তার মনে হচ্ছে, সম্ভবত লেখকের নাম সিদ্ধার্থ সিংহ। দেশের পাঠকদের বড়ো অংশের কাছে গ্রহণীয় হবার জন্য বাঙালিয়ানা খসিয়ে সিধারথ সিনহা হয়েছেন। যেমন হিন্দি ফিল্মে পদবি উড়িয়ে দিয়ে মিস্টার রাজেশ, মিস মিতা বলা হয়। ভারতের কোন জায়গার লোক বোঝে কার সাধ্য। আরও মনে হচ্ছে, এই সিদ্ধার্থ শুধু বাঙালিই নন, কলকাতারই বাঙালি। এঁকে খুঁজে বার করতে পারলে নিশ্চয় শোভনেশের পারিবারিক অনেক খবর পাওয়া যেতে পারে। অন্তত উনি কোথা থেকে এসব কথা জেনেছেন, ওঁর সোর্সটা কী, তা জানতে পারলেও হবে। বোম্বাইয়ে ম্যাগাজিনটার সম্পাদকীয় অফিসে চিঠি দিয়ে সিদ্ধার্থ সিংহর ঠিকানাটা আনতে পারলে লোকটির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।
লেখাটায় যা সব বলা হয়েছে, তার বিন্দুবিসর্গ আজ সকাল পর্যন্তও সে জানত না। শোভনেশ তার পারিবারিক অতীত সম্পর্কে কোনোদিন একটি কথাও বলেনি। শুধু বলেছিল, ‘আমি একা। বাবা—মা নেই। একটা ভাই, সে আলাদা থাকে, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। অল্প বয়সে বাবার চাপে পড়ে বিয়ে করেছিলাম, বউ মারা গেছে।’
‘বিয়ে হয়েছিল! কত বছর বয়সে?’
‘কুড়ি—একুশে।’
‘কী করে মারা গেল?’
‘ম্যালিগন্যান্ট টাইফয়েডে।’
‘দেখতে কেমন ছিল? ছবিটবি আছে?’
‘ছবি রাখা আমি পছন্দ করি না। আর এত বছর আগের চেহারা, মুখ এখন চেষ্টা করলেও মনে করতে পারব না।’
গৌরীর মা দালান মুছছে। চেয়ারে সে বাবু হয়ে বসে। চঞ্চলা কাল বিস্কুট কিনে এনেছিল, রোহিণী ঠোঙাটা রাতে বাটি চাপা দিয়ে রাখে। এখন বাটি তুলে সেটা দেখে সে একটা বিস্কুট মুখে পুরল। খবরের কাগজটার পাতা আর একবার উলটে দেখে নিল। একটা লাইনও বহরমপুরের খবর নেই।
তাকে অন্যমনস্ক দেখে গৌরীর মা বলল, ‘মাছ নিয়ে আমার সঙ্গে ওপরে চলো, আলাপ করিয়ে দোব। মাসিমা একদিন দুখ্যু করে বলল, বুড়োবুড়ি বলে কেউ গপ্পোটপ্পো করতেও আসে না। বসে বসে শুধু টিভি দেখা ছাড়া কিছু করার নেই। ছেলে, ছেলের বউ কোচিন না মোচিন কোথায় যেন থাকে, মেয়ে জামাই বিলেতে। নাও ওঠো, চুলটা একটু আঁচড়ে নাও, বুড়ি একটু সেকেলে, সিঁদুর আছে? আচ্ছা থাক আজকাল অফিসের মেয়েরা অত সিঁদুরমিদুর দেয় না। বরং একটা লাল টিপ পরে নাও, আছে তো?’
‘খুঁজতে হবে।’
গৌরীর মা নিজের কপাল থেকে টিপটা খুলে রোহিণীর কপালে সেঁটে দিয়ে বলল, ‘সাজগোজের দিকে তোমার একদম নজর নেই। স্বামী নিরুদ্দেশ হলেও, সধবা তো! হ্যাঁ দিদি, খোঁজটোজ চালাচ্ছ তো?’
‘কোথায় আর খোঁজ চালাব, বলো। আশি—পঁচাশি কোটি লোকের দেশ, সহজ তো নয়!’
