‘আচ্ছা, আর একদিন আপনার জন্য আস্ত একটা আনব। …দিদি, লেখাটা?’
‘হয়ে গেছে। আর দু—মিনিট, কুম্ভ আর মীনটা বাকি। আপনাকে তো দশটার মধ্যে দিয়ে আসতে হবে। বরং ততক্ষণে দুটো ভাজা খেয়ে যান।’
রান্নাঘরের কলে গৌরীর মা বাসন মাজছিল। রোহিণী মাছ ভাজতে ভাজতে আবদারের গলায় বলল, ‘একটু সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বেটে দেবে?’ তারপরই অনুযোগ করল, ‘তোমার ওই মেয়েটা বাপু না বলে—কয়ে কাল চলে গেছে। কেমন লোক দিলে তুমি?’
‘সে কী! চলে গেছে! আজকাল দিদি এইরকমই হয়েছে। কাজের লোক পাওয়া যে…তুমি বার করে রাখ, আমি নীচের ঘরের কাজ সেরে এসে কেটে দোব। তবে মেয়েটা ভালো, হাত—টান—ফান নেই। আমার সঙ্গে কাল আর দেখা হয়নি, আজই গিয়ে ওর মাকে জিজ্ঞেস করব, কেন কাজ ছাড়ল? চঞ্চলার মা—ইই তো আমাকে বলেছিল কাজ দেখে দেবার জন্য। ছ—টা ছেলেমেয়ে, মরুক গে। হ্যাঁ, দিদি, লোকটা কি তোমার আপিসের?’
‘হ্যাঁ!’ রোহিণী কড়া নামিয়ে বার্নার নিবিয়ে বলল, ‘গৌরীর মা, মাছগুলো তো সন্ধে পর্যন্ত তুলে রাখা যাবে না। কী করি বল তো।’
‘ওই জন্য বলেছিলুম একটা ফিজ কেনো। এ বাড়ির সবার ঘরে আছে, শুধু তোমার ঘরেই ফিজ, টিভি নেই।’ এমন ঘরে কাজ করাটা যে অগৌরবজনক, গৌরীর মা—র স্বর সেটাই জানিয়ে দিল।
‘কারোর ঘরে একবেলার জন্য যদি রাখা যায়! তুমি একটু দেখবে? সামনের মাদ্রাজিরা তো নিরামিষ, নন্দাদের ঘরেও রাখতে চাই না, ওদের সামনের ঘরের সঙ্গে আলাপ নেই। তুমি তো ওদের কাজ করো, একটু বলে দেখবে? আমি তো বলতে গেলে ওদের চোখেও দেখিনি আজ পর্যন্ত।’
‘কত্তা গিন্নি দু—জনেই খুব ভালো লোক। তুমি নিজে গিয়েই বরং বলো, সেটাই ভালো দেখাবে।’
দু—টুকরো মাছ ভাজা নিয়ে রোহিণী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, কমল ম্যাগাজিনটা খুলে ঝুঁকে রয়েছে শোভনেশের আঁকা ছবিটার উপর। হঠাৎই ঝনঝন করে উঠল তার মাথার মধ্যে। প্রায় হুমড়ি খেয়ে রোহিণী টেবলের অপর প্রান্ত থেকে হাত বাড়িয়ে ম্যাগাজিনটা ছিনিয়ে নিল হতভম্ব কমলের হাত থেকে।
‘এসব আপনাকে দেখতে হবে না।’ কর্কশ স্বরে সে বলল এবং ম্যাগাজিনটা শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ছুড়ে রেখে রোহিণী চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
বিশ্রী রকমের অভব্যতা হল। কিন্তু মাথাটা কীরকম যে করে উঠল। কী মনে করছে কমলদা! ওইরকম ছবিওলা ম্যাগাজিন, ছোঁ মেরে সরিয়ে নিল। নিশ্চয় নোংরা অশ্লীল কিছু আছে যেটা লোককে দেখতে দিতে চায় না। বাজে মেয়ে, চরিত্র ভালো নয়, এইরকম ধারণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। রোহিণী লজ্জায় মুষড়ে পড়ল।
কমল অন্যমনস্কের মতো মাছের কাঁটা বেছে খাচ্ছিল। ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে রোহিণীকে আসতে দেখে মুখ তুলে হাসল।
‘লেখাটা শেষ করে ফেলি।’
কাগজ—কলম নিয়ে রোহিণী কুম্ভ রাশিটা শুরু করল। মনে মনে সে কুঁকড়ে আছে।
‘দিদি, মনটা খুব উতলা হয়ে রয়েছে ছেলের জন্য…আমি ইংরিজি পড়তেও পারি না। ছবিটা ভালো লাগছিল দেখতে, তাই—’
রোহিণী অবাক হয়ে কমলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভালো লাগছিল?’ তারপরই সম্বিত ফিরিয়ে এনে বলল, ‘কমলদা, আমি সেজন্য কিছু মনে করিনি। আমারও মনটা একটা ব্যাপারে উতলা হয়ে রয়েছে। এই ম্যাগাজিনটায় একটা লেখা বেরিয়েছে আমার স্বামীর সম্বন্ধে। এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি। আপনি কী জানেন, আমার স্বামী একজন আর্টিস্ট ছিল, সে এখন জেলে?’
