি দেয়, আর একজনের বউ অবশ্য পালিয়ে বেঁচেছিল। দু—জনেই ধনী, বনেদিবাড়ির বউ ছিল। তাই মনে হল—।’
‘শোভনেশের বউ যখন মারা যায়, আমরা তখন একটা বিয়ের নেমন্তন্নে টালিগঞ্জ গেছিলাম। দোতলার বড়ো ঘরটার জানলাগুলোয় গরাদ নেই। সেখান থেকে লাফিয়ে নাকি নীচে পড়ে, পেটে চার মাসের বাচ্চচা ছিল। আমাদের কিন্তু অন্যরকম মনে হয়েছিল।’
‘কী মনে হয়েছিল, খুন?’ রোহিণীর স্বর অস্ফুট হয়ে গেল, শ্বাসনালিতে উত্তেজনার চাপ পড়ায়।
‘হ্যাঁ। শুধু আমরা কেন পাড়ার লোকেও তাই মনে করে। কমলার মতো ঠান্ডা শান্ত মেয়ে, আঠারো—উনিশ বছর বয়সে কেন আত্মহত্যা করতে যাবে বলো, তার ওপর পেটে বাচ্চচা?’
‘কিন্তু ওর স্বামী তো অপারেশন করে নেবে বলেছিল, তাহলে আবার বউয়ের পেটে বাচ্চচা এল কী করে?’
‘করেছিল কী করেনি তা বাপু আমরা জানি না, আমাদের আর কিছু বলেওনি শোভনেশ। পরে আর তো আমাদের সঙ্গে কথাই বলত না।’
‘টর্চার করত?’
‘তেমন কিছু তো দেখিনি।’
‘তখন কি ছবি আঁকত?’
‘ঘরে বসে বসে আঁকত। আমি তো আঁকার ঘরে ঢুকিনি কখনো।’
‘এখন সেই শোভনেশ কোথায়, ওই বাড়িতেই আছে? আবার বিয়েটিয়ে করেছে?’
‘তা বলতে পারব না। কমলা মারা যাবার পর, ছাদের দরজায় তালা দিয়ে দিল। আর উপরে যেতে পারি না, তাই নিয়ে ঝগড়াও হল। ইতিমধ্যে উনি বদলি হলেন জলন্ধরে, সেন্ট্রাল গরমেন্টের চাকরি তো, তারপর থেকেই বাংলার বাইরে বাইরে ঘোরা। কলকাতার কোনো খবর পর্যন্ত রাখিনি। রিটায়ার করে এই চার বছর হল আমরা এসেছি। মাঝে মাঝে ভাবি একবার ঘুরে আসি দিগম্বর বর্ধন লেনে, তখনকার মানুষরা কে কেমন আছে দেখতে ইচ্ছে করে। বাড়িটার এখন কী দশা কে জানে।’
কলিং বেল বাজল। উনি গিয়ে দরজা খুললেন।
‘নীচের আন্টি আছেন?’ নন্দার গলা পেয়ে রোহিণী উঠল।
‘আন্টি, আপনার ফোন।’
একবার শুধু ভ্রূ কুঁচকেই রোহিণী বিরক্তি চেপে মুখে হাসি টেনে বলল, ‘আসি মাসিমা। খুব ভালো গল্প বলেন, আবার একদিন এসে শুনব। রাতে এসে মাছ নিয়ে যাব।’
দ্রুত পায়ে এসে টুলের উপর রাখা ফোনের রিসিভারটা তুলে সে চাপা স্বরে বলল: ‘হ্যালো।’
‘রান্না জানার প্রমাণ আজ দিচ্ছ তো?’
‘তোমাকে বলেছি না, খুব দরকার না পড়লে এখানে ফোন করবে না।’
‘খুব দরকারেই তো করছি। তোমার কি মনে হয়, প্রথম বলেই আউট হওয়াটা খুব মর্যাদাকর ব্যাপার হবে?’
‘আমার শরীর, মন আজ খুব ক্লান্ত, নানারকম চাপ…তুমি দুপুরে ফোন কোরো অফিসে।’
‘কীসের চাপ, ফোনে কী তা বলা যায়?’
‘দেখা হলে বলব। তোমাকে হয়তো আমার এবার দরকার হবে।’
‘খুব দরকার হলে আমি দেখা করব না, আর খুব খুব—’
‘রাজেন!’ রোহিণী গম্ভীর ধমক দিল। ‘তুমি যে প্রথম বলেই বোল্ড হবে, সেটা এখনি বুঝতে পারছি। সিরিয়াস হও। ইলিশ মাছ আনিয়েছি, আর একটি কথাও নয়।’
রিসিভার রেখে রোহিণী হাসল নন্দার দিকে তাকিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নন্দা ‘আন্টি’ বলে ডেকে, দ্রুত নেমে তার পাশে এল।
