বিছানা থেকে উঠে আলো জ্বেলে ঘরের কোণে জলচৌকির উপর থাক দিয়ে রাখা স্টিলের দুটো ট্রাঙ্কের উপরেরটা খুলল। ডালার খোপে গোঁজা কয়েকটি কাগজ থেকে সে চার—ভাঁজ করা একটি চিঠি বার করল।
চিঠিটি অনন্তের স্ত্রীর। বহুবার পড়েছে গত দু—দিনে। আবার সে পড়ার জন্য ভাঁজগুলো খুলতে লাগল।
দুই
অনন্তের স্ত্রীর নাম রেবতী। তার কথা ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণের জন্য একুশ বছর পিছনের দিকে তাকিয়েছিল। যথেষ্ট উপরে উঠে পাখি—নজরে সে নিজের পিছন দিকে তাকাবে এমন ক্ষমতা তার নেই। জমির উপর দাঁড়িয়ে গিরিশ্রেণি দেখার মতো সে উঁচু—নীচু জীবনের কয়েকটা চূড়ামাত্র দেখতে পায়। তারই একটি, বাবাকে লেখা চিঠিটা।
এরপরের চূড়া ক্লাস টেন—এ তার ফেল হওয়া। এই নিয়ে স্কুল—জীবনে সে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হল। প্রথমবার ক্লাস ফোর—এ। অমর তৃতীয় হয়ে ক্লাস টেন—এ ওঠে। ও ভালো ছাত্র। সবাই বলে অমর কিছু একটা হবে। হয়েওছে। সে এখন দিল্লিতে থাকে। বড়ো একটা চামড়া—ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে সংযোগ রাখার দায়িত্বে আছে।
বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের তেরো হাজার টাকা, অবিনাশকাকার পরামর্শে পোস্ট অফিসের ক্যাশ সার্টিফিকেটে রাখা হয়েছিল অনু আর অলুর বিয়ের জন্য। ব্যাঙ্কে সাতশো এগারো টাকা আর অফিস থেকে সাহায্য বাবদ দু—হাজার টাকা। পুরো একটা বছর ঘর ভাড়া আর চারজনের স্কুল খরচ দিয়ে সাতাশশো টাকায় সংসার চলেছে, অনন্ত এখন তা ভাবতে পারে না। তখন দু—টাকা সের মাংস ছিল। টাকা ফুরিয়ে যাবার ভয়ে তারা একদিনও কেনেনি।
পরামর্শটা অবিনাশকাকার দেওয়া—অনন্ত কোনো কাজে ঢুকে যাক। সংসারে এবার টাকা রোজগারের লোক দরকার। ঘষতে ঘষতে বি এ, এম এ পাশ করে তো বড়োজোর কেরানি হবে, তার থেকে যেহেতু ওর মাথাটা অমরের মতো পরিষ্কার নয় তাই এখনই যেকোনো ধরনের কাজে অনন্ত লেগে পড়ুক। পঞ্চাশ—ষাট, যত টাকাই আনুক সেটা সাহায্য করবে। পাঁচ—পাঁচটা লোকের খাওয়া—পরা, সহজ কথা নয়।
শীলা আপত্তি করেনি। দিনযাপনের চিন্তায় ও অভাবে ধীরে ধীরে তার বাস্তববুদ্ধি বেড়েছে সেই সঙ্গে অবিনাশ—ঠাকুরপোর উপর নির্ভরতা। অনন্তকে কাজে ঢুকিয়ে দেবার কথায় শুধু একবারমাত্র সে বলেছিল, ‘এখন তো ওর খেলাধুলো করার বয়স।’
‘তা বললে তো হয় না, ওর বয়সি কত ছেলে দেখুন গে কত কাজ করছে। ট্রেনে জিনিস বেচছে, দোকানে কাজ করছে, মোট বইছে…ওর থেকেও কম বয়সি।’
অবিনাশকাকা মাথা নীচু করে বসে—থাকা অনন্তের পিঠে হাত রেখেছিলেন। কথাগুলো খুব স্বচ্ছন্দে বলতে চেষ্টা করেও পারছিলেন না। গলায় আটকে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে খাঁকারি দিতে থামছিলেন।
‘বড়োছেলেরাই তো একসময় সংসারে বাবার জায়গা নেয়। স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলো, আড্ডা এসবের দরকার আছে কিন্তু ভাগ্য যদি অন্যরকম অবস্থায় ফেলে দেয়, তাহলে আর কী করার থাকতে পারে। মা—কে দেখা, ভাই—বোনেদের মানুষ করে তোলা, নিজেকে নিজে বড়ো করা এসব তো এবার তোকেই করতে হবে। জীবনে ত্যাগ করতে হয় নানাভাবে, সবাইকে করতে হয়।…কী আর করবি, ভাগ্য যার যেমন দেবে…।’
শুনতে শুনতে অনন্ত নিজেকে বাবার ভূমিকায় কল্পনা করে অভিভূত হয়ে গেছল। বাবা গ্র্যাজুয়েট, বয়সে তার থেকে অন্তত তিরিশ বছরের বড়ো, চাকরি করছিলেন প্রায় কুড়ি বছর, একটা সংসার তৈরি করেছেন, অনেক ঝাপটা সামলে তাদের নিয়ে এগোচ্ছিলেন, এমন একটা লোকের জায়গা সে নেবে কী করে?
