কী লিখেছে শোভনেশ সম্পর্কে, সেটা দেখার জন্য যখন রোহিণীর দৃষ্টি প্রবন্ধের উপর দিয়ে ওঠানামা করছে, তখন বউটি ঘরে ঢুকল। এক কোণে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে ইংরেজি খবরের কাগজ। তার থেকে ঘেঁটে একটা খুদে আকারের আট পাতার ট্যাবলয়েড বার করে আনল।
‘এই যে আপনি যা চাইছিলেন।’ বউটির মুখ সাফল্যের গর্বে উদ্ভাসিত। ‘দারুণ মেমারি ওর, ঠিক বলে দিল।’
‘আচ্ছা, আমি যদি এটা পড়ার জন্য নিয়ে যাই, তোমাদের কি অসুবিধে হবে?’ রোহিণী ম্যাগাজিনটা দেখিয়ে গড়গড়িয়ে এবং তার নিজস্ব গলায় বলল। তার মানসিক স্থৈর্য আর পরিপাটি নেই।
‘না না, আপনি নয়ে যেতে পারেন। আমাদের তো দেখা হয়ে গেছে।’
রোহিণী দুটি পত্রিকাই হাতে নিয়ে বেরোবার সময় নিজেকে গুছিয়ে ফেলে আবার তার মন্থর দ্বিতীয় গলার স্বরে ফিরে গেল। ‘তুমি অনেক ছোটো তাই আর আপনি—টাপনি বললাম না। কত দিন বিয়ে হয়েছে?’
‘সাত মাস।’
‘তাহলে তো এখন অনেকদিন ছুটিতে থাকবে।’ রোহিণীর অর্থপূর্ণ হাসির ইঙ্গিতের প্রতিবিম্ব অন্যদিকেও ফুটল।
‘নাম কী তোমার?’
‘কুন্তী।’
‘আহহ হোয়াট আ বিউটিফুল নেইম! পঞ্চপাণ্ডব পাব তো? আচ্ছা চলি ভাই।’
ভাই বললে ওর দিদি না বলে উপায় নেই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রোহিণী আন্দাজে টের পেল, কুন্তী দরজা বন্ধ না করে তাকিয়ে রয়েছে। নিশ্চয় সোফিয়া লোরেনকে দেখছে।
নিজের ফ্ল্যাটে এসে, ম্যাগাজিনটা পড়ার প্রচণ্ড ইচ্ছাটা দমন করে রোহিণী কাগজ—কলম নিয়ে ডাইনিং টেবলে বসল। লেখালেখির কাজ সে এখানে বসেই করে। ভস্মীভূত শিল্পীরা অপেক্ষা করতে পারবে কিন্তু গ্রহ—নক্ষত্রদের এক্ষুনি প্রেসে পাঠাতে হবে। কমলের ফিরে আসার সময় হয়ে এল।
এয়ারঈজ, টর্যাস, জেমিনি, ক্যানসার, লিও…রোহিণী পর পর বারোটি রাশির বাংলা নাম মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ইত্যাদি লিখে সে কাগজটার তারিখ দেখল। মাস দেড়েক আগের এক রবিবার। অদলবদল না করে হুবহু বাংলা করে দিলেও কেউ ধরতে পারবে না। মহারানিতে রাশি পিছু গড়ে পাঁচ—ছ লাইন করে বেরোয়। ইংরেজি কাগজটাতেও তাই রয়েছে।
শোভনেশের আগ্রহ ছিল জ্যোতিষে। বিয়ের আগে একবার সে রোহিণীর কররেখা দেখেছিল। মিনিট পাঁচেক নীরবে গভীর মনোযোগে দেখার পর বলেছিল, ‘খুব জটিল নও। আবেগটা কম, অল্পে সন্তুষ্ট হও, বুদ্ধিচর্চার দিকেই ঝোঁক…’ তাকে থামিয়ে রোহিণী বলেছিল, ‘এসব বলার জন্য জ্যোতিষ জানার দরকার হয় না। আমিও বলে দিতে পারি হাত না দেখেই।’ শোভনেশ বলেছিল, ‘তাহলে কী জানতে চাও?’ রোহিণী হালকা স্বরে বলে, ‘মেয়েরা যা জানতে চায়। বিয়ে থা’, ছেলেপুলে, স্বামীর ভালোবাসা, গাড়ি, বাড়ি, গয়না।’ শোভনেশের মুঠোয় ধরা ছিল আঙুলগুলো। রোহিণীর করতল খুলে সে আবার তাকায়। ‘বিয়ে খুব শিগগিরই হবে। আর সেটা হবে আর্টের সঙ্গে যুক্ত কোনো লোকের সঙ্গে, সুখীও হবে।’