কমল তার দুশ্চিন্তা—জর্জরিত স্তিমিত চাহনি রোহিণীর সন্ত্রস্ত এবং ব্যগ্র চোখে রেখে বলল, ‘লেখাটা তাড়াতাড়ি শেষ করে নিন।’
মাথা নামিয়ে রোহিণী লেখায় মন দিল। গৌরীর মা—র ঝাঁট দেবার শব্দ ছাড়া ফ্ল্যাট নিঝুম। দালানের এক ধারে বেসিনের কলে হাত ধুয়ে এসে কমল কাগজগুলো নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রেখে বলল, ‘মাছটায় স্বাদ আছে।’
গৌরীর মা ঝাঁট দেওয়া শেষ করেছে। রান্নাঘর থেকে বলল, ‘দিদি তোমার টোস করে রাখছি, পরে এসে ঘর মুছে দোব’খন।’
‘কমলদা, আপনার ছেলের জন্য আমিও দুশ্চিন্তায় থাকব। নিশ্চয় হসপিটালে একবার যাবেন। দুপুরে অফিসে অবশ্যই বলবেন, কেমন আছে।’
‘বলব।’ তারপর ইতস্তত করে কমল বলল, ‘অফিসে আপনার সম্পর্কে অনেকে অনেক কথাই বলে, কিন্তু আমি তাতে কান দিই না। স্বামী যদি অন্য কোনো মেয়েকে খুন করে, সেটা তো স্ত্রীর দোষ নয়। কিন্তু অনেকের ধারণা, স্ত্রীরই দোষ।’
‘কী দোষ?’ রোহিণী বিভ্রান্ত, উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইল। ‘আমি তো খুন করতে বলিনি, প্ররোচিতও করিনি।’
কমল হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ‘আমি ওদের বুঝি না। এরা এইরকমই, পরচর্চা, পরনিন্দা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। যার স্বামী যাবজ্জীবনের জন্য জেলে, সে যদি কোনো পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করে তাতে দোষটা কোথায়? কিন্তু অনেকের কাছে সেটাই দোষের। যাবজ্জীবন মানে তো তার বউ বিধবাই। বিধবার কী বিয়ে হয় না আমাদের দেশে? আমিই তো করেছি।’
কমলের শীর্ণ চোপসানো মুখ, কাঁচাপাকা দাড়িসমেত উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘গরিব বামুনের মেয়ে, এক সময় পরিচয় ছিল। আমার নীচু জাত, তাই ওরা বিয়ে দিতে রাজি হয়নি। তাড়াতাড়ি এক জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ের এক বছর পরই বিধবা হয়, এসব ছাব্বিশ বছর আগের কথা।’
কমল চলে যাবার পর রোহিণী কিছুক্ষণ বসে প্রৌঢ় লোকটির কথা ভাবল। ঠান্ডা প্রকৃতির নিরীহ স্বল্পবাক। পঁচিশ বছর ইস্টার্ন ম্যাগাজিনসে রয়েছে। ধুতি—শার্ট আর চটি ছাড়া অন্য পোশাকে কেউ ওকে দেখেনি। উচ্চচাকাঙ্ক্ষী, ভদ্র ডিসিপ্লিনড জীবন। ছেলে ইংরাজিতে এম এ পড়ছে। রোহিণীর মনে হল, এই সব লোকের সঙ্গে আলাপ করলে জীবনের জ্বালা—যন্ত্রণাগুলো নিবিয়ে ফেলতে সাহায্য পাওয়া যায়। এখন সে শান্ত বোধ করছে।