অমর, অনু, মা সবার মুখের দিকে সে তখন তাকিয়েছিল। ওরা ঘরে ছড়িয়ে বসেছিল। চল্লিশ ওয়াটের বালবে ওদের ভয় ভাবনা দুঃখ আরও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। ওরা মাঝে মাঝে মুখ নামাচ্ছে আর সন্তর্পণে তার দিকে তাকাচ্ছে। যেন বিচারসভায় বসে ওদের হত্যাকারীর প্রাণদণ্ডের আদেশ শুনছে এমন একটা ভাব চোখেমুখে।
নিজেকে বিরাট একটা মানুষ হিসেবে দেখার ইচ্ছা অথবা লোভ অনন্তের মাথার মধ্যে তখন ঢুকে যায়। সর্বস্ব ত্যাগ করে, আরাম বিশ্রাম সুখ উচ্চচাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে সে ভাই—বোনেদের বড়ো করে প্রতিষ্ঠিত করছে, নিজে যাপন করছে সামান্য জীবন। ভালো জামা—প্যান্ট পরে না, সিনেমা দেখে না, রেস্টুরেন্টে খায় না, ট্যাক্সি চাপে না, কারোর কাছে হাতও পাতে না। আত্মীয়স্বজন, পাড়া—প্রতিবেশী শ্রদ্ধাভরে তার দিকে তাকাচ্ছে, তার সম্পর্কে প্রশংসা করছে—কল্পনা করতে গিয়ে সে ঘরের সবক—টি মানুষের জন্য ভালোবাসা আর করুণাবোধ করছিল।
‘আমি সবাইকে দেখব।’
‘য়্যা!’ অমর হঠাৎ অবাক হয়ে শব্দ করে ফেলেছিল।
‘তোদের আমি দেখব।’
ওরা তিনজন কী বুঝল কে জানে, মা—র চোখ শুধু জলে ভরে উঠেছিল।
‘তুই সুখী হবি, দেখিস আমি বলছি,…জীবনে তুই কখনো কষ্ট পাবি না।’
রেবতীর চিঠিটা আবার ডালার খোপে রেখে অনন্ত হাসবার চেষ্টা করল। রেবতী গত পরশু তাকে ছেড়ে চলে গেছে, খবরটা কেউ এখনও জানে না।
মা—কে দেড় বছর আগে দিল্লি নিয়ে গেছে অমর। অনুর বিয়ে হয়েছে কটকে এক স্যাকরার সঙ্গে। তাকে সে সাত বছর দেখেনি। পাঁচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে সে খুবই ব্যস্ত। অনুর বিয়েতে সবাই অমত করেছিল, কিন্তু সে জেদভরেই বোনের বিয়ে দেয়। শান্তনু পড়ত অলুর সঙ্গে কলেজে। বেকার ছিল। আজও প্রায় তাই। শান্তনু দু—বার চাকরি খুইয়েছে মাতলামো করে। এখন চাকরি খুঁজছে। অলু ফুড কর্পোরেশনে চাকরি করে। তাদের দুটি ছেলে।
