টোস্ট আর দুধ খাবার টেবলে রেখে দিয়ে, গৌরীর মা আর এক ঘরের কাজ সারতে চলে গেছে। যাবার আগে ভাত চড়িয়ে দিয়ে গেছে। ম্যাগাজিনটা নাড়াচাড়া করতে করতে রোহিণী ভাবল, মাছের টুকরোগুলো অপরিচিত জনের কাছে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রাখার অনুরোধ জানানোটা কতটা সংগত হবে? তার আগে বাথরুম যাওয়া, স্নান করা, তারও আগে ভাতটা নামানো। এইসব ভাবতে ভাবতে সে পাতা খুলে ‘লালসার আগুনে ভস্মীভূত’ প্রবন্ধে খুঁজতে শুরু করল।
শেষের দিকে শোভনেশের কথা। প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্যটি পড়েই সে চমকে উঠল।
.
‘শোভনেশ সেনগুপ্তর বংশে অদ্ভুত একটা ধারা আছে। উন্মাদ হওয়ার। তার পিতামহের পিতামহ শ্যামাচরণ, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বিধবা মায়ের সঙ্গে হুগলির এক গ্রাম থেকে উত্তর কলকাতায় মামার বাড়িতে আসেন ছয় বছর বয়সে। প্রাথমিক শিক্ষা হেয়ার স্কুলে। খুব অল্প বয়সে মামাদের কাগজের ব্যবসায়ে শিক্ষানবিশি শুরু করে পরে পাটের দালালিতে নামে। প্রচুর বিত্ত তিনি সঞ্চয় করেছিলেন। মধ্য কলকাতার বউবাজার অঞ্চলে এক বিঘা এলাকা নিয়ে তৈরি বিশাল জরাজীর্ণ বাড়িটি এখনও তাঁর সমৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করছে। শ্যামাচরণ সন্দেহ ও ঈর্ষার বশে গলা টিপে হত্যা করেন তাঁর রক্ষিতাকে। কিন্তু বিচারের সময় দেখা যায়, তিনি সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছেন।
‘শ্যামাচরণের তিন পুত্র। জ্যেষ্ঠ দ্বারিকনাথ বাবার ব্যবসা ছাড়াও স্টিমার কিনে পরিবহন ব্যবসায়ে নেমে পৈতৃক সম্পদ আরও বাড়ান। মেজোছলে ইংল্যান্ড যান এবং এক ইংরেজ রমণীকে বিবাহ করেন। শ্যামাচরণ তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন। ছোটোছেলে অল্প বয়সে ধনুষ্টংকারে মারা যান। দ্বারিকনাথ একবার ক্রোধের বশে তাঁর এক কর্মচারীকে এমন প্রহার করেন যে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এর দু—বছর পর তিনি স্ত্রীকে হাত—পা বেঁধে ছাদের এক কুঠুরিতে সাতদিন বন্ধ করে রাখেন। জলটুকুও খেতে দেননি। অবশেষে বাড়ির এক ঝি পুলিশে খবর দেয়। তাকে মৃতপ্রায় অবস্থায় ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। দ্বারিকনাথ তখন খুলনায় গিয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে সেখানে গ্রেফতার করতে গেলে তিনি স্টিমার থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে ডুবে মারা যান।
‘দ্বারিকনাথের তিন কন্যা ও এক পুত্র। বিবাহের তিন বছর পর বড়ো মেয়ে তরলাবালা উন্মাদ হয়ে যান। বাষট্টি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি বাপের বাড়িতে একটি বদ্ধ ঘরে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। কিন্তু পুত্র রামচন্দ্র বা অন্য দুই মেয়ে স্বাভাবিক জীবনই যাপন করে পরিণত বয়সে মারা যান। বস্তুত এই সময় থেকেই সেনগুপ্তদের পাগলের বংশ, এমন একটা ধারণা কলকাতায় চাউর হয়ে যায়। বৈবাহিক সম্বন্ধ গড়ার প্রস্তাব পরপর প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় বহু অর্থব্যয়ে দ্বারিকনাথ তাঁর বাকি দুই মেয়ের বিয়ে দেন বরিশাল ও রানাঘাটে, ছেলের জন্য কন্যা সংগ্রহ করেন হাওড়ার এক গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে।
