‘না না, আমি এই সকালে ঠান্ডা খাব না।’
‘কাল গুরুভাই এসেছিলেন। আমরা তো বারাসাতের বিনোদানন্দ ব্রহ্মচারীর শিষ্য। একটাই মালাই তখন পড়ে ছিল, তাই দিলাম। খেয়ে খুব ভালো লেগেছে বলায় বললাম, আজ আসুন, বেশি করে খাওয়াব।’
‘আমাকে অন্য আর একদিন করে খাওয়াবেন মাসিমা। আমারও খুব ভালো লাগে।’ রোহিণী ক্ষীণভাবে স্বরটা আবদেরে করল। খুশিতে টসটস করে উঠল ওঁর মুখ। প্রীত কণ্ঠে বললেন, ‘খেলে বুঝতে পারবে, দোকানের থেকে আমার মালাইয়ের পার্থক্যটা কত।’
‘হ্যাঁ দিদি, মাসিমার হাতের রান্না খুব ভালো, সেদিন জিরে—গোলমরিচ দিয়ে যা কচুর মুখি রেঁধেছিলেন না!’
গৌরীর মা—র তারিফটা উপভোগ করে উনি বললেন, ‘তোমার শ্বশুরবাড়ি কোথায়?’
রোহিণী ধরেই রেখেছে, গৌরীর মা তার সম্পর্কে যতটুকু জানে, সবিস্তারে নিশ্চয় এঁর কাছে তা বলেছে। তবে এটা জানে না, তার শ্বশুরবাড়ি কোথায়। কাউকে সে জানাতে চায়ও না। যদি হঠাৎ চেনাশোনা বেরিয়ে যায় তাহলে আবার এক ধরনের ফিসফিসে কৌতূহলের পাত্রী হয়ে পড়তে হবে।
‘মাসিমা, আমি এখন আসি, দিদি চললুম, এখনও কাজ পড়ে আছে।’ ব্যস্ত গৌরীর মা আর এক ফ্ল্যাটের কাজ শেষ করতে গেল।
‘সেন্ট্রাল ক্যালকাটায়, বউবাজারের দিকে।’
‘ওমা! আমরাও তো একসময় বউবাজারেই থাকতাম। পঁচিশ নম্বর দিগম্বর বর্ধন লেনে।’
শোনা মাত্রই রোহিণী মাথা ঘুরে প্রায় পড়ে যাবার মতো আঘাত পেল তার স্নায়ুকেন্দ্রে। ওটা তার শ্বশুরবাড়িরই ঠিকানা। ডাইনিং টেবলের একটা চেয়ার টেনে ধীরে ধীরে সে বসে পড়ল।
‘কবে ছিলেন?’ দমবন্ধ অবস্থায় রোহিণী জানতে চাইল।
‘আমার বিয়ের ঠিক পরেই। বছর চল্লিশ আগে তো বটেই। ওঁর অফিস ছিল মৌলালিতে, হেঁটেই যেতেন। তখন যুদ্ধের শেষের দিকে। আমরা ও বাড়িতে যাওয়ার কয়েক মাস পর ব্ল্যাক আউট উঠে গেল। আমার বড়োছেলে তখনই হয়।’
‘সে বাড়িতে কে কে ছিল?’
‘আমরা ছাড়াও, একতলায় আরও দু—ঘর ভাড়াটে ছিল। বাড়িওয়ালারা থাকত দোতলায়, পেল্লায় বাড়ি দু—ভাইয়ের, ওরাও বদ্যি, পার্টিশান করে পাঁচিল তুলে দু—ভাই আলাদা। এক সময় বিরাট ধনী ছিল, কিন্তু বসে বসে খেলে যা হয়। শেষে এমন অবস্থায় পড়ল যে, ভাড়াটে বসাতে হল। অনেকটা জমি ছিল বাড়ির সঙ্গে, গাছপালাও। আমরা দেখেছি কয়লার ডিপো আর রিকশার খাটাল হল সেই জমিতে, এক ডেকরেটার বাঁশ রাখত।’
‘বাড়িওয়ালার পরিবারে কে কে ছিল?’