রোহিণী তখন হেসেছিল। বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমার কোনো কোষ্ঠীঠিকুজি আছে কি?’ মা জানিয়েছিল, নেই। বাবা এসবে বিশ্বাস করতেন না, তাই করানো হয়নি। শোভনেশের কোষ্ঠী ছিল। ওর ছিল বৃষ রাশি।
ট্যাবলয়েডে চোখ রাখল রোহিণী। দেড় মাস আছে শোভনেশের রাশি কী বলেছিল? ‘খরচ বাড়বে। বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ আসবে এবং তা গ্রহণ করলে লাভই হবে। বন্ধুদের সাহায্যে যশবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। প্রণয়ের ক্ষেত্রে সফল হবেন, তবে সতর্ক থাকা দরকার। সন্তানের স্বাস্থ্য সম্পর্কে যত্নবান হতে হবে। কর্মক্ষেত্রে প্রভাব বৃদ্ধি পাবে।’
জেলে বসে শোভনেশের এই রাশিফল দেখার সুযোগ ছিল কি? সুযোগ থাকলে হো হো করে হেসে উঠে নিশ্চয় বলত, ‘যশবৃদ্ধি? প্রণয়? সন্তান? উরি ব্বাবা, তার ওপর বিদেশ ভ্রমণ, কর্মক্ষেত্রও! এতসব এখন সামলাব কী করে?’ কয়েদিদের কি খবরের কাগজ পড়তে দেওয়া হয়? কিন্তু রোহিণীর এখন এই নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ নেই। খসখস করে সে লিখে চলল। মাঝে একবার সে লেখা থামিয়ে অন্যমনস্ক চোখে টেবলে রাখা ম্যাগাজিনটার দিকে তাকিয়েছিল। কী লিখেছে শোভনেশ সম্পর্কে? হাত বাড়িয়ে ম্যাগাজিনটার মলাটে প্রকাশের তারিখ দেখল। ১ ডিসেম্বর। মাত্র দু—মাস আগের।
আটটা পঞ্চাশে কমল এল। তার সঙ্গেই পাউরুটি আর মাদার ডেয়ারির দুধের পাউচ হাতে গৌরীর মা—ও ঢুকল।
‘দিদি আপনার কথা রাখতে পারিনি। ইচ্ছে করেই রাখিনি। বাগদা, গলদা, পার্শে, তোপসে সবই ছিল কিন্তু কিনিনি।’
রোহিণীর জিজ্ঞাসু চোখের দিকে কমল তাকিয়ে অসাধ্য এক কাজ করে ফেলার মতো দাবি নিয়ে থলিটা তুলে বলল, ‘ইলিশ।’
‘অ্যাঁ’, এই অফ সিজনে?’
‘সেইজন্যই তো আপনার কথা অগ্রাহ্য করলুম। বাংলাদেশের চালানি মানে চোরা চালানি, আজ হঠাৎ এসে গেছে। একজনই নিয়ে বসেছিল, পঁয়ত্রিশ টাকা কিলো, সস্তাই বলতে হবে। সবথেকে ছোটোটা বারোশো গ্রাম, ওটাই আনলুম।’
‘খুব ভালো করেছেন, দেখি মাছটা!’
খুশিতে ঝকমক করে উঠল রোহিণীর চোখ। কমল কিন্তু কিন্তু করে বলল, ‘আমি যে কাটিয়ে আনলুম। আপনি কাটতে পারবেন কী না—।’
‘কী বলছেন কমলদা, বাঙালি মেয়ে আর ইলিশ কাটতে পারব না। ইসস আস্ত গোটা ইলিশ দেখতে যে কী টেরিফিক! কতদিন যে দেখিনি।’ থলিটা হাতে নিয়ে রোহিণী ফাঁক করে দেখল। মুখ নীচু করে ঘ্রাণ নিল। রাজেনকে শুধুই ভাত আর ইলিশ খাওয়াবে। তেল আর ভাজা আর ঝালসর্ষে দিয়ে ভাতে। ও ভীষণ ঝালের ভক্ত। কমলদাকে রীতিমতো খাদ্যরসিকই বলতে হবে।