‘পৈতৃক ব্যবসায়ে রামচন্দ্র একেবারেই মনোযোগী হননি। তাঁর ঝোঁক ছিল শিল্পের দিকে। তিনি দক্ষ অভিনেতা ছিলেন। থিয়েটারে অর্থ বিনিয়োগ করে নাট্য কোম্পানি তৈরি করেন। রামচন্দ্রের আমলেই সেনগুপ্তদের বিত্ত ও বৈভবের দ্রুত পতন ঘটে। একের পর এক বিপর্যয় ঘটে। যাত্রীসহ একটি স্টিমার ডুবে যাওয়ায় বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। পাটের ব্যবসায় তদারকির অভাবে ও কর্মচারীদের চুরি ও শোষণে ছিবড়েতে পরিণত হয়। থিয়েটার ব্যবসাও দু—বছরের মধ্যে বন্ধ করতে হয় প্রভূত গুনাগার দিয়ে। বস্তুত যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি রামচন্দ্রই বিক্রি করে ফেলেন, শুধু বাড়িটি ছাড়া।
‘রামচন্দ্রর দুই ছেলে দুই মেয়ে। দ্বিতীয় ছেলে রমেশচন্দ্রই শোভনেশের বাবা। বড়ো ছেলে উমেশচন্দ্র নিঃসন্তান ছিলেন তাই শোভনেশের ছোটোভাই রমেশকে তিনি দত্তক নেন। উমেশ—রমেশের ছোটোবোন সুষমার বারো বছর বয়সেই মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ দেখা দেয়। যে—ঘরে তরলাবালা উন্মাদ জীবন কাটান, সুষমাকে সেই ঘরেই রাখা হয়।
‘বংশে প্রতি পুরুষেই একজন করে পাগল হয়েছে, এটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল উমেশচন্দ্রকে। প্রথমে তিনি বিয়ে করতে রাজি হননি ছোটোবোনকে ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যেতে দেখে। কিন্তু ভীরু ও অলস প্রকৃতির উমেশচন্দ্র বাবার হুমকি, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবার শাসানি ও মায়ের অলঙ্কারাদি পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি। তবে বিয়ের আগে গোপনে তিনি নিজেকে নপুংশক করিয়ে নেন এক চিকিৎসক বন্ধু দ্বারা।’
কলিংবেল বাজল। পড়া থামিয়ে রোহিণী উঠে গিয়ে দরজা খুলল। গৌরীর মা বাকি কাজ সারতে এসেছে। রান্নাঘরে ঢুকেই সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এ কি, ভাত নামাওনি। পোড়া গন্ধও কি পাচ্ছ না?’
রোহিণী ‘তাই তো’ বলে ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল। আবার চাল সেদ্ধ করতে বসিয়ে সে দুধ আর ঠান্ডা টোস্ট দাঁতে ছিঁড়ে চিবোতে চিবোতে রান্নাঘর থেকে বাটনা বাটার শব্দের মধ্যে ডুবে গিয়ে ভাবল, শোভনেশদের পারিবারিক এত কথা সিধারথ সিনহা নামের লোকটি জানল কী করে! প্রায় একশো পঁচিশ বছরের, পাঁচ পুরুষের ইতিহাস তো অবাঙালি কারোর পক্ষে সংগ্রহ করা সহজসাধ্য নয়!
পুরো লেখাটার আকার অনুযায়ী শোভনেশের সম্পর্কেই বেশি জায়গা খরচ হয়েছে, তুলনায় বাকি তিন ভস্মীভূত শিল্পীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে কমই। নানা কাগজে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সংবাদ থেকে তথ্য নিয়ে যতটুকু লেখা সম্ভব, উপর উপর শুধু ছুঁয়ে যাওয়া, তাইই। কিন্তু শোভনেশের ব্যাপারটা, খেটেখুটে খবর জোগাড় করে লেখা। ম্যাগাজিনটা বোম্বাই থেকে বেরোয়। সেখানে বসে এটা লেখা নয়, সেখান থেকে এসে এত পুরোনো সব কথা জোগাড় করা সোজা কাজ নয়।