‘ওরা তো দুই ভাই। বড়োভাইয়ের ছেলেপুলে হয়নি, তাই ছোটোভাইয়ের দুই ছেলের মধ্যে ছোটোটিকে পুষ্যি নেয়। এরা বাঁদিকের পোর্সানে থাকত, আর আমাদের বাড়িওয়ালা রমেশবাবুরা ডানদিকে। বড়োছেলে শোভনেশ, আর্ট কলেজে পড়ত, তখনই বাপ ওর বিয়ে দিয়ে দেয়।’
‘তখন ছাত্র তো, অত কম বয়সেই ছেলের বিয়ে দিয়ে দিল?’
‘ছেলে তো করতেই চায়নি, একদিন সে কী ঝগড়া বাপ আর ছেলেতে। আমি তখন ছাদ থেকে নামছি শুকনো কাপড় তুলে। শুনলাম—’ মহিলা কথা থামিয়ে মাথা নাড়তে লাগলেন। ‘সে—সব কথা মুখে আনা যায় না, তোমার মতো অল্পবয়সিদেরও বলা যায় না। আমরা ও—বাড়িতে যাওয়ার পর পাড়ার লোকের কাছে শুনি, সেনগুপ্তদের নাকি পাগলের বংশ। প্রতি পুরুষে হয় কোনো ছেলে নয় কোনো মেয়ে, একজন না একজন পাগল হয়েছেই। পাগল রাখার জন্য ওদের একটা ঘরই আছে। বুঝলে রোহিণী, ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাসের অনেক অসুবিধে যেমন, তেমনি সুবিধেও অনেক আছে। এইরকম ফ্ল্যাটে দরজা বন্ধ করলেই একা, জানলা দিয়েও পাশের বা সামনের বাড়ি পাওয়া যায় না। ছাদ থেকেও গল্পসল্পর উপায় নেই। কিন্তু গলিতে বাড়ি হলে, সদর তো সবসময়ই খোলা জানলায় কী বারান্দায় দাঁড়াও, সবসময় কথা বলার লোক পাবেই। ভাড়াটে ভরতি বাড়ি হলে তো কথাই নেই, ঝগড়াঝাটি করেও সময় কেটে যায়। ও পাড়ায় প্রত্যেকের হাঁড়ির খবর প্রত্যেকে রাখত। আমাদের বাড়িওয়ালার সম্পর্কেও অনেক কথা শুনেছি। শুনে খুব ভয় ধরে গেছিল।’
‘কেন?’ রোহিণীর মস্তিষ্কের কোষগুলো সজাগতার তুঙ্গে পৌঁছল। এতক্ষণে আসল জায়গায় কৌতূহল তার জানার বিষয়টায় পা রেখেছে। ‘ভয় পাওয়ার মতো কী শুনেছেন?’
‘ভয় পাব না? কেউ—না—কেউ পাগল হয়ে আসছে পাঁচ পুরুষ ধরে, এই পুরুষে কেউ এখনও হয়নি, কিন্তু হবেই—কে হবে? পাড়ার লোকেরা তো এই নিয়ে রীতিমতো জল্পনাকল্পনা করত। পঞ্চাশ—ষাট বছর বয়সেও পাগল হয়েছে, আবার দশ—বারো বছর বয়সেও হয়েছে। কখন যে কে হবে, তার ঠিক নেই। বাপ—জ্যাঠার বয়স হয়ে গেছে, কিন্তু তারাও তখন পাগল হতে পারে আবার শোভনেশ আর তার ভাই পরমেশও পাগল হয়ে যেতে পারে। সে যে কী এক যন্ত্রণাকর অবস্থা, ভাবলে তো সুস্থ মানুষও পাগল হয়ে যাবে।’
‘দারুণ ইন্টারেস্টিং তো মাসিমা, অদ্ভুত ব্যাপার! ওরাও কি এই নিয়ে ভাবত না?’
‘ভাবত না আবার! সিঁটিয়ে থাকত সবসময়। যাগযজ্ঞি শান্তি স্বস্ত্যয়ন তো লেগেই ছিল। তাবিজ তাগা, মাদুলি, আংটি, জ্যোতিষী, গণৎকার থেকে শুরু করে স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানোও হয়েছে। কেউ একজন পাগল হলে ওরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, কিন্তু কেউই হচ্ছে না। এ যে কী সমস্যা, কী যন্ত্রণা ভাবলে এখন হাসি পায় বটে, কিন্তু যদি তুমি তখন ওই বাড়িতে থাকতে—তাহলে বুঝতে।’