‘তারকেশ্বরে হত্যে দাও একবার।’
‘হ্যাঁ তাই দোব ভাবছি। চলো এবার।’
দু—জনে পলিথিন ব্যাগে মোড়া মাছ নিয়ে উপর তলায় উঠে বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে। রোহিণী পিছনে মুখ ফিরিয়ে তুষার দত্তর ফ্ল্যাটের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে তাকাল। দেওয়ালে কাচের পাল্লা দেওয়া আলমারিতে ডিনার সেট, সাজিয়ে রাখা। বিয়েতে পাওয়া। আঠারো বছরে একবারও ব্যবহারের সুযোগ আসেনি। স্টিলের থালা বাটি গ্লাসও সাজানো হয়েছে। আর একটা তাকে কয়েকটা রাজস্থানি মেয়ে পুঁতুলের সঙ্গে প্লাস্টিকের পুতুলও। আর এক তাকে তুষার দত্তর পেশি ফোলানোর ফসল কয়েকটা কাপ মেডেল। দেওয়ালেও জাঙ্গিয়া পরা তুষার দত্তর চার রকম ভঙ্গির ছবি, বহিরাগতদের যেন অস্বস্তির উপাদান জোগাতেই টাঙানো। হঠাৎ প্রেশার কুকারের বাষ্প নিঃসরণের তীক্ষ্ন আওয়াজ হল। ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে নন্দা খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই থমকে গেল আড়ষ্ট হয়ে। রোহিণী হাতছানিতে তাকে ডাকল।
‘আমার পরিচিত একজন জয়পুর যাচ্ছে, তাকে বলব তোমার জন্য…একটা আনতে। ওখানে দারুণ দারুণ প্রিন্টের পাওয়া যায়, কাচ বসানো।’
‘একটা’ কী জিনিস যে আনতে বলবে, সেটা আর বলার দরকার হল না। নন্দার মুখ উজ্জ্বল হয়েই ফ্যাকাসে হল।
‘বাবা ওসব পরা পছন্দ করে না। আমি দুপুরে আপনার ঘরে গিয়ে পরেছিলাম। চঞ্চলা তখন ছিল, ওকে বারণ করেছিলুম আপনাকে যেন না বলে।’
‘ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করছি না।’
ইতস্তত করে নন্দা কী একটা বলতে যাচ্ছে, সেই সময় ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল। এক ছোটোখাটো চেহারার, স্নিগ্ধ মুখ, গৌরবর্ণা মহিলা ওদের দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে। বয়স ষাট—পঁয়ষট্টির মধ্যে।
‘মাসিমা, এই যে দিদি এসেছে।’
‘ওহ, এসো ভেতরে এসো। মাছ রাখবে তো? তোমার নাম তো রোহিণী।’
‘হ্যাঁ। আগে আমি কখনো এমন ঝামেলায় তো পড়িনি।’ রোহিণী কুণ্ঠিত স্বরে বলল। মাছ আনলাম, রেঁধে খেয়েও ফেললাম। তুলেটুলে রাখার মধ্যে আমি নেই। রাতে খাই নিরামিষ। কিন্তু আজই—’
‘শুনেছি, গৌরীর মা—ই বলেছে। বসো। ‘তুমি’ বলছি বলে—’
‘না না, নিশ্চয় বলবেন, মায়ের বয়সি আপনি।’ রোহিণী বসার জন্য ব্যস্ত হল না।
‘তা ছাড়া দিদি আপনাদেরই স্বজাত বদ্যি। ছোয়াছুঁয়ির আর কথাই উঠবে না।’
‘বদ্যি নাকি! তবে আমি অত জাতটাতের বাছবিচার করি না। তুমি নিজেই রেখে দাও।’
দালানের প্রান্তে রাখা ফ্রিজের কাছে গিয়ে পাল্লা খুলে মহিলা ডিপ ফ্রিজের ডালাটা টেনে বললেন, ‘এর মধ্যেই রাখ।’
রাখার সময় রোহিণী দেখল, প্লাস্টিকের সাত—আটটা কুলপি ভেতরে রয়েছে। নীচের তাকে কয়েকটা ঢাকা বাটিতে রান্না করা খাদ্য, জলের আর সিরাপের বোতল, মাখনের কৌটো। রোহিণীর চোখের দিকে নজর রেখেছিলেন মহিলা। বললেন, ‘একটা মালাই চেখে দেখবে নাকি?’
